উৎসব: ব্রাজ়িলকে সমতায় ফিরিয়ে নেমারের সঙ্গে গোলদাতা কাসেমিরো। সোমবার। রয়টার্স
ব্রাজ়িল বনাম জাপান বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের দ্বৈরথ ভারতীয় সময় সোমবার রাত সাড়ে দশটায় শুরু হল ভাবলে ভুল ভাবা হবে। বরং শিঙা ফোঁকাফুঁকি শুরু হয়ে যায় অনেক আগে থেকেই। আর তার কেন্দ্রে জাপানি ফুটবলের এক নতুন মুখ। তিনি কেন্টো শিয়োগাই— ম্যাচের আগে নিজের দেশের সাংবাদিকদের কাছে এমন এক মন্তব্য করে বসেন নেমারকে নিয়ে যে, বিতর্কের ঝড় বয়ে যায় এবং ব্রাজ়িল-জাপান দু’দেশের সম্পর্কের উপরে পর্যন্ত প্রভাব ফেলবে কি না, সেই আতঙ্ক তৈরি হয়ে যায়।
নেমার এই মুহূর্তে ব্রাজ়িল দলের প্রধান অস্ত্র না হলেও অতীত রেকর্ড অনুযায়ী, জাপানের বিরুদ্ধে সব চেয়ে সফল ফুটবলার। এর আগে জাপানের বিরুদ্ধে পাঁচটি ম্যাচে তিনি সাতটি গোল করেছেন, তিনটি ‘অ্যাসিস্ট’ অর্থাৎ গোলের সহায়তা রয়েছে। এই পরিসংখ্যান শিয়োগাইকে মনে করিয়ে দিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিলেন জাপানি সাংবাদিকেরা। শিয়োগাই জবাবে বলেন, ‘‘সে তো অনেক আগেকার, পুরনো নেমার। এই নেমার সেই নেমার নয়। জাপান খুব ভাল জায়গায় আছে। আমরা এ সব তথ্য নিয়ে চিন্তিত নই।’’ এর পর ব্রাজ়িল দলকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে একই রকম উপেক্ষার ঢংয়ে তিনি বলেন, ‘‘ব্রাজ়িল একটা সময়ে শক্তিশালী ছিল কিন্তু এখন একই কথা বলা যায় কি? আমার মনে হয়, ব্রাজ়িলের চেয়েও শক্তিশালী দল অনেক আছে এই বিশ্বকাপে। ফ্রান্স আছে, আর্জেন্টিনা আছে। ব্রাজ়িলকে নিয়ে দারুণ কিছু তো সাম্প্রতিককালে কানে আসেনি।’’
প্রথাগত সাংবাদিক সম্মেলনে এসে এই মন্তব্য করেননি তিনি। অনুশীলনের শেষে কথা বলছিলেন জাপানি সাংবাদিকদের সঙ্গে। সেই কারণে শিয়োগাইয়ের মন্তব্য জাপানের বাইরে বাকি পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু জানাজানি হওয়ামাত্র সমাজমাধ্যমে হা রে রে রে করে ঝাঁপিয়ে পড়েন ব্রাজ়িলীয় ফুটবলভক্তরা। পেলের দেশ শুধু সব চেয়ে বেশি বার বিশ্বকাপ জয়ী দেশই নয়, সমাজমাধ্যমে সব চেয়ে শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে কোন ফুটবল-দেশ, তার উত্তরেও ব্রাজ়িলের নাম করতে হবে। এবং, সেখানে সব চেয়ে বেশি আলোচিত নাম নেমার দা সিলভা স্যান্টোস জুনিয়র। বিশ্বকাপে খেলতে আসার আগে যখন কার্লো আনচেলোত্তি একটা সময় নেমারকে নেবেন না বলে শোনা যাচ্ছিল, তখন সমাজমাধ্যমে একের পর এক ‘মিম’ তৈরি করে তাঁকে এমন আক্রমণ করে ব্রাজ়িল জনতা যে, মনে হয়েছিল ইটালীয় কোচ না রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যান!
