Rabindra Jayanti

দেড় দশক বাদে কোনও মতে সরকারি কবি-প্রণাম

বাঙালির কবি-দিবস বা রবি-দিবসে শপথ নিয়ে গোড়াতেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে তাঁর কর্মকাণ্ড শুরু করলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বললেন, ‘‘নতুন সরকার দায়িত্ব নিল কবিগুরুকে প্রণাম জানিয়ে। এ বার থেকে বাংলা-বাঙালির সংস্কৃতি কবিগুরুর চেতনা, কবিগুরুর ভাবনায় হবে।’’

ঋজু বসু
শেষ আপডেট: ১০ মে ২০২৬ ০৭:৪৪
শপথ নেওয়ার পরে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে মুখ্যমন্ত্রী। (ডান দিকে)

শপথ নেওয়ার পরে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে মুখ্যমন্ত্রী। (ডান দিকে) শনিবার। ছবি: সুদীপ ঘোষ।

দেড় দশক আগের পরিবর্তনের বছরেও অনেকটা এমনই ছিল ছবি। রবীন্দ্র সার্ধ শতবর্ষে সে-বার বিধানসভা ভোটের হাওয়াতেই চাপা পড়ে যায় পঁচিশে বৈশাখ উদ্‌যাপন। এ বার ভোটের ফল বেরিয়েছে দিন কয়েক আগে। নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম দফার শপথ হল রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর দিনে। এ দিন সরকারি উদ্যোগে রবীন্দ্র সদন তল্লাটে কবিপ্রণামের অনুষ্ঠান সন্ধ্যায় কোনও মতে সম্পন্ন হল।

তবে পূজার ছলে ভুলে থাকার আয়োজন নিয়ে তো রবি ঠাকুর নিজেই গানে গানে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বাঙালির কবি-দিবস বা রবি-দিবসে শপথ নিয়ে গোড়াতেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে তাঁর কর্মকাণ্ড শুরু করলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বললেন, ‘‘নতুন সরকার দায়িত্ব নিল কবিগুরুকে প্রণাম জানিয়ে। এ বার থেকে বাংলা-বাঙালির সংস্কৃতি কবিগুরুর চেতনা, কবিগুরুর ভাবনায় হবে।’’

শুভেন্দুর উপস্থিতির আগেই অবশ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মভিটেয় অনুষ্ঠানের ফাঁকে গৈরিক পতাকাধারীরা ঢুকে পড়েন। স্থান-কাল ভুলে শুভেন্দুকে দেখেও ঠাকুরবাড়িতে রোল ওঠে ‘জয় শ্রী রাম’! কবিকে মালা দিয়ে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছে ছিল নতুন সরকার রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন কাজ শুরু করবে। ‘‘তাই হম প্রধানমন্ত্রীজির নেতৃত্বে কবিগুরু কো প্রণাম করকে সংবিধান কো মানতে হুয়ে আজ ওথ টেকিং কিয়ে’’, সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশে হিন্দি-ইংরেজি মিশিয়ে বলেন মুখ্যমন্ত্রী।

বাম জমানার শেষে রাজ্যে এর আগের পরিবর্তনের বছরে পঁচিশে বৈশাখের তিন দিন বাদে ষষ্ঠ দফার ভোট ছিল। ভোটের ফল বেরোয় রবীন্দ্র-জয়ন্তীর আরও দিন পাঁচেক বাদে। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির অনুষ্ঠানটুকু বাদ দিলে শহরের আকাশে-বাতাসে কবিপ্রণামের উত্তাপ ততটা বোঝা যায়নি। বরং পালাবদলের পরে বাইশে শ্রাবণ লালবাড়ি মহাকরণ তথা রাইটার্স বিল্ডিংসকেই সবুজ আলোয় মুড়ে ফেলা হয়। বলা হয়েছিল, ভোটের জন্য রবীন্দ্র-জয়ন্তী উদযাপন করতে না-পারা পুষিয়ে ফেলা হচ্ছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় সরকারি উদ্যোগে রবীন্দ্র-জয়ন্তী পালনেরও ধার বেড়েছিল। তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতার নিজস্ব নির্ঘণ্ট মেনে রবীন্দ্র সদনে তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের উদ্যোগে কবিপ্রণামের সময় পাল্টায়। রবীন্দ্র সদনের ভিতর থেকে বাইরে সরানো হয় অনুষ্ঠান মঞ্চ। বিকেলে রবীন্দ্র-জয়ন্তী উদ্‌যাপনের সময়ে সাধারণত নিজে বেশ কিছু ক্ষণ থাকতেনও মমতা। এ বার নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে শেষ মুহূর্তে সন্ধ্যায় রবীন্দ্র সদনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তথ্য-সংস্কৃতি দফতর। তবে কবিপক্ষের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা হয়নি।

