FIFA World Cup 2026

বাবার অসুস্থতার মধ্যেও মহড়া মেসির

আর্জেন্টিনার একটি টিভি চ্যানেলে মেসির বাবা প্রয়াত বলে খবর প্রচারিত হওয়ার পর থেকেই সমাজমাধ্যম সারা দুনিয়ার মেসি-ভক্তদের প্রতিক্রিয়ায় ভরে যায়।

সুমিত ঘোষ
শেষ আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ ০৭:৪৭
বাবার অসুস্থতা নিয়ে ছড়িয়েছে চাঞ্চল্য। তার মধ্যেও বল পায়ে দেখা গেল লিয়োনেল মেসিকে।

বাবার অসুস্থতা নিয়ে ছড়িয়েছে চাঞ্চল্য। তার মধ্যেও বল পায়ে দেখা গেল লিয়োনেল মেসিকে। ছবি: রয়টার্স।

লিয়োনেল মেসির জাদুতে ফুটবল দুনিয়া সম্মোহিত থাকার মধ্যেই তাঁর বাবার অসুস্থতা নিয়ে বিতর্ক এবং অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হল। মেসির বাবা জর্জ মেসি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ঠিক কী অসুস্থতা, তা জানা যায়নি। তবে এর মধ্যেই রটে যায়, তিনি নাকি মারা গিয়েছেন। তা নিয়ে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ক্যানসাস সিটিতে থাকা আর্জেন্টিনা দলকে নিয়ে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়। সারা পৃথিবীতে দাবানলের মতো সেই ‘দুঃসংবাদ’ ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি বিশ্বকাপের ময়দান থেকে মেসি দেশে ফিরে আসছেন, এমন খবরও প্রচারিত হতে থাকে।

আর্জেন্টিনার একটি টিভি চ্যানেলে মেসির বাবা প্রয়াত বলে খবর প্রচারিত হওয়ার পর থেকেই সমাজমাধ্যম সারা দুনিয়ার মেসি-ভক্তদের প্রতিক্রিয়ায় ভরে যায়। সকলে তাঁদের প্রিয় তারকার জন্য সমবেদনা জানাতে থাকেন। বিভিন্ন টিভি চ্যানেল এবং সমাজমাধ্যমে আলজিরিয়া ম্যাচে গোল করার পরে মেসির কান্নার ছবি তুলে ধরা হয়। বলা হতে থাকে, এ বার পরিষ্কার হয়ে গেল কেন মেসি সেই রাতে গোল করে কাঁদছিলেন।

পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে, মেসি-পরিবার বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়। তারা জানায়, জর্জ মেসিকে নিয়ে যে খবর রটানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে স্বীকার করে নেওয়া হয় যে, মেসির বাবা অসুস্থ এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘‘জর্জ মেসির চিকিৎসা চলছে এবং তিনি চিকিৎসায় ভালই সাড়া দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে দয়া করে অমানবিক কোনও খবর রটাবেন না। এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পারিবারিক বিষয় এবং ভাল হয় যদি পারিবারিক গোপনীয়তাকে সম্মান করা হয়। যা রটানো হচ্ছে তা কোনও রকম খোঁজখবর না করেই রটানো হচ্ছে।’’ আরও বলা হয়, ‘‘এ সম্পর্কে সঠিক তথ্য একমাত্র মেসি পরিবারের কাছেই রয়েছে। তাই আমরা ছাড়া অন্য কোনও সূত্রের মাধ্যমে প্রকাশিত কোনও খবরে দয়া করে কেউ কর্ণপাত করবেন না।’’ বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশে সংবেদনশীল হওয়ার আবেদন জানানো হয় মেসি পরিবারের পক্ষ থেকে। বিবৃতিতে লেখা হয়েছে, ‘‘এমন একটা কঠিন সময়ে আরও দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন ভূমিকা এবং মানবিকতা আমরা আশা করব সকলের থেকে। কোনও মানুষের শারীরিক পরিস্থিতি এবং তাঁকে নিয়ে তাঁর নিকট আত্মীয়দের মানসিক অবস্থা অবশ্যই রটনার বিষয় হতে পারে না।’’ শেষে বলা হয়েছে, ‘‘যাঁরা জর্জ মেসির শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, খোঁজ নিয়েছেন তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, জল্পনায় কান দেবেন না। যদি কোনও খবর জানানোর থাকে, মেসি পরিবারের পক্ষ থেকেই তা জানানো হবে।’’

