Mysterious Green Rocks in Pyrenees Cave

সাড়ে ছ’হাজার ফুট উচু গুহায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ‘রহস্যময়’ সবুজ পাথর! ৬,০০০ বছর আগে সেখানে কী করত মানুষ

স্পেনের ওই গুহা থেকে বেশ কিছু উনুন, প্রাণীর হাড়, পাত্রের ভগ্নাংশ, পাথরের অস্ত্র মিলেছে। কিছু সবুজ রঙের পাথরও মিলেছে, যাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে গবেষণা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১২ মে ২০২৬ ০৮:৫৮
স্পেনের সেই গুহায় চলছে খননকাজ।

স্পেনের সেই গুহায় চলছে খননকাজ। ছবি: সংগৃহীত।

হাজার হাজার বছর আগে উচু পাহাড়ের গুহায় মানুষ মাঝেমধ্যে যাতায়াত করলেও বসবাস করত না। এমনটাই মনে করতেন ইতিহাসবিদে, প্রত্নতত্ত্ববিদেরা। তাঁদের ধারণা ছিল, সেখানে বসবাসের মতো পরিকাঠামো তখন ছিল না। সাম্প্রতিক এক আবিষ্কার সেই ভুল ভেঙে দিয়েছে বিজ্ঞানীদের। তাঁরা দেখেছেন, প্রায় ৬০০০ বছর আগে ভূপৃষ্ঠ থেকে ২,২৩৫ মিটার উচুতে পাহাড়ের গায়ে এক গুহায় বসতি ছিল মানুষের। যুগের পর যুগ সেখানে বাস করেছে বিভিন্ন প্রজন্ম। হয়তো টানা সময় থাকেনি, তবে বছরের একটি নির্দিষ্ট ঋতুতে গিয়ে বছরের পর বছর সেখানে থেকেছে মানুষ। এমনটাই মনে করেন বিজ্ঞানীরা।

Advertisement

প্রশ্ন উঠেছে, কেন সেখানে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে গিয়ে দীর্ঘদিন থাকত মানুষ। তারা যে দীর্ঘদিন থাকত, তার প্রমাণও মিলেছে। বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, পাহাড়ি ওই গুহা সম্ভবত ছিল তামা খনন এবং প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে তামার প্রক্রিয়াকরণ করত মানুষজন। ওই গুহা থেকে মিলেছে প্রায় ২০০টি ‘রহস্যময়’ সবুজ পাথর। সঙ্গে বেশ কিছু কয়লা। তা থেকেই বিজ্ঞানীদের ধারণা, ওই গুহায় তামা থেকে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করা হত। খনিজ গলানোর জন্য ব্যবহার করা হত কয়লা।

উত্তর-পূর্ব স্পেনের কেরালব্‌সের নুরিয়া উপত্যকা। সেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,২৩৫ মিটার উচুতে রয়েছে এক গুহা, বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন কোভা ৩৩৮। সেই গুহা থেকেই মিলল কিছু নিদর্শন, যা দেখে বিজ্ঞানীরা একপ্রকার নিশ্চিত, সেখানে থাকত আদিম মানব। বিভিন্ন যুগে সেখানে গিয়ে বসবাস করেছে মানুষ। খ্রিস্টজন্মের ৫০০০ বছর আগে থেকে ২০০০ বছর আগে—বেশ কয়েক বার সেখানে ফিরে ফিরে গিয়ে বসতি গড়েছে মানুষ। ওই সময় ইউরোপে ছিল তাম্রযুগ। গবেষণাটি করেছে বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল বিজ্ঞানী। ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন এনভায়রমেন্টাল আর্কিয়োলজি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সেই প্রতিবেদন।

ওই গুহার মাটি খনন করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, বিভিন্ন সময়কালে সেখানে থেকেছিল মানুষ। মাটির গভীরে স্তরে স্তরে সেই নিদর্শন মিলেছে। ওই গুহা থেকে বেশ কিছু উনুন, প্রাণীর হাড়, পাত্রের ভগ্নাংশ, পাথরের অস্ত্র মিলেছে। কিছু সবুজ রঙের পাথরও মিলেছে, যাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে গবেষণা। বিজ্ঞানীদের মতে, ওই সবুজ পাথর হল ম্যালাকাইট, যাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে তামা। তাঁদের কেউ কেউ মনে করছেন, অন্য কোথাও থেকে ম্যালাকাইট নিয়ে গিয়ে সেখানে গলানো হত। কেউ মনে করছেন, সেখানেই খনন করে মিলত ম্যালাকাইট। ওই গুহায় আদতে তামার প্রক্রিয়াকরণ ঘটানো হত। হতে পারে, সেখানে তামার জিনিসপত্র তৈরি করত মানুষ। নব্য প্রস্তর এবং তাম্রযুগে নিয়মিত সেখানে যাতায়াত ছিল মানুষের। ওই কোভা ৩৩৮-এর এর থেকে বেশি উচ্চতায় ইউরোপের কোথাও তামার কোনও জিনিসপত্র মেলেনি।

ম্যালাকাইট পোড়ালে কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয়। সবুজ জিনিসটি পরিণত হয় কালো রঙের কপার অক্সাইডে। তাতে তাপ প্রয়োগ করলে তৈরি হয় তামা।

কোভা ৩৩৮ থেকে যে সব জিনিস মিলেছে, তা পরখ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত, সেখানে উনুন জ্বালিয়ে রান্নাবান্নার পাশাপাশি তামার প্রক্রিয়াকরণও করত মানুষ। দীর্ঘদিন সেখানে থেকে খাওয়ার জন্য শিকার করে ধরে আনত পশু। তারই হাড়গোড় মিলেছে। দীর্ঘ যুগ বসবাস না করলে এ সব জিনিস মিলত না বলেই অনুমান বিজ্ঞানীদের। তাঁদের কারও কারও মতে, সব ঋতুতে হয়তো সেই গুহায় বসবাস করত না মানুষ। নির্দিষ্ট কিছু ঋতুতে ওই গুহায় শিবির করত মানুষ। উদ্দেশ্য ছিল খনিজের প্রক্রিয়াকরণ। যুগের পর যুগ সেই কাজ তারা করেছে।

ওই গুহা থেকে ঝিনুকের তৈরি একটি লকেট পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ভালুকের দাঁতের তৈরি একটি লকেটও পেয়েছেন। তাঁদের মতে, ওই গুহায় যখন মানুষ যেত, তখন পছন্দের, প্রয়োজনের জিনিসও নিয়ে যেত। গুহা থেকে বেশ কয়েকটি দেহাংশ মিলেছে। তার মধ্যে একটি শিশুর কঙ্কালের অবশেষ মিলেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, শুধু বসবাস, খনিজ উত্তোলন বা জিনিসপত্র মজুত নয়, মানুষকে সমাধিস্থ করার জন্যও ওই গুহা ব্যবহার করা হত। সেই গুহা থেকে মেলা জিনিসপত্র নিয়ে গবেষণা চলছে বিজ্ঞানীদের।

Advertisement
আরও পড়ুন