প্রচারে জাহাঙ্গির। নিজস্ব চিত্র ।
ভয় নয় ভরসা— বিধানসভা নির্বাচনে এবার এই স্লোগানকে সামনে রেখে যুদ্ধে নেমেছে বিজেপি। তৃণমূলের সঙ্গে এই লড়াইয়ে রাজ্যে ভয়ের বাতাবরণ চলছে বলে অভিযোগ তুলে আগামিদিনে ভরসা জোগানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তারা। একই ধাঁচে ভরসার আশ্বাস দিতে মাঠে নেমেছেন এক তৃণমূল নেতাও। তবে এ ক্ষেত্রে লড়াইটা তাঁর নিজের ‘ইমেজ’-এর সঙ্গেই। তিনি জাহাঙ্গির খান। ভয় ধরানো ইমেজ বদলে ভরসার হাত বাড়াতে এলাকা চষে ফেলছেন ফলতা বিধানসভার এবারের তৃণমূল প্রার্থী।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত জাহাঙ্গির গত কয়েক বছরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান নাম হয়ে উঠেছেন। বিরোধীদের অভিযোগ, ফলতা তথা ডায়মন্ড হারবার লোকসভায় জাহাঙ্গিরের নেতৃত্বেই সন্ত্রাস-মারামারি, তোলাবাজি, জোর করে বুথ দখলের বহু ঘটনা ঘটেছে। বিরোধী রাজনীতি করা লোকজন তো বটেই, বহু সাধারণ মানুষ নাকি জাহাঙ্গিরের দাপটে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে বিরোধী শিবিরের অভিযোগ। যদিও জাহাঙ্গিরের কথায়, “কী ভাবে আমার বিরুদ্ধে এই সব রটেছে জানি না। যাঁরা আমাকে চেনেন, তাঁরা জানেন এর কিছুই সত্যি নয়। আমাকে না দেখে, না চিনে অনেকেই আমার ব্যাপারে অনেক কিছু ভেবে ফেলেন। আলাপ হলে বুঝতে পারেন মানুষটা পুরো আলাদা।” জাহাঙ্গির জানান, এত দিন নীরবে দলের কাজ করেছেন। কে কী বলল তাতে আমল দেননি। বিধানসভার লড়াইয়ে নেমে মানুষের কাছে নিজের প্রকৃত ‘ইমেজ’ তুলে ধরতে চাইছেন তিনি। ভরসার বার্তা নিয়ে বছর চল্লিশের নেতা তাই ছুটে বেড়াচ্ছেন ফলতার এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে।
এক সময়ে ছিলেন সাধারণ কর্মী। প্রথমবার ভোটে দাঁড়িয়ে ২০১৩ সালে বেলসিংহা ২ পঞ্চায়েতের প্রধান হন জাহাঙ্গির। পরের বছরই ডায়মন্ড হারবার লোকসভায় প্রার্থী হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর নজরে পড়ে যান জাহাঙ্গির। সেই থেকে ক্রমশ দায়িত্ব বেড়েছে। লোকসভার ভোট-যুদ্ধে অভিষেকের প্রধান সেনাপতি তিনিই। গত লোকসভায় শুধু ফলতা থেকেই দেড় লক্ষের বেশি ভোটে লিড দিয়েছেন অভিষেককে। পরে বিধানসভা ভোট মাথায় রেখে তাঁর উপরে প্রায় পুরো জেলার পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন অভিষেক। ভোটে দাঁড়িয়ে নিজের কেন্দ্রের পাশাপাশি জেলার একাংশে নিয়মিত প্রচারে যাচ্ছেন। তৃণমূলের অন্দরে চর্চা চলে, জেলায় অভিষেকের সব থেকে ঘনিষ্ঠ নেতা জাহাঙ্গিরই!
এলাকায় প্রচারে তাঁকে ঘিরে উদ্দীপনা চোখে পড়ছে। লোকসভা নির্বাচনে ফলতায় চালুয়ারি পঞ্চায়েতেই কিছুটা পিছিয়ে ছিল তৃণমূল। সম্প্রতি সেই এলাকায় প্রচার সারেন জাহাঙ্গির। দেখা গেল, অনেকেই আগে নাম শুনলেও সামনে থেকে তাঁকে প্রথমবার দেখছেন। তরুণ, সুপুরুষ নেতাকে দেখে অবাকও হচ্ছেন অনেকে। ভরসার আশ্বাসে যে কাজ হচ্ছে তার প্রমাণ মিলল এলাকার এক বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলে। নিজের কুঁড়ে ঘরের সামনে বসে বৃদ্ধা বলেন, “এত দিনেও ঘর পাইনি। তবে জাহাঙ্গির এসে বলে গেলেন, এবার ব্যবস্থা করে দেবেন। মনে হচ্ছে এবার পাব।” জাহাঙ্গিরের নিজের বেলসিংহা ২ পঞ্চায়েত এলাকায় ঘুরে দেখা গেল, সেখানে তাঁর ভাবমূর্তি পুরোপুরি আলাদা। অনেকেই জানান, বিপদে-আপদে বরাবর পাশে দাঁড়িয়েছেন জাহাঙ্গির। কেউ কোনও সমস্যা নিয়ে গিয়ে খালি হাতে ফেরেননি। জাহাঙ্গিরের সঙ্গীরা জানান, অভিষেক ঘনিষ্ঠতা এবং দুর্দান্ত সাংগঠনিক শক্তির জন্য বিরোধীরা তো বটেই, দলের কেউ কেউও জাহাঙ্গিরকে হিংসা করেন।
বিরোধীরা অবশ্য ভরসার আশ্বাস উড়িয়ে দিচ্ছেন। ফলতার বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পণ্ডা বলেন, “জাহাঙ্গিরের নেতৃত্বেই ফলতা তথা ডায়মন্ড হারবারের বিভিন্ন প্রান্তে অরাজকতা চলছে। উনি আসলে কী, তা এলাকার মানুষ জানেন। এখন ভোটের মুখে ভাল ভাল কথা বলে লাভ নেই। ওতে কাজ হবে না।” জাহাঙ্গির বলেন, “গণিখান চৌধুরী মারা যাওয়ার এত দিন পরেও মালদায় তাঁর নামে ভোট হচ্ছে। কাজ করেছিলেন বলেই মানুষ মনে রেখেছেন। আমি সেই রকম কাজ করে যেতে চাই, যাতে আমার কাজটা মানুষ মনে রাখেন।’’