চর্চায়: দলের প্রস্তুতির ফাঁকে মেসি। ক্যানসাস সিটিতে।

চর্চায়: দলের প্রস্তুতির ফাঁকে মেসি। ক্যানসাস সিটিতে। ছবি: রয়টার্স।

আর্জেন্টিনার ‘লুজ়ু টিভি’ নামের চ্যানেলে মেসির বাবাকে নিয়ে এই খবর প্রচারিত হয়েছিল। যিনি সেই খবর পড়ছিলেন, পরিবারের বিবৃতির পরে সেই প্রেজ়েন্টার ইস্তফা দেন। ফ্লোরেন্সিয়া পেনা নামে এই সঞ্চালিকা টিভি-তে বলেছিলেন, ‘‘আমি দুঃসংবাদের ব্রেকিং নিউজ় দিতে চাই না। কিন্তু বলতেই হচ্ছে, মেসির বাবা এইমাত্র মারা গিয়েছেন।’’ এর পরেই তিনি ঘোষণা করেন, মেসি বিশ্বকাপের আসর থেকে দেশে ফিরে আসছেন। মেসির পরিবারের পক্ষ থেকে বিবৃতি জারি করার পরে পেনা একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে বলেন, জর্জ মেসির মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু জানা যায়নি। তা শোনার পরেই সমাজমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ বর্ষণ হতে থাকে। অনেকে বলতে থাকেন, এত বড় একটা খবর যদি নিশ্চিত করে জেনেই না থাকো তা হলে ঘোষণা করতে গেলে কেন?

বাড়তে থাকা ক্ষোভের মুখে ইস্তফা দেন সেই সঞ্চালিকা এবং সমাজমাধ্যমে এক বিবৃতিতে বলেন, ‘‘আমি মেসি এবং মেসি পরিবারের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। বুঝতে পারছি, এই কঠিন সময়ে আমি ওঁদের কতটা আঘাত দিয়ে ফেলেছি। আমি লজ্জিত।’’ লুজ়ু টিভির বেশ সুনাম রয়েছে আর্জেন্টিনায়। বিশেষ করে গত দু’বছর ধরে জনপ্রিয়তা বেড়েছে। মেসির বাবাকে নিয়ে এই ভুল খবরের পরে তাদের টিআরপি মারাত্মক ধাক্কা খেয়েছে। অন্তত দশটি স্পনসর তাদের ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। চ্যানেল কর্তৃপক্ষও ক্ষমা চেয়ে বিবৃতি দিয়েছে।

তবে মেসির বাবা যে অসুস্থ, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তাঁকে হাসপাতালেও ভর্তি করতে হয়েছে। প্রথমে তাঁকে রোসারিয়োর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, তার পরে বুয়েনস আইরেসে স্থানান্তরিত করতে হয়েছে বলে আর্জেন্টিনার সাংবাদিকদের খবর। হাসপাতালে রয়েছেন মেসির মা এবং তাঁর এক দাদা রদ্রিগো। আলজিরিয়ার বিরুদ্ধে গোল করার পরে কান্না নিয়ে সেই রাতে বিশেষ খোলসা করেননি মেসি। বলেছিলেন, এর সঙ্গে ফুটবলের কোনও সম্পর্ক নেই। এখন অনেকেই মনে করছেন, বাবার শারীরিক অবস্থার কথা ভেবেই হয়তো চোখের জল আটকাতে পারেননি তিনি। মেসির ফুটবলজীবনে জর্জ মেসি শুধু বাবাই নন, তাঁর প্রথম কোচ, তাঁর পথপ্রদর্শক সব কিছু। লা মাসিয়া অ্যাকাডেমিতে তাঁকে ভর্তি করা থেকে শুরু করে সব বড় চুক্তিতে তিনিই ছিলেন নেতৃত্বে। লা মাসিয়া যখন মেসির সঙ্গে চুক্তি করে, তাঁরা বাবাকে বার্সেলোনায় চাকরি দিয়েছিল। রোসারিয়োয় বাড়ি ফিরে যাবেন বলে কিশোর মেসি যখন কান্নাকাটি করতেন, তখন তাঁকে জর্জ মেসিই সামলাতেন কারণ তিনিই ছিলেন সব সময় ছেলের সঙ্গী। মেসির যাবতীয় বাণিজ্যিক দিকও তিনিই দেখাশুনো করেছেন এবং এখনও করছিলেন। তাঁর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর যে মেসির উপর খুবই প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