নিজেদের জাতীয় দলের কোচ যদি ছাড় না পান, তা হলে প্রতিপক্ষের কী হাল হতে পারে! শিয়োগাইয়ের ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলে ঢুকে তাঁকে এমন আক্রমণ করতে শুরু করেন নেমার-ভক্তরা যে, মাঠের দ্বৈরথ অনেক আড়ালে চলে যায়। শিরোনামে উঠে আসে মাঠের বাইরের বাগ্যুদ্ধ। দু’তিন ঘণ্টার মধ্যেই শিয়োগাইয়ের ইনস্টাগ্রামে প্রায় কুড়ি হাজার মন্তব্য পড়ে যায় ব্রাজ়িলীয় জনতার দিক থেকে। জাপান ফুটবলের উত্থানের নেপথ্যে জ়িকোর বড় অবদান। পর্তুগিজে একটি শব্দ আছে ‘ম্যালিসিয়া’, অনেকটা ইংরেজি ‘ম্যালিস’-এর মতো। যার স্বাভাবিক অর্থ হয়তো তিক্ততা বা হানিকর মানসিকতার দিকে ইঙ্গিত করে, কিন্তু পর্তুগিজ ভাষার ফুটবল দেশগুলিতে এর অন্য মানে রয়েছে। যখন খুব জোরালো আগ্রাসন, তীব্রতার সঙ্গে প্রতিপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার বার্তা দেন কোনও পর্তুগিজ় কোচ, তাঁদের মুখে শোনা যায়‘ম্যালিসিয়া, ম্যালিসিয়া’।
জ়িকো এই শব্দটাকে জাপানে জনপ্রিয় করে দিয়ে যান। তার আগে তিনি সেখানেও খেলেওছেন। জাপানে কোচিং করাতে নেমে প্রথম ক’মাস দেখেই তাঁর মনে হয়েছিল, এঁরা মার খেয়েই অভ্যস্ত, পাল্টা মার দিতে জানে না। তাই তাঁদের মধ্যে খুনে মানসিকতা গড়ে তোলার দিকে প্রথম নজর দেন। দেখেছিলেন, ম্যাচের আগে ফুটবলারেরা ধূমপান করছে, দশটা-পাঁচটা অফিস করে ছুটি হলে তবেই ফুটবলারেরা ট্রেনিংয়ে আসতে পারবে, পরিকাঠামো বলে কিছুই নেই। জাপানের ফুটবল প্রশাসকদের দিয়ে এ সবই পাল্টে ফেলেছিলেন জ়িকো। যে কারণে এখনও ‘সামুরাই ব্লু’-দের কাছে গুরুর মতো সম্মান পান ব্রাজ়িলের প্রাক্তন মহাতারকা। জাপানের কাশিমা শহরের দল, যাদের হয়ে জ়িকো খেলেছেন, সেখানে তাঁর দু’টো বিশাল মূর্তি আছে। একটা রাস্তা রয়েছে তাঁর নামে, একটা সমর্থকদের গ্রুপ আছে যার নাম ‘জ়িকো স্পিরিট’।
এখন ‘উদিত সূর্যের দেশ’-এর কোচেদের মুখে সারাক্ষণ শোনা যায় ‘ম্যালিসিয়া, ম্যালিসিয়া’। বোঝাই যাচ্ছে, জ়িকোর দেশের বিরুদ্ধেই সেই মনোভাব প্রয়োগ করতে এতটুকু দ্বিধা বোধ করছিল না হাজিমে মোরিয়াসুর কোচিংয়ে বিশ্বকাপ খেলতে আসা দল। জ়িকোর বিরুদ্ধে জে-লিগে খেলেছেন মোরিয়াসু। তিনিও মনে করেন, জাপানের ফুটবলে জ়িকোর চেয়ে প্রভাবশালী আর কেউ আসেনি। ২০০২-২০০৬, চার বছর জাপানে কোচিং করিয়েছিলেন জ়িকো। সেই সময় এএফসি এশিয়ান কাপ জেতে তারা। ফ্রেন্ডলিতে ইংল্যান্ড, জার্মানিকে হারায়। তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে এখন। রোম তো আর এক দিনেগড়া হয়নি!
