Aronyak Ghosh

প্রতিকূলতা জয় করে কিস্তিমাত

ভারতের ৯৫তম গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার অনুভূতি কেমন? সোমবার সকালে ব্যাঙ্কক থেকে ফোনে আনন্দবাজারকে উচ্ছ্বসিত আরণ্যক বললেন, ‘‘অসাধারণ। এই মুহূর্তটার জন্যই তো অপেক্ষা করছিলাম। আমার আরও আগেই গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়া উচিত ছিল। যাই হোক এখন আর আক্ষেপ নেই।’’

শুভজিৎ মজুমদার
শেষ আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২৪
স্বপ্নপূরণ: বাংলার দ্বাদশতম গ্র্যান্ডমাস্টার আরণ্যক।

স্বপ্নপূরণ: বাংলার দ্বাদশতম গ্র্যান্ডমাস্টার আরণ্যক। — নিজস্ব চিত্র।

তাঁর লড়াই শুধু দাবার বোর্ডে নয়, নিজের সঙ্গেও। থ্যালাসেমিয়ার বাহক হওয়ায় ক্লান্তি মাঝেমধ্যেই শরীরে থাবা বসায়। কিন্তু কোনও বাধাই লক্ষ্যচ্যূত করতে পারেনি তাঁকে। তিনি— বাংলার নতুন গ্র্যান্ডমাস্টার আরণ্যক ঘোষ।

তাইল্যান্ডের হুয়া হিনে ব্যাঙ্কক চেস ক্লাব ওপেনে রবিবার রাতে চূড়ান্ত নর্ম পেয়ে বাংলার দ্বাদশতম এব‌ং ভারতের ৯৫তম গ্র্যান্ডমাস্টার হলেন ২২ বছরের আরণ্যক। প্রায় চার বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পরে স্বপ্নপূরণ বাংলার দাবাড়ুর। বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে ৪০১ নম্বরে থাকা আরণ্যক প্রথম জিএম নর্ম পান ২০২৩ সালে স্যান্টস ওপেনে। পরের বছর দ্বিতীয় নর্ম পান অ্যানেমাস মাস্টার্সে। ২০২৫ ফিডে বিশ্বকাপেও যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন তিনি। হারিয়েছিলেন পোল্যান্ডের মাতেউস বার্টেলকে। যদিও শেষ পর্যন্ত হেরে গিয়েছিলেনলেভন অ্যারোনিয়ানের কাছে।

ভারতের ৯৫তম গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার অনুভূতি কেমন? সোমবার সকালে ব্যাঙ্কক থেকে ফোনে আনন্দবাজারকে উচ্ছ্বসিত আরণ্যক বললেন, ‘‘অসাধারণ। এই মুহূর্তটার জন্যই তো অপেক্ষা করছিলাম। আমার আরও আগেই গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়া উচিত ছিল। যাই হোক এখন আর আক্ষেপ নেই।’’ এর আগে ২,৫৫৫ পর্যন্ত রেটিং উঠেছিল আরণ্যকের। কিন্তু শেষ ধাপটা কিছুতেই পেরোতে পারছিলেন না। অবশেষে স্বপ্নপূরণ।

গাঙ্গুলি বাগানের আরণ্যকের দাবায় হাতেখড়ি মাত্র চার বছর বয়সে বাবা মৃণাল ঘোষের কাছে। চাকরির পাশাপাশি দাবার প্রশিক্ষণও দেন তিনি। আরণ্যকের দাবাড়ু হয়ে ওঠার চমকপ্রদ কাহিনি শোনালেন মৃণালবাবু। বললেন, ‘‘শৈশবে আমিও দাবা খেলতাম। ১৯৮৬ সালে আমি যখন ক্লাস টেনে পড়তাম, তখন বাবা হৃদ‌্‌রোগে আক্রান্ত হন। আমার দাবা খেলা বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৮ সালের শেষ দিকের কথা। আরণ্যকের বয়স তখন মাত্র সাড়ে চার বছর। এক দিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখলাম, ও আমার দাবার ঘুঁটিগুলি নিয়ে খেলছে। রাজা, রানি, মন্ত্রীকে লক্ষ্য করে বাকি ঘুঁটিগুলি ছুড়ছে। ভাবলাম আমার তো হল না, দেখি আরণ্যককে যদি দাবা খেলা শেখানো যায়। সেই শুরু। মাত্র চার-পাঁচ মাসের মধ্যেই আরণ্যক দারুণ খেলতে শুরু করে দিল। পরে ওকে ভর্তি করে দিই দিব্যেন্দু বড়ুয়ার অ্যাকাডেমিতে।’’

বিশ্বনাথন আনন্দ বা ম্যাগনাস কার্লসেন নন, আরণ্যকের আদর্শ বাংলার আর এক গ্র্যান্ডমাস্টার দীপ্তায়ন ঘোষ। কেন? আরণ্যক বললেন, ‘‘বাবা এবং দীপ্তায়নদাকে দেখেই দাবার প্রতি আমার ভালবাসা জন্মেছে। ওঁদের জন্যই আমি এই জায়গায় আসতে পেরেছি।’’ আরণ্যকের বাবা বললেন, ‘‘ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলাম আমি। আরণ্যককে সঙ্গে নিয়েই খেলতে গিয়েছিলাম। খেলা ম্যাচ হওয়ার পরে ওকে দেখতে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ চোখ পড়ল ১০-১১ বছর বয়সি একটি ছেলের বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে আরণ্যক। যার নাম দীপ্তায়ন ঘোষ। পরবর্তীকালে গ্র্যান্ডমাস্টার হয়। ও-ই আরণ্যকের আদর্শ।’’

গ্রান্ডমাস্টার হওয়ার এই যাত্রাপথ কতটা কঠিন ছিল? আরণ্যক কোনওরকম রাখঢাক না রেখেই বলে দিলেন, ‘‘দাবাখুবই ব্যয়বহুল খেলা। ভাল প্রশিক্ষণ দরকার। নিয়মিত বিদেশে প্রতিযোগিতায় খেলা দরকার। দেশের অন্যান্য রাজ্যের খেলোয়াড়দের স্পনসর রয়েছে। কিন্তু বাংলায় দাবাড়ুরা সে রকম সাহায্য পায় না। আশা করছি, এক দিন এই পরিস্থিতিও বদলাবে।’’ শারীরিক সমস্যা কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি? প্রতিপক্ষকে ‘চেকমেট’ করার ভঙ্গিতে বার্সেলোনার ভক্ত আরণ্যকের উত্তর, ‘‘থ্যালাসেমিয়ার বাহক হওয়ার কারণে দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়লেও খেলা চালিয়ে গিয়েছি। কখনওই শারীরিক সমস্যার কাছে আত্মসমর্পণ করি না।’’

আরও পড়ুন