নোভাক জোকোভিচকে (বাঁ দিকে) হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জয় কার্লোস আলকারাজ়ের। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
আত্মসমর্পণ করলেন না নোভাক জোকোভিচ। ফাইনালের আগে বলেছিলেন, “জানি, আলকারাজ় এই মুহূর্তে আমার থেকে অনেক ভাল খেলছে। তাই বলে কি সাদা পতাকা দেখিয়ে আত্মসমর্পণ করব? না। শেষ পয়েন্ট পর্যন্ত লড়ব।” লড়লেনও ২৪ গ্র্যান্ড স্ল্যামের মালিক। কিন্তু ২৫ নম্বরের অপেক্ষা আরও কিছুটা বাড়ল। নিজের সবচেয়ে প্রিয় কোর্ট (২৪ গ্র্যান্ড স্ল্যামের মধ্যে ১০টি অস্ট্রেলিয়ান ওপেন) আরও এক বার হতাশ করল জোকোভিচকে।
হয়তো ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইয়ানিক সিনার ও কার্লোস আলকারাজ়ের বিরুদ্ধে খেলার ধকল সামলাতে পারলেন না ৩৮ বছরের জোকোভিচ। রবিবার রড লেভার এরিনায় ৩ ঘণ্টা ০২ মিনিটে চার সেটের লড়াইয়ে (২-৬, ৬-২, ৬-৩, ৭-৫) জোকোভিচকে হারিয়ে নিজের প্রথম অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতলেন আলকারাজ়। কনিষ্ঠতম টেনিস খেলোয়াড় হিসাবে মাত্র ২২ বছর ২৭২ দিন বয়সে কেরিয়ার স্ল্যাম (চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়) হয়ে গেল তাঁর।
২০২৩ সালের ইউএস ওপেনে শেষ বার গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতেছিলেন জোকোভিচ। পরের দু’বছরের আটটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম খেলেছেন। পাঁচ বার সেমিফাইনাল, এক বার কোয়ার্টার ফাইনাল ও এক বার তৃতীয় রাউন্ড থেকে বাদ পড়েছেন। এক বারই ফাইনালে উঠেছিলেন। ২০২৪ সালের উইম্বলডনে। সেখানেও আলকারাজ়ের কাছে হারতে হয়েছিল। এ বারও সেই আলকারাজ়ই তাঁর ২৫তম গ্র্যান্ড স্ল্যামের সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়ালেন।
গত বার ফরাসি ওপেন ও ইউএস ওপেন জিতেছিলেন আলকারাজ়। অর্থাৎ, গত মরসুমে যেখানে শেষ করেছিলেন, এই মরসুমের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যামে সেখান থেকেই শুরু করলেন আলকারাজ়। মাত্র ২২ বছর বয়সে নিজের সপ্তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতলেন। টেনিসের ওপেন এরায় এত অল্প বয়সে এত গ্র্যান্ড স্ল্যাম আর কেউ জিততে পারেনি। নিজের ‘গুরু’ রাফায়েল নাদালকেও টপকে গিয়েছেন আলকারাজ়। তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন, সেরা ফর্মের আলকারাজ়কে হারানো শুধু কঠিন নয়, অসম্ভব।
আগের ম্যাচে ৪ ঘণ্টা ৯ মিনিটের লড়াইয়ে সিনারকে হারিয়েছিলেন জোকোভিচ। সেই ম্যাচে যেখানে শেষ করেছিলেন, সেখান থেকেই এই ম্যাচে শুরু করেন জোকোভিচ। প্রথম সার্ভিস বরাবর কোনও টেনিস ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গেম। ফাইনালে তার গুরুত্ব তো আরও বেশি। জোকোভিচ হাসতে হাসতে প্রথম গেম জেতেন। পরের দুই গেমেও সার্ভিস ধরে রাখেন দুই তারকা। আলকারাজ় সমস্যায় পড়েন চতুর্থ গেমে। পর পর দু’টি আনফোর্সড এরর করে নিজের সার্ভিস খোয়ান শীর্ষবাছাই তারকা। অষ্টম গেমে আবার সেই ছবি। সার্বিয়ার জোকোভিচের উইনারের সামনে অসহায় দেখাচ্ছিল স্পেনের আলকারাজ়কে। বাধ্য হয়ে ভুল করছিলেন তিনি। গায়ের জোরে খেলতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছিলেন। দ্বিতীয় বার সার্ভিস হারিয়ে সেট হারেন আলকারাজ়। ফাইনালে এগিয়ে যান জোকোভিচ।
