লক্ষ্য: লাল বলের ক্রিকেটে সাফল্য চান রামকৃষ্ণ। ছবি: সিএসকে।
আদ্যোপান্ত বাঙালি। বাড়িতে মা, বাবার সঙ্গে বাংলা ভাষাতেই সাবলীল ভাবে কথা বলেন। কিন্তু বাংলার হয়ে খেলেন না। রঞ্জি ট্রফিতে তিনি মহারাষ্ট্রের প্রতিনিধি। বাবা শেখর ঘোষ ছোটবেলাতে ঘাটাল মহকুমার ফুলসুরি গ্রাম থেকে নাসিকে চলে গিয়েছিলেন। ছেলে রামকৃষ্ণের জন্ম মহারাষ্ট্রেই।
শেখরবাবুর ইচ্ছে ছিল, তাঁর ছেলে ক্রিকেট খেলুক। তাঁর মতোই রঞ্জি ট্রফিতে মহারাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করুক। নিজের হাতেই তৈরি করেছেন ছেলেকে। রামকৃষ্ণ যখন নবম শ্রেণিতে পড়তেন, বাবা স্কুল ছাড়িয়ে দিয়েছিলেন। দিনে দু’বার অনুশীলন করলে স্কুল যাবেন কখন? শেখরবাবুর নির্দেশ ছিল, হয় পড়াশোনা বেছে নাও, নয় ক্রিকেট নিয়েই এগিয়ে যাও। রামকৃষ্ণ ক্রিকেটকেই বেছে নেন।
লেগস্পিনার থেকে পেস বোলার হওয়ার যাত্রাটা সহজ ছিল না। চোট-আঘাতে জর্জরিত তাঁর জীবন। কাঁধে অস্ত্রোপচার থেকে কোমরে চোট। এমন উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়েই চলেছে তাঁর জীবন। আইপিএলে চেন্নাই সুপার কিংসের জার্সিতে একটি ম্যাচে সুযোগ পেয়ে সূর্যকুমার যাদবের উইকেট নিয়েছিলেন রামকৃষ্ণ। কিন্তু ভাগ্য আবারও বেঁকে বসল। গোড়ালির হাড় ভেঙে যাওয়ায় চলতি মরসুম থেকেই ছিটকে গেলেন তরুণ পেসার।
ধূমকেতুর মতো জ্বলে হঠাৎ নিভে যাওয়ার কষ্টটা যেন ভেতর থেকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে রামকৃষ্ণকে। তবে মহেন্দ্র সিংহ ধোনির পরামর্শ আবারও নতুন করে শুরুর করার শক্তি দিয়েছে তাঁকে। প্রাক্তন ভারতীয় অধিনায়ক কী বলেছিলেন? আনন্দবাজারকে রামকৃষ্ণ বলেন, ‘‘মাহি ভাই বন্ধুর মতো মিশে যেতে পারে। বলেছে, চোট নিয়ে চিন্তা না করতে। প্রত্যেক ক্রিকেটারের জীবনেই এ রকম সময় আসে।’’ যোগ করেন, ‘‘চোট সারিয়ে ওঠার পরে সীমিত ট্রেনিং করার পরামর্শ দিয়েছে। বোলিং নিয়েও অনেক পরামর্শ পেয়েছি। কোন ব্যাটসম্যানের বিরুদ্ধে কী বল করা উচিত, সব কিছুই আলোচনা করতামমাহি ভাইয়ের সঙ্গে।’’
রামকৃষ্ণের বাবা মাইকেল হোল্ডিংয়ের ভক্ত। তিনি চেয়েছিলেন, ছেলের অ্যাকশনও হোল্ডিংয়ের মতোই হোক। শেখরবাবু বলছিলেন, ‘‘হোল্ডিং যেমন সহজ অ্যাকশনে ভয়ঙ্কর জোরে বল করত, আমিও চেয়েছিলাম রামকৃষ্ণ সে রকমই কিছু করুক। ওর গতি বাড়াতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। অ্যাকশন পাল্টাতে হয়েছে। রান-আপ পরিবর্তন করিয়েছি। ভারী ওজন তুলতে হয়েছে জিমে। তবেই না লেগস্পিনার থেকে পেসার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে।’’
মহারাষ্ট্রের হয়ে তিন ধরনের ক্রিকেটেই খেলে ফেলেছেন রামকৃষ্ণ। তবে অভিষেক হয়েছে টি-টোয়েন্টি দিয়েই। এখনও পর্যন্ত ১৩টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে ২৮টি উইকেট পেয়েছেন। ‘লিস্ট এ’ ক্রিকেটে ১১টি ম্যাচে ২১টি এবং টি-টোয়েন্টিতে ৯টি ম্যাচে দু’উইকেট রয়েছে। বিজয় হজারে ট্রফিতে এক ম্যাচে সাত উইকেট নিয়ে ঋতুরাজ গায়কোয়াড়ের মন জয় করেন। তখন থেকেই তাঁকে সিএসকে-তে নেওয়ার লক্ষ্যেছিলেন ঋতুরাজ।
রামকৃষ্ণের লক্ষ্য যদিও টেস্ট খেলার। শেখরবাবু বলছিলেন, ‘‘আমি মহারাষ্ট্রের হয়ে দীর্ঘদিন খেললেও দেশের হয়ে টেস্ট খেলতে পারিনি। আমার স্বপ্ন যেন ও পূরণ করতে পারে।’’ রামকৃষ্ণও নির্দ্বিধায় বলে দিলেন, ‘‘চোট সারিয়ে দ্রুত মাঠে ফিরতে চাই। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আরও উইকেট নিতে চাই। তা হলেই নানির্বাচকদের নজরে পড়ব!’’
আপাতত ১২ সপ্তাহ বিশ্রাম। তার পর থেকে শুরু হবে রিহ্যাব। রামকৃষ্ণের ক্রিকেটজীবনের উত্থানের মুহূর্তে এই চোট কাঁটার মতোবিঁধেছে ঘোষ পরিবারকে।