তবে বিশ্বকাপের ময়দান ফেলে বাড়ি ফিরে যাওয়ার কোনও লক্ষণ এখনও পর্যন্ত নেই। বাবার অসুস্থতার মধ্যেও ক্যানসাস সিটিতে দলের সঙ্গেই রয়েছেন মেসি এবং বৃহস্পতিবার অনুশীলনও করেছেন। সতীর্থদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টাও করতে দেখা গিয়েছে। ক্যানসাস সিটির কম্পাস মিনারেল্‌স সেন্টারকে কেন যে আর্জেন্টিনা বেসক্যাম্প হিসেবে বেছে নিয়েছে, তার অনেক কারণ আছে। সব চেয়ে বড় কথা লোকচক্ষুর আড়ালে শান্ত, নিরিবিলি কেন্দ্রে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি সারার সুযোগ রয়েছে। গত ডিসেম্বরে আর্জেন্টিনা ফুটবলের বিশেষ একটি দল এসে ক্যানসাস সিটি পরখ করে যায়। তখন সব কিছু দেখে তারা মনস্থির করে, এই কম্পাস মিনারেল্‌স সেন্টারকেই বিশ্বকাপের ডেরা বানাবে। সব চেয়ে বেশি করে তাঁদের পছন্দ হয় দুর্ধর্ষ জিমন্যাসিয়ামটিকে। স্কালোনি এবং তাঁর সহকারী কোচেরা অত্যাধুনিক ট্রেনিং ব্যবস্থা চালু করেছেন এই জিমেই। আলাদা আলাদা সব বিভাগ রয়েছে এবং তার নেতৃত্বে আলাদা কোচ, বিশেষজ্ঞরা। যেমন ‘নিউট্রিশন এরিয়া’। এর পর ‘ফিজ়িয়োথেরাপি এরিয়া’। রয়েছে ‘ফিজ়িক্যাল ট্রেনিং এরিয়া’। পয়েন্ট সিস্টেম চালু করা হয়েছে। কোনটায় কত পয়েন্ট তার চার্ট ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন হয়তো ১৫ মিনিট বাইক চালালে ৪০ পয়েন্ট। শরীরের উপরের ভাগের মেশিন ব্যবহার করলে ৩০ পয়েন্ট। দৈনিক ১৫০ পয়েন্ট টার্গেট দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মাঠে ট্রেনিংয়ে যাওয়ার আগে প্রত্যেক দিন অন্তত আধ ঘণ্টা জিমে কাটাতেই হবে। সঙ্গে বরফস্নান ও ম্যাসাজ় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নিউট্রিশনিস্টের দেওয়া খাদ্যাভ্যাস মানতে হবে। তার সুফলও পাওয়া যাচ্ছে হাতেনাতে। অন্তত দশ জনের চোট নিয়ে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ খেলতে ক্যানসাস সিটিতে এসেছিল। এখন প্রত্যেকেই সেরে উঠেছেন। নিকো তাগলিয়াফিকোও সেরে ওঠার মুখে। এর সঙ্গে আগুনে মানসিকতার ব্যাপারটিও রয়েছে। আলজিরিয়াকে উড়িয়ে দিয়েও আত্মতুষ্টি ঢুকতে দিচ্ছেন না স্কালোনি। একদিন ‘ফ্যামিলি ডে’ ছুটি দিয়েছেন। তা ছাড়া রোজ প্র্যাক্টিস। পাবলো এইমার ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে খেলেছেন। এখন স্কালোনির সহকারী কোচ হয়ে রয়েছেন এই বিশ্বকাপে। এর পর ডালাসে এখানকার সময় অনুযায়ী, সোমবার অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে নামবেন মেসিরা। এইমার বলেছেন, ‘‘অস্ট্রিয়া খুব ভাল দল। আলজিরিয়ার চেয়ে ওদের খেলার ধরন আলাদা। অনেক বেশি শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। আমাদের কাজ ওরা কঠিন করার চেষ্টা করবে।’’

আর লিয়োনেল মেসি? বাকি বিশ্বের মতো এইমারও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়ছেন, ‘‘অবিশ্বাস্য। আর শুধু ফুটবলার নেই মেসি, ও এখন এক জন সর্বোচ্চ মানের অ্যাথলিট।’’ কম্পাস মিনারেল্‌স সেন্টারে আর্জেন্টিনার অনুশীলন দেখার জন্য বৃহস্পতিবার সারা পৃথিবীর সংবাদমাধ্যম হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। ২০২৬ বিশ্বকাপে এখন সব চেয়ে চর্চিত ফুটবলারের নাম কী, তা বলার জন্য কোনওপুরস্কার নেই!

আরও পড়ুন