তবে আলকারাজ় যে ছাড়ার পাত্র নন, তা দ্বিতীয় সেটেই বুঝিয়ে দেন তিনি। দুই সেটের ফাঁকে যে সময় পেয়েছিলেন, সেখানে নিজের দলের সঙ্গে কথা বলেন আলকারাজ়। বুঝে ফেলেন, কোথায় ভুল করছেন। দ্বিতীয় সেটের তৃতীয় গেমে জোকোভিচের সার্ভিস ভাঙেন আলকারাজ়। যে ভুল প্রথম সেটে আলকারাজ় করছিলেন, সেই একই ভুল দ্বিতীয় সেটে করেন নোভাক। বলা ভাল, আলকারাজ় তাঁকে করতে বাধ্য করেন। আলকারাজ় এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি ছন্দ পেয়ে গেলে তাঁকে আটকানো কঠিন। রড লেভার এরিনায় সেটাই দেখলেন জোকোভিচ। সপ্তম গেমে আবার জোকোভিচের সার্ভিস ভাঙেন তিনি। তাতেই সেই সেটের ফয়সালা হয়ে যায়। অষ্টম গেমে নিজের সার্ভিস ধরে রেখে প্রথম সেটে ২-৬ হারের বদলা দ্বিতীয় সেটে ৬-২ জয়ে নেন আলকারাজ।
খেলা যত গড়াবে তত ২২ বছরের আলকারাজ়ের সামনে ৩৮ বছরের জোকোভিচের যে দমে ঘাটতি হবে তা স্বাভাবিক। তৃতীয় সেটের পঞ্চম গেমে জোকোভিচকে সামান্য ক্লান্ত দেখায়। লম্বা র্যালি থেকে পয়েন্ট তোলা কঠিন হয়ে পড়ছিল তাঁর পক্ষে। পর পর দু’টি আনফোর্সড এরর করে সার্ভিস খোয়ান বিশ্বের চতুর্থ বাছাই। নবম গেমে পর পর তিনটি পয়েন্ট জিতে সেট জেতার সুযোগ এসে গিয়েছিল আলকারাজ়ের সামনে। কিন্তু হাল ছাড়েননি জোকোভিচ। তিনিও পর পর তিনটি পয়েন্ট জেতেন। প্রতি পয়েন্টে লড়াই চলছিল। এক বার আলকারাজ় ব্রেক পয়েন্ট পাচ্ছিলেন, তো পর ক্ষণেই তা বাঁচিয়ে গেম জেতার সুযোগ পাচ্ছিলেন জোকোভিচ। ১০ মিনিট ধরে চলে সেই গেম। পর পর তিনটি আনফোর্সড এরর করে সেই গেম ও সেট হারেন জোকোভিচ।
ম্যাচে টিকে থাকতে হলে চতুর্থ সেট জিততেই হত জোকোভিচকে। আলকারাজ়কে দেখে মনে হচ্ছিল, সবে খেলতে নেমেছেন। তাঁর সার্ভিস গেম জিততে বেশি ক্ষণ লাগছিল না। উল্টো দিকে জোকোভিচের সার্ভিস গেম চলছিল দীর্ঘ ক্ষণ ধরে। চতুর্থ সেটের দ্বিতীয় গেম চলে ১৩ মিনিট ধরে। কোনও রকমে মরিয়া হয়ে লড়াই করছিলেন জোকোভিচ। সময় লাগলেও সার্ভিস খোয়াননি তিনি। ফলে খেলা সমানে সমানে চলছিল। দেখে মনে হচ্ছিল, এই সেট টাইব্রেকারে গড়াবে। কিন্তু নবম গেমে আলকারাজ়ের সার্ভিস ভাঙার সুযোগ পেয়ে যান জোকোভিচ। তা কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। আনফোর্সড এররের খেসারত দিতে হয়। পর পর দু’টি পয়েন্ট তুলে নিয়ে সেই গেম বাঁচিয়ে নেন আলকারাজ়।
দ্বাদশ গেমে ম্যাচ বাঁচানোর জন্য সার্ভিস করছিলেন জোকোভিচ। ম্যাচের সবচেয়ে কঠিন সময়। সেখানেই স্নায়ুর চাপ সামলাতে পারলেন না তিনি। এক বার নেটে মারলেন। এক বার আনফোর্সড এরর করে আলকারাজ়কে ব্রেক পয়েন্ট দিয়ে দিলেন। তাঁর শেষ শট লাইনের বাইরে গিয়ে পড়তেই কোর্টে শুয়ে পড়লেন আলকারাজ়। অধরা স্বপ্নপূরণের আনন্দ তাঁর চোখেমুখে। অন্য দিকে জোকোভিচ হতাশ। তিনি বুঝে গেলেন, ২৫তম গ্র্যান্ড স্ল্যামের জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে তাঁকে।