Dol utsav

রাধাকৃষ্ণের সঙ্গেই দোলোৎসব কাটুক এই বছর, ঐতিহ্যের রঙে রঙিন হতে বেছে নিন ৩ ঠিকানা

শ্রীকৃষ্ণ-মদনমোহনের নামে বাংলার নানা প্রান্তে পালিত হয় দোলের নানা আচার-অনুষ্ঠান। এমনই ঐতিহ্যের দোলোৎসবে সাক্ষী হতে বেছে নিতে পারেন কলকাতার অদূরে তিন ঠিকানা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০২ মার্চ ২০২৬ ১২:০৬
রঙের উৎসব উদ্‌যাপনে  চলুন  এমন  জনপদে যেখানে রয়েছে ঐতিহ্য, আছেন রাধাকৃষ্ণও।

রঙের উৎসব উদ্‌যাপনে চলুন এমন জনপদে যেখানে রয়েছে ঐতিহ্য, আছেন রাধাকৃষ্ণও। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

বসন্ত প্রকৃতিতে রং ধরেছে। লাল, হলুদ, কমলা ফুলে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে পলাশ গাছগুলি। সেজেছে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া। ফুটেছে শিমুলও। তবে এই রং যেন পূর্ণতা পায় দোলোৎসবে। আবিরে, রঙে, হাসিতে, গানে, আড্ডায় ছড়িয়ে পড়ে খুশির আবহ।

Advertisement

উত্তরপ্রদেশ, বারাণসীতে যেমন দোলোৎসবকে ঘিরে আগে থেকেই অনুষ্ঠানের সূচনা হয়, বাংলাতেও থাকে বর্ণময়তা। শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবে থাকে সাংস্কৃতিক ছোঁয়া, আবার মায়াপুরের উৎসবে জুড়ে যায় আরাধ্যের প্রতি ভক্তের আবেগ। তবু শুধু শান্তিনেকতন বা মায়াপুর নয়, শ্রীকৃষ্ণ-মদনমোহনের নামে বাংলার নানা প্রান্তে পালিত হয় দোলের নানা আচার-অনুষ্ঠান। এমনই ঐতিহ্যের দোলোৎসবের সাক্ষী হতে বেছে নিতে পারেন কলকাতার অদূরের তিন ঠিকানা।

শান্তিপুর

শান্তিপুরে আছে মন্দির, রয়েছে বিগ্রহ বাড়ি। সেখানে রাধাকৃষ্ণের পুজো হয়।

শান্তিপুরে আছে মন্দির, রয়েছে বিগ্রহ বাড়ি। সেখানে রাধাকৃষ্ণের পুজো হয়। ছবি:সংগৃহীত।

চৈতন্যতীর্থ হিসাবে খ্যাতি নদিয়া জেলার শান্তিপুরের। রাস উৎসবের সঙ্গে নাম জুড়ে প্রাচীন এই জনপদটির। তবে শান্তিপুরের দোলও কম জনপ্রিয় নয়। দোল এখানে এক দিনের অনুষ্ঠান নয়, বরং পূর্ণিমার দোল ছাড়াও প্রতিপদ, পঞ্চম, সপ্তম দোল পালিত হয় এখানে। অনুষ্ঠানে মাতেন এলাকাবাসী। আসেন উৎসাহী পর্যটকেরাও।

গোকুলচাঁদের দোল হয় পূর্ণিমায়। দোল উপলক্ষে আয়োজিত হয় বিশেষ পুজো, কীর্তন। বিগ্রহে আবির দেওয়ার সুযোগ পান ভক্তেরা। শান্তিপুরের শ্যামচাঁদ মন্দিরে রয়েছেন শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধিকা। প্রতিপদে ঘটা করে পুজোআচ্চা হয় সেখানে, বসে কীর্তনের আসর। সন্ধ্যায় শ্যামচাঁদ নগর পরিক্রমায় বার হন। অংশ নেয় আরও অনেক মন্দির। পুরনো পরিবারগুলি বা বিগ্রহবাড়ির দোলোৎসবেও কম ঘটা হয় না। এক এক পরিবারের এক এক রকম রীতি।

