(বাঁ দিকে) বিরাট কোহলি এবং স্মৃতি মন্ধানা (ডান দিকে)। ছবি: এক্স।
দিল্লির বিরুদ্ধে আগের ম্যাচে ৯৬ রানে আউট হয়েছিলেন। শতরান হাতছাড়া হয়েছিল। ফাইনালেও হল না। ২০৪ রান তাড়া করতে নেমে ৮৭ রানের ইনিংস খেললেন স্মৃতি মন্ধানা। শতরান করতে না পারলেও রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুকে দ্বিতীয় বার চ্যাম্পিয়ন করলেন তিনি। আরও এক বার হেরে মাঠ ছাড়তে হল দিল্লি ক্যাপিটালসকে। টান টান ম্যাচে খুব কাছের বন্ধু মন্ধানার কাছে হারলেন জেমাইমা রদ্রিগেজ়।
গত বার পুরুষদের আইপিএল জিতেছে বিরাট কোহলির বেঙ্গালুরু। এ বার আবার মহিলাদের আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হল তারা। এই প্রথম বার পুরুষ ও মহিলাদের আইপিএলের দু’টি ট্রফিই রয়েছে এক দলের কাছেই। তবে কোহলিদের থেকে এগিয়ে রয়েছেন মন্ধানারা। দু’টি ট্রফি রয়েছে তাঁদের কাছে।
গত বার ডাগ আউটে বসে দিল্লি ক্যাপিটালসের হার দেখতে হয়েছিল সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে। গত বার দিল্লির মেন্টর ছিলেন তিনি। এ বার তিনি দায়িত্ব নেই। কিন্তু দিল্লি ক্যাপিটালসের ডিরেক্টর অফ ক্রিকেট ফাইনাল দেখতে পৌঁছে গিয়েছিলেন বডোদরা। প্রথম ইনিংসে দিল্লির ব্যাটিং দেখে মনে হয়েছিল, এ বার হাসিমুখে ফিরবেন সৌরভ। কিন্তু এ বারেও হল না। টানা চার বার ফাইনাল হারল দিল্লি। প্রথমে ব্যাট করে ২০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ২০৩ রান করে দিল্লি। মহিলাদের আইপিএলে ফাইনালে এটি কোনও দলের করা সর্বাধিক রান। সেই রান তাড়া করে ৬ উইকেট জিতল বেঙ্গালুরু।
কয়েক মাস আগে ভারতের এক দিনের বিশ্বকাপ জয়ে বড় ভূমিকা ছিল মন্ধানার। ভারতীয় ব্যাটারদের মধ্যে সর্বাধিক রান করেছিলেন তিনি। কিন্তু তার পরেই তাঁর জীবনে ঘটে বিপর্যয়। প্রেমিক পলাশ মুচ্ছলের সঙ্গে বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের আগের দিন জানা যায়, আপাতত বিয়ে স্থগিত। কয়েক দিন পরে বিয়ে ভাঙার কথা জানান মন্ধানা। ফিরে যান তাঁর একমাত্র ভালবাসা ক্রিকেটের কাছে। তাঁকে নিয়ে এই কয়েক মাস কম আলোচনা হয়নি। কিন্তু মন্ধানা নিজের লক্ষ্য থেকে সরেননি। অবশেষে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জবাব দিলেন তিনি। বুঝিয়ে দিলেন, ব্যক্তিগত জীবনে যতই ঝড় উঠুক, ক্রিকেট দিয়ে সবকিছুর মোকাবিলা তিনি করতে পারেন।
টস হেরে ব্যাট করতে নেমে শুরুটা ভাল হয়নি দিল্লির। উইকেট না পড়লেও পাওয়ার প্লে-তে দ্রুত রান করতে পারেননি দুই ওপেনার লিজ়েল লি ও শেফালি বর্মা। পাওয়ার প্লে-র পরে হাত খুলতে না খুলতেই ১৩ বলে ২০ রান করে আউট হন শেফালি। লিজ়েল করেন ৩০ বলে ৩৭ রান।
দিল্লির ইনিংসে গতি আনেন জেমাইমা ও লরা উলভার্ট। ফিল্ডিংয়ের ফাঁক খুঁজে চার মারছিলেন দুই ব্যাটার। লরেন বেল ছাড়া বেঙ্গালুরুর কোনও বোলার তাঁদের সমস্যায় ফেলতে পারেননি। বেল এই ম্যাচেও দেন ১৯ রান। গোটা প্রতিযোগিতায় ১২৮টি ডট বল করেছেন তিনি, যা মহিলাদের আইপিএলে রেকর্ড। জেমাইমা ৩৭ বলে ৫৭ রান করে আউট হন।
