ICC T20 World Cup 2026 Final

বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতিহাসের সামনে সূর্যকুমারের দল, অহমদাবাদের ‘গাঁট’ কাটিয়ে হ্যাটট্রিকের সুযোগ ভারতের সামনে

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে রবিবার ভারতের সামনে নিউ জ়িল্যান্ড। টানা দ্বিতীয় বার ট্রফি জেতার হাতছানি ভারতের সামনে। অহমদাবাদে আড়াই বছর আগে হৃদয়ভঙ্গের ব্যথা ভুলে ট্রফি জিততে পারবে ভারত?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ ১০:৪২
cricket

(বাঁ দিক থেকে) সঞ্জু স্যামসন, জসপ্রীত বুমরাহ, ম্যাট হেনরি এবং ফিন অ্যালেন। — ফাইল চিত্র।

ঠিক ৩৬৬ দিন আগের কথা। দুবাইয়ে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনাল খেলতে নেমেছিল ভারত এবং নিউ জ়িল্যান্ড। রোহিত শর্মা এবং শ্রেয়স আয়ারের সৌজন্যে সেই ম্যাচ সহজেই জেতে ভারত। ন’মাসের মধ্যে দ্বিতীয় বার আইসিসি ট্রফি জেতে। ভারতের ট্রফিজয়ের হ্যাটট্রিকের সামনে বাধা আবার সেই নিউ জ়িল্যান্ডই। রবিবার অহমদাবাদে কিউয়িদের হারিয়ে টানা দ্বিতীয় বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাস গড়ার সুযোগ রয়েছে সূর্যকুমার যাদবদের সামনে। তবে কাজ যে সহজ হবে, এমনটা মোটেই নয়।

Advertisement

গত বছরের ফাইনাল বাদ দিলে, নিউ জ়িল্যান্ড বরাবরই ভারতের সামনে গাঁট। ২০২১-এর বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে এই কিউয়িদের কাছেই হেরে গিয়েছিল ভারত। দু’বছর আগে নিউ জ়িল্যান্ডের কাছে ঘরের মাঠে টেস্ট সিরিজ়ে চুনকাম এখনও ভারতের কাছে দগদগে ক্ষতের মতো। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে হারিয়ে সেই ক্ষতে সামান্য প্রলেপ দেওয়া গিয়েছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিততে পারলে হয়তো ক্ষত অনেকটাই মিটবে।

দু’বছর আগে বার্বাডোজ়ে বিশ্বকাপ ফাইনালে ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার তফাত গড়ে দিয়েছিল সূর্যকুমারের একটি ক্যাচ। এ বার তিনি দলের অধিনায়ক। বাড়তি বোঝাও রয়েছে তাঁর কাঁধে। রান করতে পারছেন না। তবে বুদ্ধির সাহায্যে অধিনায়কত্ব করছেন এটা ঠিক। ফিল্ডিং থেকে বোলার পরিবর্তন, সূর্যকুমারের নেতৃত্বের মধ্যে পরিণতবোধ দেখা যাচ্ছে। টানা দু’বছর টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক থাকায় আস্থাও অর্জন করে নিয়েছেন। সাহসী ক্রিকেট খেলেছে দল। সব কিছুর পরীক্ষা হবে রবিবারই।

আজ পর্যন্ত কোনও দল পর পর দু’বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতেনি। জেতা তো দূর, ট্রফি জয়ী দল কখনও পরের বিশ্বকাপের ফাইনালেই ওঠেনি। এ বার সেটাই করে দেখিয়েছে ভারত। প্রথম দেশ হিসাবে টানা দু’বার বিশ্বকাপ জিতে নজির গড়ার হাতছানি ভারতের সামনে। তার জন্য ভাল খেলতে হবে গোটা দলকেই। বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল পর্যন্ত একজন বা দু’জনের ভরসায় জিতেছে ভারত। রোজ রোজ সেটাই হবে এমন নয়। সকলকেই দায়িত্ব নিতে হবে। কিন্তু ভারতের দু’-একজন ক্রিকেটার এতটাই খারাপ ফর্মে রয়েছেন যে ফাইনালেও তাঁদের উপরে ভরসা রাখা যাচ্ছে না।

প্রথম চিন্তার নাম অভিষেক শর্মা। তিনি কী ভাবে রানে ফিরবেন, তা ভেবে দলের বিশ্লেষক থেকে কোচ, সকলেরই মাথার চুল ছেঁড়ার উপক্রম। মুখে যতই অভিষেকের জয়গান করুন, ভেতরে ভেতরে চোরা অস্বস্তি অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। কোনও ম্যাচেই ভারতের ওপেনিং জুটি টিকছে না। তার একমাত্র কারণ অভিষেকের খারাপ ফর্ম। কিছুতেই যেন নিজের দুর্বলতা ঢাকতে পারছেন না। সেই অফস্পিনারের বলেই বার বার উইকেট দিচ্ছেন। লোকে ভুল থেকে শিক্ষা নেয়। কিন্তু অভিষেককে দেখে মনেই হচ্ছে না তিনি সে পথে হাঁটতে চান। ব্যাটিং কোচ সীতাংশু কোটাকের ভূমিকা নিয়ে আবার প্রশ্ন উঠছে। আলোচনা হচ্ছে দলে কোনও পেশাদার মনোবিদের না থাকা নিয়েও, যিনি অন্তত অভিষেকের সঙ্গে কথা বলে তাঁর মনোবল একটু ফেরাতে পারেন। অনেক সময়ই শুধু অনুশীলন নয়, মানসিক ভাবে চাঙ্গা করারও একটু দরকার পড়ে। অভিষেক অতটাও অভিজ্ঞ নন যে, একা একাই তিনি মানসিকতা বদলে ফেলবেন। কোচ, অধিনায়ক যতই পাশে থাকুন, তাঁরা মনোবিদ নন। কিছু কথা, কিছু আচরণ মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। অভিষেকের তেমনই কোনও উপদেশ দরকার ছিল এই মুহূর্তে।