এ বার বিকেলে মমতাকেও কালীঘাটে তাঁর বাড়ির কাছে রবীন্দ্র-জয়ন্তী পালনে দেখা গিয়েছে। তিনি বলেন, আর কোথাও অনুমতি না-পেয়ে ওখানেই তিনি তাঁর কবিপ্রণামে শামিল। পালাবদল হতে না-হতেই সংস্কৃতি জগতের অনেকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন মমতাকে। তবে ছিলেনও কয়েক জন। এ ছাড়া, ছিলেন প্রধানত দলীয় কর্মী, প্রাক্তন ও বর্তমান বিধায়ক, সাংসদেরা। কুণাল ঘোষ ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এক সঙ্গে গাইছিলেন ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে...’, মমতা বলে ওঠেন, ‘‘ইন্দ্রনীলও (সেন) এ গানটা ভাল গায়! ভয়ে হয়তো আসতে পারেনি...ওর বাড়ির সামনে অত্যাচার হচ্ছে।’’ অনেকটা শুভেন্দুর ঢঙেই মমতাও রবীন্দ্র-জয়ন্তী থেকেই নতুন পর্ব শুরুর ডাক দিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমি কাউকে ডাকিনি। সবাই নিজের মাটির টানে কবিগুরুর জন্মদিনে প্রতিজ্ঞা নিতে এসেছে।’’ সকালে সিপিএমের বিমান বসুও জোড়াসাঁকোয় মালা দেন।

পার্ক সার্কাস ময়দানে ভোটাধিকার মঞ্চের রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন।

পার্ক সার্কাস ময়দানে ভোটাধিকার মঞ্চের রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন। শনিবার —নিজস্ব চিত্র।

ব্রিগেডে শপথগ্রহণের আমেজে এ বার আর সকাল থেকে পাড়ায় পাড়ায় রবীন্দ্রগানের সুরও তত শোনা যায়নি। বিকেলে সাধারণ নাগরিক সমাজের একাংশ বাগবাজারে মায়ের ঘাট থেকে জোড়াসাঁকো ছুঁয়ে নাখোদা মসজিদে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। প্রথম বঙ্গভঙ্গের সময়ে রবীন্দ্রনাথের সম্প্রীতির রাখির স্মৃতি জাগিয়ে তোলা মিছিলের নাম দেওয়া হয় ভালবাসার যুদ্ধযাত্রা। বাগবাজারের ঘাট ছেড়ে একটু এগোতেই পুলিশ সে মিছিল আটকে দেয়। বাগবাজারেই রবীন্দ্রনাথের গানে, গানে তাদের কথাটুকু বলতে থাকেন পদাতিকেরা। সন্ধ্যায় পার্ক সার্কাসের মাঠে ভোটাধিকার মঞ্চের ৭০ দিন ছুঁই ছুঁই অবস্থানও রবীন্দ্রনাথেই আশ্রয় খুঁজেছে।

বাংলার প্রথম বিজেপি সরকারের শপথগ্রহণের আবহে তবু কিছুটা আড়ালেই থাকল রবির কিরণ।

আরও পড়ুন