অ্যান্ডারসন ক্লাবে ‘সেঞ্চুরি প্লাই’ নিবেদিত ২০২৬-এর ‘দেশ বিতর্কে’ উপস্থিত (বাঁ দিক থেকে) অনিকেত মাহাতো, দেবেশ চট্টোপাধ্যায়, শমীক ভট্টাচার্য, অনিতা অগ্নিহোত্রী, কুণাল সরকার, প্রচেত গুপ্ত, সমীর চক্রবর্তী, নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, অরূপ চক্রবর্তী। ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে যখন নিয়ত চর্চা চলছে, তখন বৃহত্তর ভাবে বিষয়টিকে উস্কে দিল ‘দেশ’ পত্রিকার বিতর্কসভা। ‘সেঞ্চুরি প্লাই’ নিবেদিত ২০২৬-এর ‘দেশ বিতর্কে’র বিষয়, ‘বাঙালির এখন বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রয়োজন।’ সহযোগিতায়, ‘ইন্ডিয়ান লাইফ সেভিং সোসাইটি, অ্যান্ডারসন হাউস’। ডিজিটাল সহযোগী, আরও আনন্দ।
ভারতীয় দর্শনে গৌতমের ন্যায়-দর্শনকে ‘আন্বীক্ষিকী’ বা হেতুবিদ্যা বা তর্কশাস্ত্র বলা হয়। ন্যায়-দর্শনের ভাষ্যকার বাৎস্যায়ন তর্কবিদ্যাকে বলেছেন, এই বিদ্যা জগতের পক্ষে কল্যাণকর। কল্যাণের এই ঐতিহ্যের সূত্রেই যেন ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক জয়শ্রী রায় গোড়াতে বলেছেন, “দেশ পাঠকের বৌদ্ধিক ও তার্কিক সত্তাটিকেও সর্বদা জাগরূক রাখার চেষ্টা করে এসেছে।” বিতর্কের সূত্রধার, চিকিৎসক কুণাল সরকার। সভার মতের পক্ষে, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, প্রাক্তন আমলা ও সাহিত্যিক অনিতা অগ্নিহোত্রী, নাট্য ব্যক্তিত্ব দেবেশ চট্টোপাধ্যায়, চিকিৎসক-সমাজকর্মী অনিকেত মাহাতো। বিপক্ষে, পুরাণবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, তৃণমূলের দুই মুখপাত্র সমীর চক্রবর্তী ও অরূপ চক্রবর্তী, সাহিত্যিক প্রচেত গুপ্ত।
সম্প্রতি আশা-কর্মীদের আন্দোলনের সময়ে ‘পুলিশি বন্দোবস্তে’র পরেও ‘চুপ’ থাকার মতো উদাহরণ দিয়ে বাঙালি নাগরিক সমাজের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনিতা। তাঁর মন্তব্য, “বাঙালি মনেই করে না তার বিশেষ সংশোধন প্রয়োজন। কারণ, তার উচ্চমন্যতা। আসলে বাঙালির সংশোধন অর্থাৎ আত্মবীক্ষণ জরুরি।” কেন জরুরি, তা বোঝাতে গিয়ে অনিতা রাজ্যের ‘বেহাল’ কর্মসংস্থান, নারী-স্বাস্থ্য, নিরক্ষরতা, অসংগঠিত ক্ষেত্রে সম কাজে মেয়েদের কম মজুরির মতো বিষয় তুলে ধরেছেন।
বাঙালির সাধারণীকরণে আপত্তি জানিয়ে মূলত কৃতী বাঙালিদের উদাহরণ সামনে এনেছেন প্রচেত। তাঁর অভিমত, “সেই বাঙালির সংশোধন জরুরি, যাঁরা সর্বনাশের পথে নিয়ে যেতে চান।” আর এসআইআর-হয়রানির উদাহরণ সামনে রেখে প্রচেত ‘বিশেষ নিবিড়’ শব্দবন্ধটিকেই ‘ভয়ঙ্কর’ বলে বর্ণনা করেছেন।