একই কথা প্রযোজ্য বরুণ চক্রবর্তীর ক্ষেত্রেও। বিশ্বকাপ শুরুর আগে তাঁকে ভারতের তুরুপের তাস মনে করা হয়েছিল। প্রতিযোগিতা যত এগিয়েছে তত ফিকে হয়েছে বরুণের বোলিং। তাঁর বলের ধরন বুঝে ফেলেছে বিপক্ষ। জ়িম্বাবোয়ের মতো দলও বরুণ বোলিংয়ে যথেচ্ছ পিটিয়েছে। বরুণের সমস্যা হল, তাঁর বৈচিত্র ক্রমশ কমে এসেছে। বৈচিত্রের কারণেই তিনি কেকেআরের হয়ে ভাল খেলে ভারতীয় দলে ফিরেছিলেন। সেটাই এখন তাঁর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনায়াসে তিনি রবিচন্দ্রন অশ্বিনের সাহায্য নিতে পারতেন, যিনি ক্রিকেটজীবনে ছ’টি বল ছ’রকম ভাবে করতে পারতেন। কিন্তু বরুণ সে রাস্তায় হাঁটেননি। ফাইনালে আদৌ বরুণ খেললে তাঁর ওই চার ওভার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অভিষেকের মতো আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে বরুণের মধ্যেও। সেমিফাইনালে তাঁকে দিয়ে ঠিক কখন চতুর্থ ওভার করানো হবে তা বুঝতেই পারছিলেন না সূর্যকুমার। উইল জ্যাকস ফেরায় তড়িঘড়ি শেষ ওভারটি করিয়ে নেওয়া হয়। দলের ‘স্ট্রাইক বোলার’কে লুকিয়ে রাখতে হলে গোটা দলের কাছেই সেটা মুশকিলের।

এ সবের মধ্যেই যিনি ফাইনালে ফারাক গড়ে দিতে পারেন, তিনি ‘অহমদাবাদের সর্দার’ জসপ্রীত বুমরাহ। তাঁর চার ওভার ভারতের দিকে খেলা ঘুরিয়ে দিতে পারে। সেমিফাইনালে যে ভাবে শেষের দিকে দু’টি ওভার করেছিলেন, ওটাই ভারতকে জিতিয়ে দিয়েছিল। অহমদাবাদেও তাঁকে বুঝেশুনেই ব্যবহার করতে হবে। বিশেষত বিপক্ষের দুই মারকুটে ব্যাটার ফিন অ্যালেন এবং টিম সেইফার্টের সামনে বুমরাহ কেমন বল করেন, সে দিকে নজর থাকবে সকলেরই।

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার ঠিক আগেই নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ় খেলছিল ভারত। জিতেছিল ৪-১ ব্যবধানে। সেই সিরিজ়ে খেলা ৯০ শতাংশ কিউয়ি ক্রিকেটার বিশ্বকাপের দলে রয়েছেন। নিউ জ়িল্যান্ড অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার আগেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে ভারতে এত দিন থাকার কারণে বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন তাঁরা। বোঝাই যাচ্ছে, অহমদাবাদের ফাইনালে লড়াই কোনও অংশে কম হবে না।

ফাইনালে ভারতের লক্ষ্য থাকা উচিত সবার আগে নিউ জ়িল্যান্ডের দুই ওপেনারকে ফেরানো। অ্যালেন এবং সেইফার্টের মতো একজন ক্রিজ়ে টিকে গেলেই ম্যাচ জিতিয়ে দিতে পারেন। এর পর লক্ষ্য থাকা দরকার ড্যারিল মিচেল, গ্লেন ফিলিপসদের বেশি খেলতে না দেওয়া। নিউ জ়িল্যান্ডের টপ এবং মিডল অর্ডার যথেষ্ট শক্তিশালী। অহমদাবাদের পিচে স্পিনারদের সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই পেসারদের উচিত বলে বৈচিত্র এনে নিউ জ়িল্যান্ডকে বেকায়দায় ফেলা।

রইল পড়ে অহমদাবাদের মাঠ। ২০২৩-এর এক দিনের বিশ্বকাপ ফাইনালে এই মাঠেই হৃদয় ভেঙেছিল ভারতের। কিছু দিন আগে সুপার এইটে হারতে হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছেও। ক্রিকেটভক্তেরা জানেন, কলকাতার ইডেন গার্ডেন্স এবং মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ভারতীয় দলকে বাড়তি চাঙ্গা করে দেন সমর্থকেরা। বোলারেরা আটটি উইকেট নিলে দু’টি উইকেট নিয়ে নেন সমর্থকেরাই। অহমদাবাদে দর্শকসংখ্যা অনেক বেশি হলেও সমর্থনের এই তেজ নেই। তবু ভারতীয় দল এটুকু ভেবে উৎসাহ পেতে পারে যে, বিশ্বকাপের বৃহত্তম স্টেডিয়ামে কাপ তোলার যে মাহাত্ম্য তা আর অন্য কিছুতেই নেই। অহমদাবাদের ‘গাঁট’ কাটানোর এটাই তো সেরা সময়।

Advertisement
আরও পড়ুন