Oxygen on Mars

মঙ্গলে অক্সিজেন বানিয়ে ফেললেন বিজ্ঞানীরা! এই প্রথম কোনও ভিন্‌গ্রহে শ্বাসবায়ু উৎপাদন, কোন পদ্ধতিতে?

মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের ৯৫ শতাংশ কার্বন ডাই অক্সাইড। তবে তার ভরের সিংহভাগই অক্সিজেন। কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে অক্সিজেনকে আলাদা করার প্রক্রিয়া পৃথিবীতে নতুন নয়। তা করে দেখানো হল মঙ্গলেও।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬ ০৯:০২
মঙ্গলগ্রহের মাটিতে তৈরি করা হয়েছে অক্সিজেন।

মঙ্গলগ্রহের মাটিতে তৈরি করা হয়েছে অক্সিজেন। —প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

মঙ্গলগ্রহের মাটিতে মানুষের শ্বাস নেওয়ার মতো অক্সিজেন তৈরি করে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা। একটি নির্দিষ্ট যন্ত্রের মাধ্যমে মঙ্গলে তৈরি হয়েছে ১২২ গ্রাম অক্সিজেন। পরীক্ষামূলক এই প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে মঙ্গল নিয়ে একাধিক সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছে, মত বিজ্ঞানীদের। পৃথিবী থেকে পাঠানো ওই যন্ত্র মঙ্গলের মাটিতে দাঁড়িয়ে সেখানকার বায়ুমণ্ডল থেকে সংগ্রহ করা উপাদান দিয়েই অক্সিজেন তৈরি করেছে। সেই অক্সিজেন আরও বেশি পরিমাণে উৎপন্ন করা গেলে মঙ্গলে শ্বাসকার্য চালাতে মহাকাশচারীদের আর কোনও অসুবিধা হবে না। ভবিষ্যতে মঙ্গল অভিযান থেকে ফেরার জন্য পৃথিবী থেকে আলাদা করে বাড়তি অক্সিজেন নিয়েও যেতে হবে না।

Advertisement

আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (এমআইটি) বিজ্ঞানীরা মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার সঙ্গে সহযোগিতায় অক্সিজেন তৈরির যন্ত্র পাঠিয়েছিল মঙ্গলে। সেই যন্ত্রের নাম দেওয়া হয় ‘মক্সি’, যার পুরো কথা হল মার্স অক্সিজেন ইন-সিটু রিসোর্স ইউটিলাইজ়েশন এক্সপেরিমেন্ট। ২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি নাসার প্রিজ়ারভেন্স রোভারে চেপে এই যন্ত্র মঙ্গলগ্রহে পৌঁছোয়। এমআইটি-র বিশেষজ্ঞ মাইকেল হেচ্‌ট এবং জেফরি হফম্যানের নেতৃত্বে গবেষকেরা এই যন্ত্র তৈরি করেছিলেন। ২০২১-এ স্পেস সায়েন্স রিভিউজ়-এ তার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়। মক্সি সক্রিয় ছিল ২০২৩ সালের ৭ অগস্ট পর্যন্ত।

যন্ত্রটির ওজন ১৫ কিলোমিটার। নাসা আনুষ্ঠানিক ভাবে একে মাইক্রোওভেনের আকারের যন্ত্র বলে উল্লেখ করলেও এর সঙ্গে কেউ কেউ ছোট টোস্টারের সাদৃশ্য পান। এর নকশার নথিতে বলা হয়েছিল, মক্সি প্রতি ঘণ্টায় ৬ গ্রাম করে অক্সিজেন তৈরি করতে সক্ষম। সেই অক্সিজেন ৯৮ শতাংশ বিশুদ্ধ। প্রাথমিক ভাবে মক্সি-র উদ্দেশ্য ছিল মঙ্গলে উপস্থিত উপাদান কাজে লাগিয়েই অক্সিজেন তৈরি করা। পৃথিবী থেকে নিয়ে যাওয়া উপাদান যাতে কম ব্যবহার করা যায়, তা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। তবে আদৌ এই কাজ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে ধন্দ ছিল। কারণ এর আগে পৃথিবীর বাইরে সেখানকার উপাদান দিয়ে কখনও শ্বাসবায়ু তৈরি করেনি মানুষ।

মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের ৯৫ শতাংশ কার্বন ডাই অক্সাই়ড। তবে তার ভরের সিংহভাগই অক্সিজেন। কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে অক্সিজেনকে আলাদা করার প্রক্রিয়া পৃথিবীতে নতুন নয়। কিন্তু মঙ্গলগ্রহে তা সম্ভব কি না, সেটাই দেখতে চেয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। ২০২১ সালের শেষ দিকের তথ্য বলছে, মক্সি মঙ্গলগ্রহে ঘণ্টায় ৬ গ্রাম করে অক্সিজেন তৈরি করেছে। সকাল কিংবা রাত, মঙ্গলের ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতেও এই অক্সিজেন তৈরি হয়েছে। ওই বছরের পর যন্ত্রের সক্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয় নাসা। চূড়ান্ত মিশনের ঘোষণার সময় অর্থাৎ, ২০২৩ সালে মক্সি থেকে ঘণ্টায় ১২ গ্রাম করে অক্সিজেন তৈরি হয়েছে, বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্যের দ্বিগুণ।

কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে অক্সিজেন তৈরির প্রক্রিয়ার নাম সলিড অক্সাইড ইলেক্ট্রোলাইসিস। ধূলোবালি আটককারী একটি ফিল্টারের মাধ্যমে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে উপাদান টেনে নিত মক্সি। তার পর একটি স্ক্রল পাম্পের মাধ্যমে তা সংকুচিত করত এবং প্রায় ৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তাকে গরম করত। এই উত্তপ্ত গ্যাসকে এর পর একটি বিশেষ প্রযুক্তির সেরামিক সেলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত করা হত। সেখানকার বৈদ্যুতিক প্রবাহ কার্বন ডাই অক্সাইডের অণুগুলিকে ভেঙে কার্বন মনোক্সাইড ও অক্সিজেন আয়নে পরিণত করে। উৎপন্ন আণবিক অক্সিজেনের বিশুদ্ধতা পরিমাপ করে ওই যন্ত্রই। তার পর বিশুদ্ধ সেই অক্সিজেন আবার মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে দেওয়া হয়। উৎপন্ন কার্বন মনোক্সাই়ডও বায়ুমণ্ডলে মুক্ত হয়। সলিড অক্সাইড ইলেক্ট্রোলাইসিস প্রক্রিয়া পৃথিবীতে বহুল প্রচলিত। তবে মঙ্গলের মাটিতে তা করে দেখিয়ে নজর কেড়েছে মক্সি।

মঙ্গল থেকে মহাকাশচারীদের পৃথিবীতে ফেরানোর ক্ষেত্রে এই যন্ত্র কাজে লাগতে পারে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। হেচ্‌ট একাধিক সাক্ষাৎকারে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, চার জন মহাকাশচারীকে মঙ্গল থেকে পৃথিবীতে ফেরানোর জন্য নির্দিষ্ট মহাকাশযানে প্রায় সাত মেট্রিক টন মিথেন রকেট জ্বালানি প্রয়োজন হয়। তা পোড়ানোর জন্য প্রয়োজন হয় আরও ২৫ মেট্রিক টন তরল অক্সিজেন। আবার, ওই চার মহাকাশচারীকেই মঙ্গলের মাটিতে এক বছর রাখতে আরও প্রায় এক মেট্রিক টন বাড়তি শ্বাসযোগ্য অক্সিজেন প্রয়োজন হয়।

মক্সির সর্বোচ্চ অক্সিজেন উৎপাদন হার ঘণ্টায় ১২ গ্রাম। এই হারে যদি একে ২০ লক্ষ ঘণ্টা (২৩০ বছর) টানা চালিয়ে যাওয়া যায়, তবে রকেটের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন তৈরি হবে। শ্বাসযোগ্য অক্সিজেন তৈরি করতে লাগবে আরও সাড়ে ন’বছর। ফলে এই প্রক্রিয়া বাস্তবে কাজে লাগাতে হলে আরও বড় এবং আরও ক্ষমতাশীল যন্ত্র মঙ্গলে পাঠানো প্রয়োজন।

মঙ্গলে অক্সিজেন তৈরির এই প্রক্রিয়াকে কাজে লাগাতে হলে মহাকাশচারীদের পাঠানোর অনেক আগে সেখানে পৌঁছে দিতে হবে আরও বড় আকারের মক্সি যন্ত্র। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মানুষের ব্যবহারের উপযোগী সিস্টেমকে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত দুই থেকে তিন কেজি অক্সিজেন তৈরি করতে হবে। তার জন্য লাগবে ২৫ থেকে ৩০ কিলোওয়াট নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। তা পারসিভারেন্স রোভারে থাকা প্রোটোটাইপের প্রায় ১০০ গুণ বেশি। মহাকাশচারীদের পৌঁছোনোর অন্তত এক বছর আগে মঙ্গলে এই সিস্টেম চালু করে দিতে হবে। তাকে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে অক্সিজেন উৎপাদন চালিয়ে যেতে হবে। এমন শক্তিশালী কোনও যন্ত্র এখনও তৈরি করা যায়নি।

মক্সি প্রমাণ করে, সলিড অক্সাইড ইলেক্ট্রোলাইসিস মঙ্গলের পরিবেশেও কার্যকর। তা ছাড়া, এই যন্ত্র এক মঙ্গলীয় বছরে বিধ্বস্ত হয়ে যায় না। ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। স্থানীয় উপকরণ দিয়েই মঙ্গলে অক্সিজেন তৈরি করে মক্সি দেখিয়ে দিয়েছে, আগামী দিনে মঙ্গলে মানুষের দীর্ঘস্থায়ী বসবাসের একটি ভিত প্রস্তুত প্রাকৃতিক ভাবে। তবে এখনও অনেক বাধা রয়েছে। মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, বৈজ্ঞানিক চাহিদা, জীবনকে মঙ্গলের মাটিতে দীর্ঘস্থায়ী করার সহায়ক ব্যবস্থা কিছুই প্রস্তুত নয়। তবে এত দিন মঙ্গল নিয়ে যে ভাবনা তাত্ত্বিক পর্যায়ে ছিল, এই প্রথম তা বাস্তবে কার্যকর হল। মক্সি বিশাল দরজার একটা তালা খুলল মাত্র।

Advertisement
আরও পড়ুন