ICC T20 World Cup 2026

সঞ্জুর ক্যাচ ফেলেই ম্যাচ ফেলে দিলেন ইংরেজ অধিনায়ক! ফের বিশ্বকাপের ফাইনালে সূর্যেরা, রবিতে লড়াই কিউয়িদের সঙ্গে

ইংল্যান্ডকে হেলায় হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে সূর্যকুমার যাদবেরা। আগামী রবিবার অহমদাবাদে নিউ জ়িল্যান্ডকে হারাতে পারলে বিশ্বের প্রথম দল হিসাবে টানা দু’বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতবে ভারত।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৫ মার্চ ২০২৬ ২২:৫০
picture of cricket

জয়ের উচ্ছ্বাস জসপ্রীত বুমরাহ, অক্ষর পটেলদের। ছবি: পিটিআই।

১২ রান করা সঞ্জু স্যামসনের সহজ ক্যাচ ফেলে ভারতকে ইতিহাস গড়ার মঞ্চ সাজিয়ে দিলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক! তারও আগে আর একটি ভুল করেন তিনি। টস জিতে সকলকে অবাক করে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নেন ব্রুক! জ্যাকব বেথেলের শতরানও ইংল্যান্ডকে জেতাতে পারল না। তাঁর ১০৫ রানের ইনিংসের সুবাদে ক্রিকেটপ্রেমীদের অবশ্য উপভোগ্য ক্রিকেট উপহার দিল ইংল্যান্ড। ভারতের ৭ উইকেটে ২৫৩ রানের জবাবে ইংল্যান্ড করল ৭ উইকেটে ২৪৬ রান।

Advertisement

রবিবার অহমদাবাদের ফাইনালে নিউ জ়িল্যান্ডকে হারাতে পারলেই বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে টানা দু’বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হবে ভারত। একই সঙ্গে ২০২৩ সালের আক্ষেপ মিটিয়ে ফেলার সুযোগ পাবেন ঈশান কিশন। সে বার নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে এক দিনের বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের ধাক্কা সামলাতে পারেননি তরুণ উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। ক্রিকেট থেকেই দূরে সরে গিয়েছিলেন। এ বার জীবন পেয়ে তাঁকে সুযোগ করে দিলেন আর এক উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ৭ রানে হারিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালে চলে গেলেন সূর্যকুমার যাদবেরা। এই নিয়ে চতুর্থ বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের খেতাবি লড়াইয়ে ভারত।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে ৯৭ রানের অপরাজিত ইনিংস সঞ্জুর মেজাজই বদলে দিয়েছে। আপাত শান্ত, প্রায় উচ্ছ্বাসহীন সঞ্জুর মধ্যে যেন আগুন জ্বলছে। বঞ্চনার আগুন। ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে থাকলেও একটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি। ফাইনালে খেলার সম্ভাবনা তৈরির হলেও শেষ মুহূর্তে ঋষভ পন্থকে নামানোর সিদ্ধান্ত নেন রাহুল দ্রাবিড়। এ বারও ফর্ম হারানোয় বিশ্বকাপের প্রথম একাদশ থেকে বাদ পড়ে গিয়েছিলেন। অথচ সেই সঞ্জুই এখন গৌতম গম্ভীরের অন্যতম ভরসা।