তবে শান্তিপুরের অন্যতম আকর্ষণ বারোয়ারি পুজো। সেখানে হয় গোপাল পুজো। এমনিতে সে ছোট্ট হলেও, মূর্তির আকারে ছোট নয় মোটেই। দোলে শান্তিপুরে এলে দেখা মিলবে সার দিয়ে সাজিয়ে রাখা ছোট-বড় নানা আকারের গোপালের। কী অপূর্ব তার মুখাবয়ব, মৃত্তিকার অলঙ্কার! চৌগাছার বড় গোপালের পুজো বিখ্যাত। মেজগোপাল, ছোটগোপালও আছে এখানে। অলঙ্কার পরিয়ে, বিশেষ ভাবে সজিয়ে ধুমধাম করে পুজো হয়। কয়েক দিন ধরে চলে উদ্‌যাপন।

আর যদি দোলে বিগ্রহের পায়ে আবির দিয়ে নিজেরা রং খেলতে চান, সেই সুযোগও রয়েছে। শান্তিপুরের পার্কেই দোলে উৎসব হয়। পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্যানে আসেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি আবির মাখিয়ে রঙের উৎসব উদ্‌যাপিত হয়।

কী ভাবে যাবেন

শিয়ালদহ থেকে শান্তিপুর লোকাল আছে। অথবা নদিয়াগামী যে কোনও ট্রেন ধরেই এখানে নামতে পারেন। টোটো করে ঘুরে নিতে পারেন, এখানকার মন্দিরগুলি। কলকাতা থেকে সরাসরি গাড়িতেও আসতে পারেন। কলকাতা থেকে দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারের মতো। মোটমুটি ২ থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগবে পৌঁছোতে।

কোথায় থাকবেন

শান্তিপুরে থাকার জন্য গঙ্গার ধারেই রিসর্ট হয়েছে। এ ছাড়াও হোটেল পেয়ে যাবেন। রাতে থাকতে না চাইলে, সারা দিন ঘুরে সন্ধ্যায় ফিরেও আসতে পারেন।

বিষ্ণুপুর

মদনমোহন মন্দিরে প্রতি বছর দোলৎসব হয়। পরদিন হয় শোভাযাত্রা।

মদনমোহন মন্দিরে প্রতি বছর দোলৎসব হয়। পরদিন হয় শোভাযাত্রা। ছবি:সংগৃহীত।

এক সময় হারমোনিয়াম, করতাল, ঢোল নিয়ে গাইয়ের দল রং মেখে, আবির ছড়াতে ছড়াতে পথ পরিক্রমা করত। জনপ্রিয় হিন্দি-বাংলা গানের সুরে গাওয়া হত রাধাকৃষ্ণের নামগান। গান বাঁধতেন স্থানীয় বাসিন্দারাই। সেই ছবি এখন স্মৃতির পাতায়। অন্য আর পাঁচ জায়গার মতো বিষ্ণুপুর শহরে এখন প্রভাতফেরি হয় দোলোৎসবে। পোড়ামাটির হাটে হয় বসন্তোৎসব। ভিড় করেন পর্যটকেরা।

তবে বিষ্ণুপুরের দোলোৎসবের ঐতিহ্য বেশ পুরনো, বলছিলেন এখানকার বাসিন্দা কবি কৌশিক বাজারি। মল্ল রাজাদের এক সময়ের রাজধানী বিষ্ণুপুরে রয়েছে অসংখ্য টেরাকোটার মন্দির। তাঁদের প্রধান উপাস্য ছিলেন মদনমোহন। শাঁখারি বাজারে রয়েছে এক রত্নের টেরাকোটা মন্দির। সেখানে প্রতি বছর দোলে মদনমোহনের পুজো হয়। কীর্তনের আসর বসে। পরের দিন বিগ্রহের পায়ে আবির দিয়ে শোভাযাত্রাও হয়।

বিষ্ণুপুরে টেরাকোটার মন্দিরগুলির বেশ কয়েকটি রয়েছে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের তত্ত্বাবধানে। তার মধ্যে কয়েকটি মন্দির বিগ্রহশূন্য। সেখানে পুজোআচ্চা হয় না। তবে পর্যটক মহলে ততটাও জনপ্রিয় নয়, এমন কিছু মন্দিরেও দোলোৎসবের আচার মেনে পূজার্চনা হয়। সেই তালিকায় রয়েছে মাধবগঞ্জের মদনগোপাল মন্দির, জোড়বাংলার কাছে রাধেশ্যাম মন্দিরও। এই মন্দিরে কৃষ্ণ পূজিত হন শ্যামরূপে।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া বা শালিমার স্টেশন থেকে ট্রেনে সরাসরি বিষ্ণুপুর পৌঁছতে পারেন। ধর্মতলা থেকে বাঁকুড়াগামী বাস ধরেও বিষ্ণুপুর যাওয়া যায়। কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়ে আরামবাগ, জয়পুরের জঙ্গল হয়েও সেখানে পৌঁছোতে পারেন। দূরত্ব ১৪০ কিলোমিটার। যেতে চার-সাড়ে চার ঘণ্টা সময় লাগবে।