পাঁচ নম্বরে মারিজান কাপের বদলে শিনেল হেনরিকে নামায় দিল্লি। সেই সিদ্ধান্ত কাজে লাগে। হেনরি হাত খুলে খেলা শুরু করেন। ডেথ ওভার কাজে লাগান তিনি। শ্রেয়াঙ্কা পাটিল ও নাদিন ডি ক্লার্কের ওভারে একের পর এক বড় শট মারেন। তাঁকে সঙ্গ দেন উলভার্ট। শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ২০৩ রান করে দিল্লি। উলভার্ট ২৫ বলে ৪৪ রান করেন। হেনরি ১৫ বলে ৩৫ রানে অপরাজিত থাকেন।
প্রথম ইনিংসের পর মনে হচ্ছিল, রান তাড়া করতে সমস্যা হবে বেঙ্গালুরুর। কারণ, এ বারের প্রতিযোগিতায় বডোদরায় মাত্র এক বার ১৬০ রানের বেশি তাড়া করে জিতেছে কোনও দল। একে ফাইনাল, তার উপর ২০৪ রানের চাপ কি মন্ধানারা সামলাতে পারবেন, সেই প্রশ্ন উঠছিল। তার মধ্যে দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলেই ফর্মে থাকা গ্রেস হ্যারিসকে ফেরান হেনরি।
কিন্তু চাপে পড়েননি মন্ধানা ও জর্জিয়া ভল। তাঁরা রান তোলার গতি কমতে দেননি। পাওয়ার প্লে কাজে লাগান। শুরুতে ভলের স্ট্রাইক রেট অনেক বেশি ছিল। মন্ধানা একটি ধরে খেলছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনিও হাত খোলেন। দেখে মনে হচ্ছিল, বেঙ্গালুরুর বদলে দিল্লি চাপ নিয়ে ফেলেছে। ফিল্ডিংয়ে ভুল হল। ক্যাচ পড়ল। শ্রী চরণি, স্নেহ রানার মতো অভিজ্ঞ বোলারেরা ভুল জায়গায় বল ফেললেন।
প্রথমে অর্ধশতরান করেন ভল। শুরুর দিকের ম্যাচগুলিতে তিনি খেলার সুযোগ না পেলেও যে দিন থেকে প্রথম একাদশে জায়গা পেয়েছেন, বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর প্রতিভা। পিছিয়ে ছিলেন না মন্ধানাও। ২৪ বলে অর্ধশতরান করেন তিনি। ভলের থেকেও কম বল নেন। প্রতি ওভারে ১০ রানের বেশি উঠছিল। জরুরি রানরেট আয়ত্তের মধ্যেই ছিল। এই জুটি ভাঙতে পারছিলেন না দিল্লির বোলারেরা। প্রতি ওভারে বড় শট আসছিল।
যত সময় গড়াল তত চাপ বাড়ল দিল্লির উপর। বোলারেরা লাইন, লেংথ সব গুলিয়ে ফেলেছিলেন। মন্ধানা ও ভল একের পর এক বড় শটে দলকে জয়ের পথে নিয়ে যাচ্ছিলেন। শতরানের জুটি গড়লেন তাঁরা, যা এই আইপিএলে প্রথম। এ বার গ্রুপ পর্বের একটি ম্যাচে দিল্লির বিরুদ্ধে রান তাড়া করতে নেমে ৯৬ রান করেছিলেন মন্ধানা। অর্থাৎ, তিনি যে দিল্লির বিরুদ্ধে রান করতে ভালবাসেন, তার প্রমাণ আগেই পাওয়া গিয়েছিল। এই ম্যাচে আরও এক বার পাওয়া গেল। চলতি প্রতিযোগিতায় হরমনপ্রীত কৌরকে হারিয়ে কমলা টুপিরও মালিক হলেন মন্ধানা।
বাধ্য হয়ে নিজের শেষ তাস কাপের হাতে বল তুলে দেন জেমাইমা। তিনিও জুটি ভাঙতে পারেননি। শেষ ৩৬ বলে দরকার ছিল ৫৪ রান। হাতে ৯ উইকেট থাকায় বেঙ্গালুরুর জিততে খুবহ একটা অসুবিধা হওয়ার কথা ছিল না।
সেই সময় বেঙ্গালুরুকে ধাক্কা দেন মিন্নু মণি। ৫৪ বলে ৭৯ রান করে আউট হন ভল। ভাঙে ৯২ বলে ১৬৫ রানের জুটি। দ্রুত খেলা শেষ করার লক্ষ্যে রিচা ঘোষকে নামায় বেঙ্গালুরু। কিন্তু ৬ রান করে ছক্কা মারতে গিয়ে নন্দনী শর্মার বলে আউট হন রিচা। অন্ধকারের মধ্যে জয়ের হালকা আলো দেখতে পায় দিল্লি। শেষ ১২ বলে দরকার ছিল ১৮ রান। সেই ওভারে আউট হন মন্ধানা। ৪১ বলে ৮৭ রান করেন তিনি। পরের বলে রাধা যাদবের সহজ ক্যাচ ছাড়েন মিনু। সেটাই কাল হল। পর পর দু’টি চার মেরে ২ বল বাকি থাকতে বেঙ্গালুরুকে জিতিয়ে দিলেন রাধা।