ইডেন গার্ডেন্সে ৯৭ রানের ইনিংসের পর ওয়াংখেড়েতে ৪২ বলে ৮৯ রানের ইনিংস। তাঁর ব্যাট থেকে শুধু ৮টি চার আর ৭টি ছক্কাই এল না, দ্বিতীয় সেমিফাইনালের ফলাফলও নির্ধারণ করে দিল। ২৬ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করেন। প্রথম ওভার থেকেই জফ্রা আর্চার, জেমি ওভারটনদের শাসন করলেন। তাঁর আগ্রাসী মেজাজ ইংরেজদের স্নায়ুর চাপে ফেলে দিল। দায়ী ইংল্যান্ড অধিনায়ক। তৃতীয় ওভারে আর্চারের বলে সঞ্জুর এমন ক্যাচ ব্রুক ফেললেন, যা তিনি ১০ বার দিলে সম্ভবত ১০ বারই ধরবেন! ক্রিকেটজীবনের অন্যতম বড় আক্ষেপ নিয়েই দেশে ফিরতে হবে ব্রুককে। সঞ্জুর আক্ষেপ থাকবে সেমিফাইনালে নিশ্চিত শতরান হাতছাড়া করার।

জীবন পাওয়া সঞ্জু মারলেন। বলের সেলাই খুলে দেওয়া মার মারলেন। ২২ গজে সঙ্গে পেলেন মারমুখী ঈশানকে। তিন নম্বরে নেমে তিনি করলেন ১৮ বলে ৩৯। ৪টি চার এবং ২টি ছয় মারলেন ঈশান। সঞ্জু-ঈশানের দাপটে ৮.৩ ওভারে ১০০ রান তুলল ভারত। যা এ বারের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্বিতীয় দ্রুততম ১০০ রান। চার নম্বরে নেমে ঘরের চেনা মাঠে চালিয়ে খেললেন শিবম দুবেও। তিনি করলেন ২৫ বলে ৪৩। মারলেন ১টি চার এবং চারটি ছক্কা। ঘরের মাঠে অবশ্য রান পেলেন না সূর্যকুমার (৬ বলে ১১)। আদিল রশিদের বল এগিয়ে এসে সুইপ করতে গিয়ে স্টাম্পড আউট হলেন। তাতে ভারতের রান তোলার গতি থমকায়নি। ইংল্যান্ডের বোলারদের সহজে সামলালেন ভারতীয় ব্যাটারেরা। তারণ তার আগেই অবশ্য তাঁদের যাবতীয় আত্মবিশ্বাস আরব সাগরের জলে ভাসিয়ে দেন সঞ্জু। শেষ দিকে হার্দিক পাণ্ড্য করলেন ১২ বলে ২৭। তিলক বর্মা ২১ রান করলেন ৭ বলে। ভারত ৭ উইকেটে ২৫১ রান।

ইংল্যান্ডের বোলারদের কোনও কোনও সময় ক্লাব স্তরের মনে হল। লাইন-লেংথে কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তার মধ্যেই সফলতম জ্যাকস ৪০ রানে ২ উইকেট নিলেন। ৪১ রানে ২ উইকেট রশিদের। ৬১ রান দিয়ে ১ উইকেট আর্চারের। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে একটি ম্যাচে সবচেয়ে রান খরচ করার লজ্জার কীর্তি গড়লেন। টপকে গেলেন স্টুয়ার্ট ব্রডের ৬০ রান দেওয়ার নজির। জেমি ওভারটন, স্যাম কারেন, লিয়াম ডসনেরা উইকেটহীন থাকলেন।

সঞ্জু, ঈশান, শিবমদের দাপটে আবার ঢাকা পড়লেন অভিষেক শর্মা। তাঁর ব্যর্থতা চলছেই। জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে তাঁর ৩০ বলে ৫৫ রানের ইনিংস দেখে উচ্ছ্বসিত ক্রিকেটপ্রেমীদের ভুল প্রমাণ করলেন সেমিফাইনালেও। ৭ বলে ৯ রান করে উইল জ্যাকসের বলে আউট হলেন ভুল শট নির্বাচন করে। ফাইনালের প্রথম একাদশে নিজের নির্বাচনকেই বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিলেন।

