ঘুরে ফিরলেই বাড়বে ত্বকের জেল্লা! এমন সফরে কী করে যাবেন? ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।
দিন দশেকের জন্য বেড়াতে গেলেন। যখন ফিরলেন, চেনাই দায়!
ধকলের ছাপ নেই। ক্লান্তিও নেই। বরং মুখ-চোখ বাড়তি আভা। টানটান-উজ্জ্বল ত্বক। সাগরতটে বেড়াতে গেলে যেখানে দোসর হয় রোদে পোড়া কালচে ছাপ বা ট্যান, বালি-নোনা জলের ধাক্কায় চুল হয়ে পড়ে রুক্ষ, সেখানে এমন বদল কী করে সম্ভব? তরুণ প্রজন্ম মজেছে এমনই এক অন্য ধারার সফরে, যেখানে দিন ৫-১০ দিন কাটিয়ে আসার পরে প্রাপ্তি শুধু ফুরফুরে দেহ-মন নয়, উজ্জ্বল সুন্দর ত্বক।
বিষয়টি খোলসা করা যাক। ধরুন, আপনি কলকাতায় বসে তাই-স্পা উপভোগ করেন। সেই একই স্পা যদি তাইল্যান্ডে গিয়ে সরাসরি সেখানকার পেশাদার সালোঁয় করান? ব্যাংকক, ফুকেত-সহ তাইল্যান্ডের যে কোনও বড় শহরে রয়েছে একাধিক স্পা সেন্টার, মাসাজ পার্লার। সমুদ্র-পাহাড় ভ্রমণের সঙ্গে যদি জুড়ে যায় নিজের ভাল থাকা, আরাম, ত্বকের যত্ন এবং তা-ও অত্যন্ত সুচারু ভাবে, তবে কেমন হয়? এমন ভ্রমণের ধারাকেই এখন অনেকে ইংরেজিতে বলছেন ‘গ্লোকেশন’। যার সরল বাংলা হতে পারে ‘রূপসফর’।
রূপসফরের প্রকৃতি এবং উদ্দেশ্য
ঝটিকা সফর নয়, দশ দিনে দশ জায়গা দেখাও নয়, রূপসফরের উদ্দেশ্যই হল সৌন্দর্য বৃদ্ধি। শরীর-মনের খেয়াল রাখতেই এমন ভ্রমণসূচি সাজানো হচ্ছে। শুধু পার্লার বা স্পা কেন্দ্রে যাওয়া নয়, স্থানীয় আবহাওয়া, সেই জায়গার খাদ্যতালিকা, জীবনযাপন— সব কিছুরই ইতিবাচক প্রভাব থাকে এমন সফরে। ভ্রমণ সংক্রান্ত একাধিক সংস্থার রিপোর্টে প্রকাশ, জেন জ়ি মজেছে এমন সফরেই। দেশ-বিদেশে সঠিক মূল্যে হোটেল, উড়ান এবং ভ্রমণ সংক্রান্ত পরিষেবা খুঁজে দিতে সাহায্যকারী একটি সংস্থার (স্কাইস্ক্যানার) সাম্প্রতিক সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, চলতি বছরে, ৩৮ শতাংশ জেন জ়ি বেড়াতে গিয়ে প্রসাধনীর বাজার এবং ত্বকের চিকিৎসা হয়, এমন জায়গার খোঁজ করছেন। বিশ্ব জুড়ে সফরকারীদের মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশ স্থানীয় রূপচর্চা সংক্রান্ত পরিষেবা নিয়ে উৎসাহ দেখাচ্ছেন। নিজের এলাকায় চট করে মেলে না, বেড়াতে গিয়ে এমন প্রসাধনীর খোঁজ করছেন ৪৫ শতাংশ পর্যটক। বেড়াতে গিয়ে নিজের মতো করে ত্বকের যত্ন নেওয়ার প্রবণতাও অনেকটাই বাড়ছে। নানা দেশের সৌন্দর্যচর্চা শুধু সমাজমাধ্যমে দেখেই তুষ্ট থাকছে না নতুন প্রজন্ম, বরং তাদের উৎসাহে রূপচর্চা অন্য মাত্রা পাচ্ছে।
২০২৬-এ রূপসফরের ঠিকানা কোথায় কোথায় হতে পারে
কেরল
কেরলের প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি। ব্যবহার হয় ভেষজ উপাদান। ছবি:শাটারস্টক।
ভেষজ তেল মাসাজ়ের মাধ্যমে চিকিৎসা পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে কেরলে। নানা রকম জড়িবুটি দিয়ে ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধির পন্থাও জনপ্রিয়। সঠিক কায়দায় সারা শরীরে তৈলমর্দন করলে, রক্ত সঞ্চালন ভাল হয়। মাসাজ় যেমন বডি ডিটক্সে সাহায্য করে, তেমনই ত্বকের জেল্লা বৃদ্ধি করে। এখানে রয়েছে ‘স্টিম থেরাপি’-সহ একাধিক বিউটি ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা, তবে সবই ভেষজ উপায়ে। তিরুঅনন্তপুরমের মতো সৈকত শহরে সমুদ্রের ধার বরাবর এমন ভেষজ রূপচর্চা কেন্দ্রগুলি গড়ে উঠেছে। এখানেই রয়েছে ভারতের অন্যতম সুন্দর সমুদ্র সৈকত কোভালম। এমন কোনও একটি থাকার স্থান বেছে নিলে ৪-৫দিন সেখানেই আরাম করে দিন কাটবে, আবার রূপচর্চাও করা যাবে।
হৃষীকেশ
যোগভ্যাসেও ভাল থাকে স্বাস্থ্য, উজ্জ্বল হয় ত্বক। ছবি:সংগৃহীত।
