WB Assembly Election 2026 Result

স্বরূপনগরে দুর্গ অটুট তৃণমূলের, কমল জয়ের ব্যবধান

গোষ্ঠীকোন্দল এবং সংগঠনের একাংশের নিষ্ক্রিয়তা ভোটে প্রভাব ফেলেছে বলে মত তৃণমূলেরই একাংশের।

সীমান্ত মৈত্র  
শেষ আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ ০৯:২১
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

জয় আছে, কিন্তু স্বস্তি নেই—স্বরূপনগরের ফলাফল ঠিক এই বার্তাই দিচ্ছে। তৃণমূল তাদের শক্ত ঘাঁটি ধরে রাখলেও কমে যাওয়া জয়ের ব্যবধান রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রের সাতটি বিধানসভার মধ্যে একমাত্র স্বরূপনগরেই জয়ের ধারা বজায় রাখতে পেরেছে তৃণমূল। ২০১৯ লোকসভা, ২০২১ বিধানসভা, ২০২৪ লোকসভা এবং এবারের ফল—সব ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে একই ছবি।

এ বার তৃণমূল প্রার্থী বীণা মণ্ডল ১৬,০১৭ ভোটে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু সংখ্যার বিচারে এই জয় আগের তুলনায় অনেকটাই ক্ষীণ। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর জয়ের ব্যবধান ছিল ৩৪,৮০০ ভোট। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল প্রার্থী বিশ্বজিৎ দাস এগিয়ে ছিলেন ৩৯,২১৮ ভোটে। সেই তুলনায় ব্যবধান প্রায় অর্ধেকেরও কমে আসায় রাজনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত দেখছেন বিশ্লেষকেরা। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় তৃণমূল শেষ পর্যন্ত জয় ধরে রাখতে পারলেও, ভোটের অঙ্কে এই পতন ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা বলেই মনে করছেন তাঁরা।

ব্যবধান কমার কারণ হিসেবে দলের অন্দরে একাধিক বিষয় উঠে আসছে। গোষ্ঠীকোন্দল এবং সংগঠনের একাংশের নিষ্ক্রিয়তা ভোটে প্রভাব ফেলেছে বলে মত তৃণমূলেরই একাংশের। পাশাপাশি, এসআইআর প্রক্রিয়ায় বহু ভোটারের নাম বাদ পড়ার অভিযোগও রয়েছে। এখানে বামেরা প্রার্থী দিয়েছিল। আইএসএফ প্রার্থী না দিলেও তাদের প্রভাব এলাকায় ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। তৃণমূলের স্বরূপনগর দক্ষিণ ব্লকের সভাপতি রমেন সর্দার বলেন, “জয়ের ব্যবধান কমার কারণ, দলের একাংশের নিষ্ক্রিয়তা। আইএসএফের প্রভাবও ছিল। প্রার্থী না দিলেও নওসাদ সিদ্দিকী এখানে প্রচারে এসেছিলেন। তা ছাড়া, এসআইআর-এ অনেক নাম বাদ গিয়েছে।”

অন্য দিকে, বিরোধী ভোটের বিভাজনও ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সিপিএম প্রার্থী বিশ্বজিৎ মণ্ডল পেয়েছেন ৩৮,৪০৯ ভোট। কংগ্রেস প্রার্থী রীতেশ মণ্ডল পেয়েছেন ২,৩৮৪ ভোট। বিজেপি প্রার্থী তারক সাহা পেয়েছেন ৭৮,৭৯৬ ভোট। বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী ভোট একজোট হলে ফল ভিন্ন হতে পারত।

দীর্ঘদিনের বিধায়ক হিসেবে বীণা মণ্ডলের বিরুদ্ধে কিছুটা জনঅসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। ২০১১ সাল থেকে টানা বিধায়ক থাকার ফল কিছুটা ভুগতে হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও উত্তাপ কমেনি। বিজেপি ফল মানতে নারাজ। বিজেপির বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি বিকাশ ঘোষ অভিযোগ করেন, “গণনায় আমাদের প্রার্থী এগিয়ে থাকাকালীন তৃণমূলের গুন্ডারা প্রার্থী ও এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেয়। আমরা পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছি।” যদিও তৃণমূল এই অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করেছে, বিজেপির কর্মীরাই তাদের এজেন্টদের মারধর করেছে এবং গণনা সঠিক ভাবেই হয়েছে।

রাজনৈতিক সমীকরণের বাইরে স্বরূপনগরের বাস্তব চিত্র আরও জটিল। সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই পরিকাঠামোগত ঘাটতি প্রকট। বর্ষায় জল জমে বহু গ্রাম প্লাবিত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় চাষের জমি। ধানের খেত নষ্ট হয়ে যায়, অনেক পরিবারকে ঘর ছাড়তে হয়। কাঁচা বাড়ি ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও থেকে যায়। স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও অসন্তোষ রয়েছে। শাঁড়াপুল গ্রামীণ হাসপাতালের পরিষেবা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ—রোগীদের প্রায়ই অন্যত্র পাঠানো হয়। নিকাশি ব্যবস্থার অভাব, নিম্নভূমি এলাকা এবং অপরিকল্পিত জলনিকাশ সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। তরুণীপুরে ইছামতী নদীর উপরে পাকা সেতুর দাবি অপূর্ণ, বহু রাস্তা বেহাল, পানীয় জলের সঙ্কটও রয়ে গিয়েছে। কাজের অভাবে বহু যুবক পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে ভিন্‌ রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন।

সীমান্তের কাঁটাতারে ঘেরা এই অঞ্চলে ভোট তাই শুধু রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের প্রত্যাশাও।

আরও পড়ুন