২৫৪ রান তাড়া করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে যাওয়ার জন্য প্রথম বল থেকেই মেরে খেলতে হত ইংল্যান্ডকে। ওভার প্রতি ১৩ রানের কাছাকাছি তুলতে হত। ‘বাজ়বল’ ক্রিকেটে অভ্যস্ত ব্রেন্ডন ম্যাকালামের দলের জন্য হয়তো অসম্ভব ছিল না। কিন্তু প্রতিপক্ষ দলে জসপ্রীত বুমরাহ, অর্শদীপ সিংহদের মতো বোলারেরা থাকলে সম্ভবও অসম্ভব হয়ে যায়।

ফিল সল্ট-জস বাটলার জুটিকে ইনিংসের শুরুতে আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছিল। কিন্তু ব্রুকের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিয়ে হার্দিকের প্রথম বলেই আউট হলেন সল্ট (৫)। এ দিনও ফিফ্‌থ স্টাম্পের বলে আউট হলেন। বুমরাহের প্রথম বলে আউট হয়ে দলকে এক রকম ছিটকেই দিলেন ব্রুক (৬ বলে ৭)। ৩০ গজের বৃত্ত থেকে বাউন্ডারির দিকে প্রায় ২০ মিটার দৌড়ে ক্যাচ ধরেন অক্ষর পটেল। প্রথম ওভার বল করতে এসে বাটলারকে (১৭ বলে ২৫) বোল্ড করে ইংল্যান্ডকে আরও চাপে ফেলে দেন বরুণ চক্রবর্তী। যদিও প্রথম তিন বলেই ছয় মেরে বরুণের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বেথেল। আগ্রাসী মেজাজে শুরু করা টন ব্যান্টনকে (৫ বলে ১৭) আউট করেন অক্ষর।

ইংল্যান্ডের আশা জিইয়ে রাখেন বেথেল-জ্যাকস জুটি। জ্যাকসকে আউট করে তাঁদের ৩৯ বলে ৭৭ রানের জুটি ভাঙেন অর্শদীপ। বাউন্ডারি লাইনে অক্ষরের অবিশ্বাস্য ফিল্ডিংয়ে ক্যাচ সম্পূর্ণ করেন শিবম। জ্যাকস ৪টি চার এবং ২টি ছয়ের সাহায্যে ২০ বলে ৩৫ রান করেন। ১৭২ রানে ৫ উইকেট হারানোর পর ইংল্যান্ডের জয়ের আশা প্রায় শেষ হয়ে যায়। তার পরও ভারতীয় দলকে চাপে রাখার চেষ্টা করেন বেথেল। তবে কারেন রান তোলার গতি বজায় রাখতে পারেননি। চাপের মুখেও বেথেল সমানে সমানে লড়াইয়ের চেষ্টা করে গেলেন। ১৯তম ওভারে কারেনকে (১৪ বলে ১৮) আউট করে ভারতকে সুবিধা করে দেন হার্দিক। ভাল ক্যাচ নেন তিলক। শেষ ওভারের প্রথম বলে বেথেল রান আউট হওয়ায় শেষ হয়ে যায় ইংল্যান্ডের আশা। ৮টি চার এবং ৭টি ছয়ের সাহায্যে ৪৮ বলে ১০৫ রান করেন তিনি। বেথেল যতক্ষণ ২২ গজে ছিলেন, ততক্ষণ চাপে ছিল ভারতীয় দল। বলা যায়, ভারতের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২২ গজে ছিলেন আর্চার (১৯) এবং ওভারটন (২)।

এ দিন ভারতের সফলতম বোলার হার্দিক ৩৮ রানে ২ উইকেট নিলেন। ৩৩ রানে ১ উইকেট বুমরাহের। ৩৫ রানে ১ উইকেট অক্ষরের। অর্শদীপ ১ উইকেট নিলেন ৫১ রান খরচ করে। বরুণ ১ উইকেট পেলেও খরচ করলেন ৬৪ রান। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বিশ্বের এক নম্বর ব্যাটারের মতো ভারতের উদ্বেগ বাড়াচ্ছেন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বিশ্বের এক নম্বর বোলারও!

Advertisement
আরও পড়ুন