লিয়োনেল মেসির সঙ্গে কোচ লিয়োনেল স্কালোনি। ছবি: রয়টার্স।
প্রথম ৪৫ মিনিট বেঞ্চে বসে দলের সেরা তারকা। বিশ্বের সর্বকালের সেরা ফুটবলার লিয়োনেল মেসি। শুধু তিনি নন, প্রথম দুই ম্যাচে খেলা ন’জন ফুটবলারকেই দলে রাখেননি লিয়োনেল স্কালোনি। তাতে দলের খেলা বদলায়নি। দেখে মনে হয়নি, তিন জন নিজের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে নেমেছেন। এটাই স্কালোনির কীর্তি। দলের নিউক্লিয়াসটাই বদলে দিয়েছেন তিনি। মেসিকে ছাড়াও জিততে শিখে গিয়েছে আর্জেন্টিনা।
এই দলে দেখা যাচ্ছে ২০ বছর আগের আর্জেন্টিনার ঝলক। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে হোসে পেকারম্যানের কোচিংয়ে বিশ্বকাপ খেলতে নেমেছিল আর্জেন্টিনা। কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে জার্মানির কাছে হারলেও সে বারের খেলা মুগ্ধ করেছিল। ৫২ সেকেন্ডে ২৫ পাসের সেই গোল আজও বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অন্যতম সেরা মুহূর্ত।
সেই বছরই বিশ্বকাপে অভিষেক হয়েছিল মেসির। পেকারম্যানের সেই দলে ছিলেন স্কালোনিও। তিনি দেখেছিলেন, কী ভাবে তারকা সংস্কৃতি বাদ দিয়ে একটা দল তৈরি করা যায়। কোচ হওয়ার পর সেটাই করে দেখিয়েছেন স্কালোনি। এই আর্জেন্টিনা সুন্দর ফুটবল খেলে। এই আর্জেন্টিনার ২৬ ফুটবলারই তারকা। তাঁদের মাথার উপর বটগাছের মতো রয়েছেন মেসি।
মাঝের কয়েক বছরে ইউরোপীয় ঘরানার প্রভাবে আর্জেন্টিনার স্বাভাবিক খেলাটা শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেই খেলাটা ফিরিয়ে এনেছেন স্কালোনি। যে খেলা দেখাতেন মারিয়ো কেম্পেস, দিয়েগো মারাদোনারা। যে খেলায় ফুটবলারেরা বাঁচার চেষ্টা করেন না, বরং মাঠে লড়ার চেষ্টা করেন। যেন একটা যুদ্ধে নেমেছেন। প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে লড়াই।
জর্ডনের বিরুদ্ধে প্রথমার্ধেই তা দেখা গেল। নিকোলাস ওটামেন্ডি বা লিয়োনার্দো পারেদেসরা বাঁচার চেষ্টা করলেন না। বরং বল ধরে রাখলেন। প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করলেন। শারীরিক ক্ষমতা দেখালেন। ইউরোপের ফুটবলারেরা হাই প্রেসিং ফুটবল পছন্দ করেন না। গায়ের কাছে প্রতিপক্ষ আসার আগেই বল ছেড়ে দেন। কিন্তু এই আর্জেন্টিনা তা করে না। ফাউলের ভয় থাকলেও হাল ছাড়ে না।
গতিশীল ফুটবল খেলছে এই দল। একে অপরকে পাস দিচ্ছে যথেষ্ট গতিতে। সকলকে তা ধরতে হচ্ছে। বলকে নিয়ন্ত্রণে নিতে হচ্ছে। তা করতে করতে পরের ফুটবলার নিজের জায়গায় চলে যাচ্ছেন। দলগত ফুটবল খেলে প্রতিপক্ষের গোলের দিকে এগোচ্ছে আর্জেন্টিনা। আর সকলের সামনে রয়েছেন মেসি। এতে মেসির চাপও কমছে। তিনি অনেক বেশি বল পাচ্ছেন। কিন্তু মেসি না থাকলেও সমস্যা নেই। জিয়োভানি লো সেলসো, লাউতারো মার্তিনেজ়রা সেই কাজটা করছেন। একটা সিস্টেম তৈরি করতে পেরেছেন স্কালোনি। মেসি থাকুন বা না থাকুন, এই সিস্টেম এক ভাবে কাজ করছে।
ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেড ২৬ বছর পর প্রিমিয়ার লিগ জেতার দোরগোড়ায় ছিল। কিন্তু লিভারপুলের স্টিভেন জেরারের এক গোল তাদের স্বপ্ন শেষ করে দেয়। সেই গোলের দায় নিজের উপর নিয়েছিলেন স্কালোনি। পরের বার আর তাকে রাখেনি ওয়েস্ট হ্যাম। ফুটবল জীবন শেষ হয়ে যায় স্কালোনির।
ইংল্যান্ড থেকে স্পেনে চলে যান স্কালোনি। সেখানে কয়েকটা ক্লাবে খেললেও স্থায়ী হতে পারেননি। কিন্তু সেখানেই স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি বিয়ে করেন। সন্তান হয়। তার পরেই তাঁর জীবনে আসেন লুইস দে লা ফুয়েন্তে। চলতি বিশ্বকাপে স্পেনের কোচ বদলে দেন স্কালোনির জীবন। তাঁর অধীনেই কোচিংয়ে উয়েফা প্রো লাইসেন্স পান স্কালোনি। শুধু কোচের ডিগ্রি নয়, কোচ হিসাবেও স্কালোনিকে তৈরি করেন স্পেনের কোচ।
দে লা ফুয়েন্তের সবচেয়ে বড় গুণ, ফুটবলার খুঁজে বার করা। সেই কাজটাই করেছেন স্কালোনি। নিজের দেশের ফুটবলার। যাঁদের মধ্যে দেশকে জেতানোর আবেগ রয়েছে। যাঁরা ফ্রান্সের মতো অন্য দেশ থেকে ভাড়া করা ফুটবলার নন। তেমনই ফুটবলারদের নিয়ে দল গড়েছেন স্কালোনি। এই দলের সকলে আর্জেন্টিনার জন্য খেলেন। আর্জেন্টিনাকে জেতাতে খেলেন।
ইউরোপীয় ঘরানার প্রভাবে লাতিন আমেরিকার শিল্প নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ব্রাজ়িল। তাদের জোগা বোনিতো বা সুন্দর ফুটবল উধাও। রোনাল্ডো, রিভাল্ডো, রোনাল্ডিনহোদের খেলা এখন আর দেখা যায় না। আর্জেন্টিনার বেশির ভাগ ফুটবলার ক্লাব ফুটবলে ইংল্যান্ডে খেলেন। কিন্তু যখন তাঁরা দেশের হয়ে নামেন, তখন দেখা যায় লাতিন আমেরিকার ঘরানা। এই ঘরানা ফুটবলারদের মজ্জায় ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন স্কালোনি। ফুটবলারেরা নিজেদের থেকে আগে রাখেন দেশকে।
স্কালোনি জানেন, মেসি কেরিয়ারের শেষ প্রান্তে। ২০ বছর ধরে তিনি একা দলকে টেনেছেন। কিন্তু তিনি না থাকলে কী হবে? ১০ বছর আগেও যেমন মেসি খেলতে না পারলে গোটা দল দাঁড়িয়ে যেত, এখন তা হয় না। স্কালোনি জানেন, মেসির অবসরের পরেও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখবে আর্জেন্টিনা। আর সেই স্বপ্ন সত্যি করতে হলে এমন একটা দল তাঁকে তৈরি করতে হবে, যারা মেসির উপর নির্ভর করে না। মেসিকে ছাড়াও জিততে পারে। সত্যিই তেমন একটা দল গড়েছেন স্কালোনি। মেসিকে ছাড়াও জিততে শিখে গিয়েছে আর্জেন্টিনা।