কোথায় থাকবেন

বিষ্ণপুর সার্কিট হাউস রয়েছে। একধিক ছোট-বড় হোটেল, রিসর্ট পেয়ে যাবেন।

খড়দহ

খড়দহের দোলমঞ্চে আবিরে রাঙা বিগ্রহ।

খড়দহের দোলমঞ্চে আবিরে রাঙা বিগ্রহ। ছবি:সংগৃহীত।

গঙ্গাতীরের আর এক প্রাচীন জনপদ খড়দহ। এখানেই রয়েছে কয়েকশো বছরের পুরনো শ্যামসুন্দর মন্দির, যাকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা। মন্দির থেকে বিগ্রহ তৈরির নেপথ্যে রয়েছে সুদীর্ঘ কাহিনি। শ্রীরামকৃষ্ণদেবও খড়দহে এসে শ্যামসুন্দর দর্শন করেছিলেন।

প্রতি বছর দোলে শ্যাম এবং রাধিকার বিগ্রহ চতুর্দোলায় চাপিয়ে নদী তীরবর্তী দোলমঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়। শুরু হয় আবির খেলা। বিগ্রহের পায়ে আবির দিয়ে শুরু হয় উৎসব। দুপুরে শ্যাম ফেরেন তাঁর মন্দিরে। বিশেষ ভোগ, পুজোর আয়োজন হয়। বিকেলে বিগ্রহ বার করা হয় মন্দির দালানে। মঠ-ফুটকড়াই লু্ট এখানকার আর এক রীতি। আরাধ্যের পায়ে আবির দিতে আসেন ভক্তেরা।

দোলোৎসব দোলমঞ্চের পাশাপাশি আবির খেলা হয় গঙ্গাতীরের বাঁধানো চত্বরে। কিশোর-কিশোরীরারা ভিড় করে। গান, আড্ডা, গল্পে হয় বসন্তোৎসব উদ্‌যাপন।

প্রতি দিনই শ্যামের মন্দিরে নানা রকম ব্যঞ্জনে ভোগ খাওয়ানোর বন্দোবস্ত থাকে। তবে বিশেষ অনুষ্ঠানে সেখানে বসে ভোগ খাওয়ার সুযোগ না-ও মিলতে পারে। শ্যামসুন্দর মন্দিরের আশপাশেই রয়েছে গোপীনাথ জিউ মন্দির, রাধাকান্ত জিউ-সহ বেশ কয়েকটি মন্দির।

এখান থেকেই স্থানীয় লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে গলিপথে পৌঁছে যেতে পারেন ২৬ শিব মন্দিরে। ২০০ বছরের পুরনো মন্দিরে রয়েছে টেরাকোটার কাজ। মন্দিরগুলি আটচালা শৈলীতে নির্মিত। বড় চত্বর জুড়ে সার দিয়ে মন্দির। টেরাকোটার মন্দিরের কিছু কাজ নষ্ট হয়ে গেলেও, এখনও রয়েছে কিছুটা। ২১টি মন্দির আয়তক্ষেত্রের ছকে সাজানো হয়েছে। বাকি মন্দিরগুলি রাস্তা পার করে গঙ্গার দিকে মুখ করে নির্মিত। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ এই স্থানটি রক্ষণাবেক্ষণ করে।

কী ভাবে যাবেন

শিয়ালদহ থেকে ব্যারাকপুর লাইনের যে কোনও ট্রেনেই খড়দহ পৌঁছনো যায়। দোলের দিন গঙ্গার ঘাটে খেয়া পারাপার বন্ধ থাকে। তাই শ্রীরামপুর ধোবিঘাট হয়ে আসার চেষ্টা না করাই ভাল। কলকাতা থেকে সরাসরি গাড়িতে আসতে পারেন ডানলপ হয়ে।

কোথায় থাকবেন

সেই ভাবে খড়দহে থাকার জায়গা মিলবে না। তবে খড়দহের অদূরে গান্ধীঘাটের কাছে থাকার বন্দোবস্ত রয়েছে।

Advertisement
আরও পড়ুন