Brain

কিছু ভাবতে শুরু করার আগেই কি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে মস্তিষ্ক? নতুন ভাবে ভাবাচ্ছে স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণা

স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মত ছিল, মস্তিষ্ক যে সিদ্ধান্ত নেয়, সেই পদ্ধতিটি রিলে দৌড়ের মতো। উদ্দীপনা ক্রমে ক্রমে একের পর এক ধাপ পেরিয়ে মস্তিষ্কের ফ্রন্টার কর্টেক্সে পৌঁছোয়। সেখানেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যারা উদ্দীপনা গ্রহণ করে, তারা সিদ্ধান্ত নেয় না।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ৩০ মে ২০২৬ ০৮:৫৮

— প্রতীকী চিত্র।

চ্যাটবট হোক বা স্বয়ংক্রিয় কোনও যন্ত্র— তাদের কাজ করার পদ্ধতি কিন্তু এক। সেন্সর বা উদ্দীপক তথ্য জোগাড় করে, বিভিন্ন স্তরের মাধ্যমে তা ঊর্ধ্বতনকে পাঠায়, তার পরে সেখানে বসে কেউ চূড়ান্ত সিদ্ধান নেয়। স্নায়ুবিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানুষের মস্তিষ্কও এ ভাবেই কাজ করে। কিন্তু সেই ধারণাই এ বার ধাক্কা খেল। ইঁদুরের উপরে করা একটি পরীক্ষা বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। বিজ্ঞানীদের একাংশ দেখেছেন, মস্তিষ্কের গভীরে তথ্য পৌঁছোনোর আগেই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছে। তবে এই নিয়ে রয়েছে ভিন্নমতও।

Advertisement

স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মত ছিল, মস্তিষ্ক যে সিদ্ধান্ত নেয়, সেই পদ্ধতিটি রিলে দৌড়ের মতো। উদ্দীপনা ক্রমে ক্রমে একের পর এক ধাপ পেরিয়ে মস্তিষ্কের ফ্রন্টার কর্টেক্সে পৌঁছোয়। সেখানেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যারা উদ্দীপনা গ্রহণ করে, তারা সিদ্ধান্ত নেয় না।

সেই প্রচলিত ধারণা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। বিভিন্ন পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রাথমিক সংবেদনশীল এলাকা (আর্লি সেন্সরি এরিয়া) কেবল উদ্দীপনা গ্রহণ করে না, সিদ্ধান্তগুলিও খতিয়ে দেখে। উদ্দীপনা দুর্বল থাকলেও তা করতে সমর্থ হয় অনেক সময়।

ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রিকাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ইউরি ভ্লাসভ এবং তাঁর ছাত্র অ্যালেক্স আর্মস্ট্রং এই নিয়ে স্পষ্ট কিছু ধারণা দেন। তা প্রকাশিত হয় পিএনএএসে। সেই গবেষণা নিয়ে একটি প্রশ্ন ওঠে, উদ্দীপনা শূন্য হয়ে গেলেও কি মস্তিষ্কের প্রাথমিক সংবেদনশীল এলাকা, যেখানে অনুভূতি এসে প্রথম পৌঁছোয়, তা সিদ্ধান্ত নিতে পারে? নাকি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ওই উদ্দীপনা মস্তিষ্কের ভাবনাচিন্তা করার উচ্চতর অংশ (ফ্রন্টাল কর্টেক্স)-এ পৌঁছোনো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়? গবেষণা বলছে, উদ্দীপনা বা তথ্য না থাকলেও মস্তিষ্কের ওই প্রাথমিক অনুভূতি গ্রহণের অংশ (ব্যারেল কর্টেক্স) নিজে থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করে। বিজ্ঞানীদের মতে, কোনও কিছু স্পষ্ট ভাবে ভাবার আগেই সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে মস্তিষ্ক।