কিন্তু জ়িকোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে গিয়ে আনচেলোত্তির ব্রাজ়িলের প্রতি নরম হতে যাব কেন? নেমার, এই ১৪-১৫ মিনিটের জন্য মাঠে নামা নেমারকে পুজো করতে গিয়ে নিজেদের আগ্রাসী মনোভাব বিসর্জন দিতে যাব কেন? তা হলে আর ‘ম্যালিসে’ কী করে হল? জাপান এবং শিয়োগাই তাই ম্যাচের আগে অতশত সৌজন্যের ধার ধারেনি। আর ব্রাজ়িল জনতা সমাজমাধ্যমে জ়িকোর প্রসঙ্গ টেনেও তাঁদের ঠেস দিতে ছাড়েনি। বলতে থাকে, ‘‘আমাদের এক সেরা দশ নম্বর গিয়ে তোমাদের খেলা শেখাল। এখন আর এক সেরা দশ নম্বরকে আক্রমণ করছে। অকৃতজ্ঞের দল।’’ এটা তা-ও তুলনায় অনেক ম্রিয়মান মন্তব্য তুলে দেওয়া হল। বেশির ভাগই ছাপার অযোগ্য। ব্রাজ়িলে প্রায় ২৫ লক্ষ জাপানি থাকেন, কাজ করেন। জাপানের বাইরে এত জাপানি আর কোথাও নেই। দু’দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক, বাণিজ্যিক সম্পর্ক বহু পুরনো। সেই সুদীর্ঘ ইতিহাসের তোয়াক্কা না করেই চলল তিক্তবাণ ছোড়াছুড়ি।
যাঁকে নিয়ে ফুটবলমহল উত্তপ্ত সেই কেন্টো শিয়োগাই কিন্তু এখনকার ফুটবলে উজ্জ্বল এক প্রতিভা, যাঁর সম্পদ চিতার মতো গতি। উসেইন বোল্টের ট্রেনিং পদ্ধতি জোগাড় করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। বলা হচ্ছে, তিনিই জাপানের ফুটবলের নতুন সূর্য। কিলিয়ান এমবাপেদের পাশাপাশি বিশ্বের দ্রুততম ফুটবলারদের তালিকায় রাখছেন অনেকে। একবার ট্রেনিংয়ে স্প্রিন্ট করার সময় ঘণ্টায় ৩৬.২ কিমি গতিবেগ তুলে চমকে দিয়েছিলেন সকলকে। শারীরিক শক্তি এবং প্রচণ্ড গতিতে ড্রিবলিংয়ের দক্ষতার কারণেই মোরিয়াসুর বিশেষ পছন্দ তিনি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ম্যাচের গতি পরিবর্তন করার জন্য তাঁকে পরিবর্ত হিসেবে নামান জাপানের কোচ। এ দিন অবশ্য তাঁকে মাঠে নামানো হয়নি। আনচেলোত্তি নামাননি নেমারকেও।
যদিও ম্যাচের আগে এই মন্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেননি আনচেলোত্তি। ব্রাজ়িলের কোচ হয়ে ফুটবল কর্তা বা ফুটবলারদের সামলানো আর সমাজমাধ্যমের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যে সম্পূর্ণ দুই পৃথিবী, তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন তিনিও। পুত্র দাভিদেকে তিনি এনেছেন সহকারী কোচ করে।পুত্রকে নিয়েও বিতর্কের ঝড়। স্কটল্যান্ড ম্যাচে নেমার নামার সময় নাকি দাভিদে ইশারায় কাউকে বলছিলেন, নামানোর দরকার নেই। তা নিয়ে উত্তাল পরিস্থিতি, নেমার-ভক্তরা আবার ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে এবং বিশ্বকাপের মাঝে ব্রাজ়িল দলে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে দেখে দাভিদে বিবৃতি দিয়ে জানান, সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন একটা ঘটনা রটানো হচ্ছে, তিনি এমন কিছুই করেননি। ম্যাচের হাইলাইট্স দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।
এক-এক সময় মনে হচ্ছিল, কড়া ট্রেনিং, ড্রিবলিং অনুশীলন, কোচের রণনীতি নির্ধারণের ক্লাস— শুধু এগুলো করলেই আর ফুটবলে সফল হওয়া যাবে না। সমাজমাধ্যম নামক যে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের দৈত্য তৈরি হয়েছে, তাকেও সামলাতে জানতে হবে। না হলে চরম মানসিক প্রভাব সৃষ্টি করে মাঠের দ্বৈরথের ভাগ্যও ঠিক করে দিয়ে যেতে পারেওই দৈত্য!