উত্তরাখণ্ডের এই শৈলশহরের খ্যাতি যোগ-প্রশিক্ষণের জন্য। হিমালয়ের সৌন্দর্য আর প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ যোগ প্রশিক্ষণে শুধু শরীর-মন তরতাজা হয় না, নিয়ম করে তা অভ্যাস করলে ত্বকেও ফেরে দীপ্তি। এই প্রক্রিয়ায় শরীরে ভাল ভাবে অক্সিজেন পৌঁছোয়, স্নায়ু শান্ত হয়। তার প্রভাব পড়ে ত্বকেও। প্রকৃতির আঙিনায় যোগ্যাভ্যাস এখানকার বিশেষ পাওয়া।
উদয়পুর: রাজস্থানের এই জনপদটি পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে যথেষ্ট জনপ্রিয়। এখানে সুযোগ রয়েছে বৈভবপূর্ণ রূপসফরের। এখানকার ঐতিহ্যপূর্ণ নামী হোটেলে কাপল স্পায়ের ব্যবস্থা থাকে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতেই স্পায়ের আনন্দ নেওয়া যায়।
ভারতের যে কোনও বড় শহর, পর্যটন কেন্দ্রেই রূপচর্চা, স্পা পরিষেবা মেলে। বিশেষত বড় বড় হোটেলগুলিতে এই ধরনের পরিষেবা আলাদা করে পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে দেওয়া হয়।
গন্তব্য হতে পারে বিদেশও
সিওল
কে-বিউটি নিয়ে চর্চা বিশ্বজুড়ে। সিওলে গিয়েও রূপচর্চা করিয়ে আসতে পারেন।
কে-বিউটি নিয়ে চর্চা বিশ্বজনীন। দক্ষিণ কোরিয়ার সিওলকে মনে করা হয় রূপচর্চার রাজধানী। এখানে এসেও কে-বিউটি ট্রিটমেন্ট কারানো যেতে পারে। গ্লাস স্কিন ফেশিয়াল, মাইক্রোনিডলিং-সহ একাধিক উন্নত মানের বিউটি থেরাপি এখানে করানো হয়। সাজানো-গোছানো শহরে রাজকীয় প্রাসাদ-সহ দর্শনীয় রয়েছে অনেক জায়গাই। এখানকার গণপরিবহণ ব্যবস্থাও উন্নত। উপভোগ করতে পারেন এখানকার স্ট্রিট ফুডও।
প্যারিস
ফ্যাশন জগতের শীর্ষতালিকায় নাম থাকে প্যারিসের। ফ্রান্সের এই শহর বিশ্ব ফ্যাশনের প্রাণকেন্দ্র। পর্যটনকেন্দ্র হিসাবেও জনপ্রিয় এই শহরের প্রসাধনীর কদরও যথেষ্ট। ফ্রেঞ্চ ফার্মেসির কিছু রূপচর্চা প্রসাধনীও ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তালিকায় প্যারিস রাখলে ঘোরার পাশাপাশি সে সব কেনাও যাবে।
জাপান
জাপানের ফরেস্ট বাদিং। ছবি:সংগৃহীত।
জাপানের একাধিক জাতীয় উদ্যানে এবং অরণ্য ঘেরা স্থানে প্রকৃতির মাঝে স্নানের চল রয়েছে, একে বলা হয় সিনরিন ইয়োকু। তবে, তা জলে নেমে স্নান নয়, 'ফরেস্ট বেদিং' হল প্রকৃতির মধ্যে অবগাহন। ধীরে হাঁটা, গাছপালার স্পর্শ নেওয়া, বয়ে যাওয়া জলস্রোতের শব্দ শোনা, গাছের ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যরশ্মিকে শরীর-মন দিয়ে উপভোগ করা, শান্ত পরিবেশের সঙ্গে একাত্ম হওয়াই এর মূল কথা। সিনরিন ইয়োকুর একাধিক উপকারিতার কথা গবেষণায় উঠে এসেছে। উদ্বেগ কমাতে, রক্তচাপ বশে রাখতে, স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা ঠিক রাখতে এই ‘স্নান’ উপকারী। তা ছাড়া প্রকৃতির সংস্পর্শে এলে বিশুদ্ধ অক্সিজেন মেলে, যা ত্বকের জন্য ভাল। ফরেস্ট বেদিং বেশ জনপ্রিয় জাপানে। সে দেশে সে জন্য গাইডও মেলে। ইয়াকুসিমা জাতীয় উদ্যান-সহ জাপানের একাধিক অরণ্যে এমন ফরেস্ট বেদিং-এর সুযোগ মেলে।
এর বাইরেও অনেক জায়গাতেই মিলতে পারে রূপসফরের সুযোগ । ভারতের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে একাধিক উষ্ণ প্রস্রবণ, যার খনিজ মিশ্রিত জল ত্বকের জন্য ভাল। জর্ডন, তুরস্ক, ক্যালিফোর্নিয়া-সহ বিশ্বের নানা প্রান্তে মাড বেদিং বা কাদা স্নানের চলও রয়েছে। একে বলা চলে শতাব্দী প্রাচীন প্রাকৃতিক থেরাপি। গরম এবং খনিজ মিশ্রিত কাদা মেখে স্নানে করলে ত্বকের জেল্লা বাড়ে। শরীর ভাল থাকে। তালিকায় রাখা যায় এই সব স্থানও। বিদেশের বহু জায়গায় পর্যটকদের শরীর-মনের ক্লান্তি দূর করতে এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য নানা ধরনের পরিকল্পিত পরিষেবার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। তা ছাড়া, নির্মল প্রকৃতির সান্নিধ্য এবং কোনও জায়গায় গিয়ে সেখানকার নির্দিষ্ট খাদ্যতালিকা মেনে খেলেও ত্বকে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।