বিজেপি নেতা শমীক চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন এসআইআর-প্রেক্ষিতে বাঙালি অস্মিতার কথা কেন সামনে আসবে, তা নিয়ে। তাঁর প্রশ্ন, “বাঙালি বলে কাদের বোঝাতে চাইছি আমরা? একটা সাংবিধানিক, প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন উঠবে কেন?” দেশ-ভাগের উত্তাল সময়ের কথাও মনে করিয়েছেন তিনি। সমসাময়িক বাংলাদেশের প্রসঙ্গ তুলে শমীকের বক্তব্য, “যাঁরা এ-পার, ও-পার বাংলাকে একাকার করার কথা বলেন, তাঁরা ভুলে যাবেন না সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি, সত্যজিৎ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ি ভাঙা বা দখল হয়েছে।”
যদিও সমীরের মত, “সংশোধন যা হওয়ার, তা স্বাভাবিক ভাবেই হয়। এর জন্য জ্ঞানেশ কুমারের (সিইসি) সফ্টঅয়্যারের দরকার নেই।” সাম্প্রতিক সময়ে ‘বঙ্কিমদা’, ‘বাংলায় কথা বললে বাংলাদেশি’, এই ধরনের চর্চিত বিষয়গুলির উল্লেখ করেছেন। তাঁর কটাক্ষ, “প্রভারী, প্রধানমন্ত্রীও যে যশস্বী হন, এমন শব্দ বাঙালি জানত না।” এই অবস্থায় বাঙালির চেতনা বহু বছর ধরে নির্মিত হয়ে তা ‘সত্যে’ পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নৃসিংহপ্রসাদ। তাঁর মতে, “সত্যকে সংশোধন করা যায় না। সত্যের সংস্কার হয়।” তাঁর টিপ্পনী, “শশাঙ্কের আমলে এসআইআর হলে প্রথম বাদ পড়তেন ব্রাহ্মণেরা। কারণ তাঁরা বাইরে থেকে এসেছেন।”
অরূপেরও কটাক্ষ, “বিশেষ সংশোধন তাঁদেরই দরকার, যাঁদের জীবনে তা নেই। বাঙালির বিশেষ সংশোধন আছে বলেই, সে দেশকে পথ দেখিয়েছে।” বাঙালির ঐক্যকে যাঁরা ধ্বংস করতে চান, তাঁদের দ্বারা সংশোধনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন অরূপ। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কথা বলে ধর্মীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে বাঙালির উত্তরাধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
সভার মতের পক্ষের বক্তা দেবেশ সওয়াল করেছেন বাঙালির কথ্য ভাষা, খাদ্যাভাস, ধর্মীয় চর্চা, সংস্কৃতির বিভিন্নতার মধ্যে ঐক্যের কথা বলে। তাঁর মতে, বাংলার সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে ভেঙে যাঁরা একমুখী করতে চান, সংশোধন তাঁদেরও প্রয়োজন। তবে তাঁর মত, বাঙালি ‘বিভ্রান্ত’। নাট্য-ব্যক্তিত্বের ব্যাখ্যা, “বাঙালির বর্তমানে মগজে কারফিউ। সে ভীতু। ক্ষমতার ভয়। আর ভয়ের জন্যই নিয়ত লড়াই নিজের সঙ্গেও চলছে। এই ভীতু বাঙালির সংশোধন জরুরি।” এই সূত্রেই অনিকেত আর জি কর-কাণ্ড, স্বাস্থ্যক্ষেত্রের ‘হুমকি প্রথা’র মতো বিষয় স্মরণ করেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়েরা যে বাংলার গঠন চেয়েছিলেন, তার ধারাবাহিকতায় ‘ছেদ’ পড়েছে বলে তাঁর মত। আর তাই তিনি বাঙালির নৈতিকতার সংশোধন চেয়েছেন।
শেষে সভার মতেই মত দিয়েছেন উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দর্শকেরা।