একাগ্র: ফলের কথা না ভেবে পরিশ্রম, সাধনা করে যাওয়াই লক্ষ্য শামির। — ফাইল চিত্র।
গৌতম গম্ভীর, অজিত আগরকরের জমানায় নির্বাচনী বিস্ময়ের অভাব নেই। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো যেন একের পর এক বিতর্ক আছড়ে পড়েছে। কাকে ছেড়ে কাকে ধরা হবে? তবু ২০২৫-এর সব চেয়ে বঞ্চিত কেউ যদি থাকেন, তো তাঁর নাম সবার আগে মনে আসবে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সি ভি বরুণের সঙ্গে যুগ্ম ভাবে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হওয়ার পরেও অজানা কারণে ভারতীয় দল থেকে ব্রাত্য। শুধু তা-ই নয়, গম্ভীর-আগরকরেরা রীতিমতো উপেক্ষা, অসম্মান করে চলেছেন। তিনি পারতেন অনেক পাল্টা জবাব দিতে। কিন্তু বরাবরের মতোই শান্ত, ভদ্রলোক ফাস্ট বোলারের পোশাক ত্যাগ করলেন না। বর্ষবরণের উৎসব ভুলে বিজয় হজারে ট্রফি খেলছেন। বুধবার বাংলা দারুণ জিতলও জম্মু-কাশ্মীরের বিরুদ্ধে। ব্যস্ততার ফাঁকেই মহম্মদ শামি একান্ত সাক্ষাৎকার দিলেন আনন্দবাজারকে।
প্রশ্ন: ২০২৫ কেমন গেল? কী ভাবে ব্যাখ্যা করবেন বছরটাকে?
মহম্মদ শামি: খাস নহী (দারুণ কিছু নয়)। ঠিক আছে। কোনও অভিযোগ নেই।
প্র: কী বলছেন! চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে দলের যুগ্ম সর্বোচ্চ উইকেটসংগ্রাহক হয়ে ফেরার পরে আর ভারতীয় দলে ডাকই পেলেন না। বিস্তর অভিযোগ তো থাকার কথা আপনার!
শামি: না, না (কিছুটা অভিমানী শোনাল কণ্ঠস্বর)। অভিযোগ করে কখনও ক্রিকেট খেলিনি। আজও করব না। কলকাতায় ক্লাব ক্রিকেট যখন থেকে খেলেছি, যারা দেখেছে তাদের থেকে শুনে নিন। প্রত্যেকটা বলে উইকেট নিতে চেয়েছি। বাংলার হয়ে খেলেছি, এখনও খেলছি, ভারতের জার্সি গায়ে যখনই নেমেছি— একই মনোভাব, একই লক্ষ্য নিয়ে নেমেছি যে, আমি দলের সৈনিক। দলকে জেতাতে হবে। এতদিন যে ভাবে খেলে এসেছি, এখনও সে ভাবেই খেলব। পাল্টাব না।
প্র: তবু দিনের পর দিন লড়াই করে যাওয়ার পরেও, নিজেকে প্রমাণ করার পরেও যখন কেউ দেখেন অবিচার হয়েই চলেছে, কী ভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব?
শামি: আমি নিজেকে একটাই কথা বলি। তোমার হাতে যা আছে, দাঁতে দাঁত চেপে সেটা করে যাও। পুরস্কারের কথা ভেবে পরিশ্রম করতে গেলে চলার পথে ধাক্কা খেতে হতে পারে। মনে রেখো, ফল তোমার হাতে নেই। তা হলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে যাওয়াও তো বৃথা চেষ্টা। তোমার হাতে কী আছে? পরিশ্রম আছে, অধ্যবসায় আছে, সাধনা আছে। সেগুলো করে যাও। পুরস্কার এলে ভাল। না এলেও নিজের মনের দিক থেকে অন্তত শান্তি যে, আমার দিক থেকে খামতি ছিল না।
প্র: এমনিতেই জোরে বোলার হয়েও আপনার মধ্যে বরাবর শান্ত, ধীরস্থির একটা ভাব লক্ষ্য করেছি। আগ্রাসনটা আপনার বোলিংয়ে ফুটে ওঠে, চালচলনে, কথাবার্তায় একদম নেই। এখন কি আরও দার্শনিক হয়ে উঠেছেন?