কয়েকটি ইঁদুরের উপরে পরীক্ষানিরীক্ষা করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। এমনিতে প্রত্যক্ষ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ইঁদুরদের কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। বিজ্ঞানীরা একটি কৃত্রিম বাস্তব অবস্থা তৈরি করেছিলেন। ভাসমান এক পৃষ্ঠ, যার উপরে দৌড়োনোর জন্য ইঁদুরগুলিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই অংশটিকে ঘিরে থাকা দেওয়ালগুলি ছিল মোটরচালিত, যা ইঁদুরগুলি নড়লে তাদের সঙ্গে নড়ে ওঠে। তার পরে ইঁদুরের মুখের এক জোড়া বাদে সব গোঁফ কেটে দেন বিজ্ঞানীরা। যে দু’টি গোঁফ রেখে দেন, সেগুলি হুবহু সমান ছিল। প্রসঙ্গত, গোঁফ দিয়ে ইঁদুর স্পর্শের সংবেদন গ্রহণ করতে পারে। সেই সংবেদন গ্রহণের জন্য ইঁদুরগুলির ছিল মাত্র ওই দু’টি গোঁফ। দেখা গেল, কিছু ক্ষণের মধ্যেই ওই গোঁফ দিয়ে ওই বিশেষ স্থানে প্রায় নির্ভুল ভাবে দিক নির্ণয় করতে সমর্থ হয় তারা।

ইঁদুরের প্রতিটি গোঁফ মস্তিষ্কের কর্টেক্সের নির্দিষ্ট অংশের সঙ্গে যুক্ত থাকে। উদ্দীপনা বহন করে তা মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয় তারা। কর্টেক্সের ওই অংশকে বলে ব্যারেল কর্টেক্স। সি২ গোঁফের ব্যারেল প্রাইমারি সোমাটোসেনসরি কর্টেক্সে রয়েছে। গোঁফের মাধ্যমে আসা সঙ্কেত প্রথম পৌঁছোয় সেখানে। ইঁদুরগুলি যখন বিজ্ঞানীদের তৈরি করা বিশেষ ভাসমান পৃষ্ঠ দিয়ে চলাচল করছিল, তখন বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু ইলেকট্রোড প্রয়োগ করেন। তাতে শ’য়ে শ’য়ে নিউরনের সঙ্কেত রেকর্ড করেন বিজ্ঞানীরা। সেই নিউরনের সঙ্কেত আগেভাগেই জানান দিচ্ছিল, কোন দিকে যাচ্ছে ইঁদুরটি।

বিজ্ঞানীদের অনেকেই দীর্ঘ দিন ধরে গবেষণা করে দেখেছেন, কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পর্যন্ত প্রমাণ বা তথ্য একটি জায়গায় জমা হতে থাকে এবং একটি চূড়ান্ত মুহূর্তে পৌঁছোলে সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত হয়। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এই চূড়ান্ত মুহূর্তটি মস্তিষ্কের পরবর্তী কোনও অংশে ঘটার কথা, যেমন প্রিমোটর বা ফ্রন্টাল অঞ্চলে।

বিজ্ঞানীরা দেখেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াটি মস্তিষ্কের উচ্চতর অংশ থেকে ফিরে আসা সঙ্কেত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। স্পর্শ হলেই মস্তিষ্কের উচ্চ অংশ নিম্ন অংশকে তথ্য পাঠায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আবার রিলে দৌড়ের ধারণা ধাক্কা খায়। নীচের সংবেদন গ্রহণের অংশ থেকে মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অংশে পৌঁছোনোর পরিবর্তে চক্রের মতো কাজ করে। কোনও একটি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগে মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্তর এবং অঞ্চলের মধ্যে তথ্য বারবার আদান-প্রদান হতে থাকে। অর্থাৎ মস্তিষ্কের অনুভব করার অংশ এবং চিন্তা করার অংশ একই সঙ্গে কাজ করে। তারা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলে।

তবে কোনও কোনও বিজ্ঞানীদের দাবি, এই গবেষণা ইঁদুরের উপরে করা হয়েছে। মানুষের উপরে নয়। তাই মানুষের ক্ষেত্রেও একই রকম হবে, তা ধরে নেওয়া যায় না। এই নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন।

Advertisement
আরও পড়ুন