মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।
বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির ঠিক এক মাসের মাথায়, গত ৩ জুন আনুষ্ঠানিক ভাঙনের পালা শুরু হয়েছিল তৃণমূলে। সোমবার সেই ফাটল আরও চওড়া হল। লোকসভার ২৮ জন তৃণমূল সাংসদের মধ্যে ২০ জনই মমতাকে ছেড়ে যোগ দিলেন বিদ্রোহী শিবিরে। বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে রয়েছেন বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার এবং বীরভূমের সাংসদ শতাব্দী রায়। বিদ্রোহীরা সোমবার চিঠিও পাঠিয়েছেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে। এর পাশাপাশি, সোমবার ইস্তফা দিয়েছেন রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়। কোয়েল মল্লিকও সেই তালিকায় রয়েছেন বলে জল্পনা। আরও কয়েক জন সেই তালিকায় শামিল হতে পারেন বলে জল্পনা রয়েছে।
ঘটনাপ্রবাহ দেখে রাজনীতির কারবারিদের অনেকেই মনে করছেন, পরিষদীয় এবং সংসদীয় দলে ভাঙনের এই ধারা প্রত্যক্ষ ছাপ ফেলবে তৃণমূলের সংগঠনে। এর পরের ধাপে দলের নাম এবং নির্বাচনী প্রতীক ‘জোড়াফুল’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতছাড়া হবে বলেই মনে করছেন তাঁরা। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে ‘জোড়াফুল’ প্রতীক নিয়ে তৃণমূল গড়েছিলেন মমতা। ঘটনাচক্রে ‘দল’ যখন তাঁকে ছেড়ে যাচ্ছে, সোমবার দুপুরে ঠিক তখনই দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকে ছিলেন তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতা-নেত্রী। সূত্রের খবর, তিনি এখনও মনে করছেন বিদ্রোহী শিবিরে ১৫ জনের বেশি লোকসভা সাংসদ যোগ দেননি। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকার কারণেই কাকলিরা সরাসরি দল ভাঙার কথা ঘোষণা করেননি।
ভারতীয় রাজনীতির অতীত এবং হালফিলের ঘটনাপ্রবাহ বলছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধির বিদ্রোহে দলের নাম এবং নির্বাচনী প্রতীক হাতছাড়া হওয়ার একাধিক উদাহরণ রয়েছে। এমনকি, ১৯৭৭ সালের লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের বিপর্যয়ের জেরে ১৯৭৮ সালে দলে ভাঙন ধরেছিল। লোকসভায় ১৫৩ জন সাংসদের মধ্যে ৭৬ জনের সমর্থন হারানোর পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে দলের ‘গাই-বাছুর’ প্রতীক হারাতে হয়েছিল। দেবরাজ আর্স, কে ব্রহ্মানন্দ রেড্ডি, ওয়াইবি চহ্বাণ, দেবকান্ত বড়ুয়াদের ‘বিদ্রোহের’ জেরে দলের নাম ও প্রতীক ‘ফ্রিজ’ হওয়ায় সেই সময় ‘হাত’ চিহ্ন নিয়ে কংগ্রেস (আই) গড়েছিলেন ইন্দিরা। দক্ষিণের রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশে ১৯৯৫ সালে তেলুগু দেশম পার্টি (টিডিপি)-র সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে বিদ্রোহ করে শ্বশুর এনটি রামা রাওকে সরিয়ে মুখ্যমন্ত্রিত্ব দখল করেছিলেন চন্দ্রবাবু নায়ডু। পরবর্তী সময়ে তাঁর নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকেই নির্বাচন কমিশন দলের নাম এবং দলের প্রতীকচিহ্ন দিয়েছিল।
২০২২ এবং ২০২৩ সালে মহারাষ্ট্র রাজনীতিও দল বেহাত হওয়ার ঘটনাপর্বে সাক্ষী। প্রথম ক্ষেত্রে, শিবসেনার সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক তৎকালীন নমুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরের সঙ্গ ছেড়ে বিদ্রোহী নেতা একনাথ শিন্দের পাশে দাঁড়ানোয় সরকারের পতন ঘটেছিল। পরবর্তী সময়ে ভাঙন ধরে শিবসেনার পরিষদীয় দলেও। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ‘শিবসেনা’ নাম এবং ‘তির-ধনুক’ও হাতছাড়া হয়েছিল শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত বালাসাহেব ঠাকরের পুত্র উদ্ধবের। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, ‘এনসিপি’ নাম এবং নির্বাচনী প্রতীক ‘ঘড়ি’ হারান দলের দলের প্রতিষ্ঠাতা শরদ পওয়ার স্বয়ং! কমিশনের নির্দেশে বিদ্রোহী ভাইপো অজিত পওয়ারের গোষ্ঠীই ‘আসল এনসিপি’ হিসাবে স্বীকৃতি পায়। বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়েই শিন্দে এবং অজিত দু’জনেই দল দখল করছিলেন। ঘটনাচক্রে, সোমবার বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতেই বিদ্রোহী সাংসদদের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক বসেছিল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও সোমবার সকালে দিল্লিতে গিয়েছেন। দুপুরে ভূপেন্দ্রর বাড়িতে যান তিনিও।
তবে তৃণমূলের সংসদীয় দলে ভাঙনের সঙ্গে তাঁদের কোনও সম্পর্ক নেই বলে সোমবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন বিধানসভায় পরিষদীয় দল ভাঙার কাণ্ডারী তথা বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘‘দিল্লিতে সাংসদেরা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার সঙ্গে আমার বা আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। আমরা এমন কোনও অবস্থান নেব না, যাতে জগদীপ ধনখড় উপরাষ্ট্রপতি হওয়ার মতো বিজেপির কোনও সুবিধা হয়৷ আমরা যা করব প্রকাশ্যে করব। সরকার কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ করলে তাকে ইতিবাচকই বলব।’’ অন্যদিকে, বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক তথা মমতা শিবিরের নেতা কুণাল ঘোষ বলেন, ‘‘দুই ক্ষেত্রেই পৃষ্ঠপোষক বিজেপি। দিল্লিতে প্রকাশ্যে খোলাখুলি। এখানে (বিধানসভায়) চুপিচুপি।’’
সূত্রের খবর, দিল্লির বৈঠকে কাকলি, শতাব্দীর পাশাপাশি ছিলেন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, অসিত মাল, বাপি হালদার, জুন মালিয়া, জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া, কালীপদ সোরেন, অরূপ চক্রবর্তী, পার্থ ভৌমিক, শর্মিলা সরকারেরা। বিদ্রোহীদের তালিকায় ইউসূফ পঠান, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবের নামও ভেসে এসেছে ইতিমধ্যেই। শর্মিলার দাবি, ২০ জনেরও বেশি লোকসভা সাংসদ বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েছেন। গত ৩ জুন ৫৮ জন বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়ক বিধানসভা ভবনে সাংবাদিক বৈঠক করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষিত পরিষদীয় নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের বদলে বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে মনোনীত করলেও মমতাকেই ‘দলনেত্রী’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু বিদ্রোহী লোকসভা সাংসদেরা তেমন কিছু করেননি। তাঁরা বিজেপির সঙ্গী হতে চলেছেন বলেও সূত্রের খবর। অর্থাৎ, শিন্দে-অজিতের মতোই তাঁদের পরবর্তী নিশানা হতে পারে দলের নাম এবং নির্বাচনী প্রতীক। ২০২২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর শিবসেনার নাম ও প্রতীক নিয়ে মামলায় সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ ‘আসল শিবসেনা’ বাছার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অনুমতি দিয়েছিল কমিশনকে। সেই নির্দেশ হাতিয়ার করে কাকলিরাও এ বার কমিশনে গিয়ে ‘আসল তৃণমূল’ হিসাবে স্বীকৃতি আদায় করে নিতে পারেন বলে মনে করছেন অনেকে। তবে শিবসেনা এবং এনসিপির নাম-প্রতীকের মামলায় এখনও চূড়ান্ত রায় দেয়নি শীর্ষ আদালত।