শামি: (হাসি) আরে, না, না। নিজের জায়গাটা আমি সব সময় এ ভাবেই দেখার চেষ্টা করেছি। কলকাতা ময়দানে যখন এসেছিলাম, তখন থেকেই বলতাম— আমায় বল দাও, উইকেট নেবই। আজও তাই বলি। দায়িত্ব কখনও এড়িয়ে যাইনি, অন্য কারও দিকে বল ঠেলে দিইনি। দলের কাজ মানে বুঝেছি নিজের কাজ। অন্য কারও দিকে বল ঠেলে দিয়ে গাছের ছায়ায় গিয়ে দাঁড়াইনি। পুরস্কার? ফল? ও সব অন্যদের হাতে, তারা ঠিক করুক।
প্র: অভিমানী শোনাচ্ছে আপনাকে।
শামি: আরে, না, না। অভিমানের কোনও ব্যাপারই নেই। কোনও অভিযোগও নেই, আমি তো আপনাকে শুরুতেই বললাম।
প্র: সারা দেশে ক্রিকেটভক্তরা গলা উঁচিয়ে বলছেন, শামিকে ফেরাও। মহম্মদ শামি নিজে ভারতীয় দলে প্রত্যাবর্তন নিয়ে কী ভাবছেন?
শামি: আমি বিশেষ কিছুই ভাবছি না। বাংলার হয়ে বিজয় হজারে ট্রফি খুব উপভোগ করছি। মন লাগিয়ে বাকি ম্যাচগুলো খেলে যেতে চাই, বাংলাকে ট্রফি দিতে চাই। যদি ভাগ্যে থাকে, আবার দেশের জার্সি গায়ে খেলব। ভাগ্যে না থাকলে, হবে না।
প্র: বিশ্বকাপে একক ভাবে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে যুগ্মভাবে দলের সেরা বোলার। অথচ জাতীয় দলের দরজা বন্ধ। এই কঠিন বিধান সত্যিই কি মেনেনেওয়া যায়?
মহম্মদ শামি। — ফাইল চিত্র।
শামি: কারও কারও জন্য জীবনটাই এ রকম কঠিন, শুধু ক্রিকেট মাঠ নয়।
প্র: মহম্মদ শামির জীবন তা হলে এই মুহূর্তে ঠিক কী রকম?
শামি: খুব সহজ কথায় বলতে গেলে হোটেল থেকে মাঠ আর মাঠ থেকে হোটেল। ক্রিকেটের বাইরে আর কিছুই নেই এই মুহূর্তেআমার রুটিনে।
প্র: মানে ক্রিকেটই একমাত্র মন্ত্র?
শামি: হ্যাঁ। যব তক হ্যায় দম, খেলতে রহো (যত ক্ষণ দম রয়েছে, খেলতে থাকো)। মন্ত্র এটাই। তার পরে দেখা যাবে, ভাগ্যে কী আছে।
প্র: এই যে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সফল এক জন তারকাকে ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরে গিয়ে নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করতে হচ্ছে, এই ব্যাপারটার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কতটা কঠিন? মনের মধ্যে কি যুদ্ধ চলে না যে, কেন এটা করতে হচ্ছে?
শামি: না, ও সব ভাবছি না। অনেক দিন পরে আমি বাংলা দলের সঙ্গে এতটা সময় কাটাচ্ছি। পুরো মরসুম খেলছি। খুবই উপভোগ করছি। দারুণ একটা পরিবারের মতো আমরা সকলে রয়েছি। দল ভাল খেলছে, আশা করছি ভাল একটা মরসুম আমরা উপহার দিতে পারব। নিজের বোলিং নিয়েও আমি খুশি। সব চেয়ে খুশি এটা ভেবে যে, বাংলা দলের জন্য অবদান রাখতে পারছি।
প্র: এই যে সারা দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা পাশে দাঁড়িয়েছেন, সকলে এক সুরে বলছেন মহম্মদ শামিকে ফেরাও, সে সব দেখে কী মনে হচ্ছে?
শামি: ওঁদের সকলকে বলতে চাই, আমি চিরকৃতজ্ঞ। বলতে চাই, আপনাদের ভালবাসা, সমর্থনই তো আজ এই জায়গা পর্যন্ত আমাকে নিয়ে এসেছে। আপ লোগো কা প্যায়ার ইহাঁ তক লেকে আয়া হ্যায়। যদি এর পরেও কেউ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সেটা আপনাদেরভালবাসাই পারবে।
প্র: আর এক বার জানতে চাইছি। ২০২৫-এর শেষ সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে কোনও আক্ষেপ কি হচ্ছিল মনের মধ্যে?
শামি: কোনও আক্ষেপ নেই। কেন নেই জানেন? কারণ আমি নিজের কাছে পরিষ্কার। সব সময় নিজের সেরা সার্ভিস দিয়েছি। এটা অন্তত কেউ বলার সুযোগ পাবে না যে, শামি যথেষ্ট পরিশ্রম করেনি বলে ওকে আমরা নিইনি।
প্র: নতুন বছরের শপথ কী? প্রত্যাশা কী?
শামি: কোনও শপথ নেই, কোনও প্রত্যাশা রেখে এগোচ্ছি না। শুধু খেলে যাও। যব তক হ্যায় দম, খেলতে রহো।