Abhishek Banerjee

আইন ভেঙে অভিষেকের সেবাশ্রয়ে আলট্রাসনোগ্রাফি

অন্যায় জেনেও তৃণমূল জমানায় শাসকদল ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভয়ে তাঁরা বেআইনি ভাবে শিবিরে আলট্রাসনোগ্রাফি করেছেন ও যন্ত্র সরবরাহ করেছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।

পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬ ০৬:১২
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালু করা ‘সেবাশ্রয়’ স্বাস্থ্যশিবিরে গুরুতর আইনভঙ্গ হয়েছে বলে অভিযোগ এসেছে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের কাছে। ওই শিবিরে সরাসরি যুক্ত একাধিক চিকিৎসক এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছেন, অতি গুরুত্বপূর্ণ ‘প্রি কনসেপশন অ্যান্ড প্রি-ন্যাটাল ডায়াগনস্টিক টেকনিক অ্যাক্ট’ (পিসিপিএনডিটি অ্যাক্ট) সম্পূর্ণ অমান্য করে অভিষেকের ক্যামাক স্ট্রিট অফিসের নির্দেশে বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে আলট্রাসনোগ্রাফি যন্ত্র বার করে নিয়ে গিয়ে সেবাশ্রয় শিবিরে রোগীদের পরীক্ষা করা হয়েছে।এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

শুধু তাই নয়, ডিগ্রিধারী রেডিয়োলজিস্ট বা সোনোলজিস্টের বদলে সাধারণ এমবিবিএস চিকিৎসক, পিজিটি, টেকনিশিয়ানেরাও সেবাশ্রয়ে ওই যন্ত্র দেদার চালিয়েছেন। অন্যায় জেনেও তৃণমূল জমানায় শাসকদল ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভয়ে তাঁরা বেআইনি ভাবে শিবিরে আলট্রাসনোগ্রাফি করেছেন ও যন্ত্র সরবরাহ করেছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।

আরও অভিযোগ উঠেছে, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের পাশাপাশি রাজ্যের প্রায় সব সরকারি মেডিক্যাল কলেজ, জেলা হাসপাতাল, গ্রামীণ হাসপাতাল, হোমিয়োপ্যাথি হাসপাতাল থেকে সপ্তাহের কাজের দিনেও অসংখ্য চিকিৎসক ও পড়ুয়া-চিকিৎসককে ওই শিবিরগুলিতে আনা হয়েছে। প্রথম দিকে ডায়মন্ড হারবারে ওই চিকিৎসকদের পারিশ্রমিক দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কয়েক জনকে টাকাও দেওয়া হয়। কিন্তু পরে চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়তেই টাকা দেওয়া বন্ধ হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘সেবাশ্রয় নিয়ে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠে আসছে। পুরোটাই তদন্তকরে দেখা হবে।’’

ভারতবর্ষে কন্যাভ্রূণ হত্যা বাড়তে থাকায় ‘পিসিপিএনডিটি অ্যাক্ট’ কড়া ভাবে বলবৎ করা হয়েছিল। এই আইনে পোর্টেবল আলট্রাসনোগ্রাফি যন্ত্র ব্যবহার বেআইনি। আলট্রাসনোগ্রাফি যন্ত্র হাসপাতাল, পরীক্ষাকেন্দ্র বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে নিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। কোনও জায়গায় এই যন্ত্রের ব্যবহার শুরুর তিন মাস আগে আগাম সরকারকে জানিয়ে বিষয়টি নথিভুক্ত করতে হয়। নির্দিষ্ট ঘর এবং পিসিপিএনডিটি শংসাপত্রধারী নির্দিষ্ট ডিগ্রিধারী রেডিয়োলজিস্ট ছাড়া ওই যন্ত্র কোনও ভাবে ব্যবহার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। পরীক্ষা ঘে ঘরে হয় সেখানে পিসিপিএনডিটি রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট টাঙিয়ে রাখতে হয়। অথচ, সেবাশ্রয়ে এই আইনের তোয়াক্কাই করা হয়নি।

ডায়মন্ড হারবার সেবাশ্রয় শিবিরে যাঁরা আলট্রাসনোগ্রাফি যন্ত্র ব্যবহার করে রোগীদের পরীক্ষা করেছেন, তাঁদের এক জন, নদিয়ার এক চিকিৎসক বলেন, ‘‘ক্যামাক স্ট্রিট অফিস আমাকে চাপ দিয়ে সেবাশ্রয়ে আলট্রাসনোগ্রাফি করতে বাধ্য করেছিল। শিবিরে এক-এক দিনে ২০০-২৫০ জনের ইউএসজি করতে হয়েছে। প্রতিবাদ করলে আমার ক্ষতি করে দিত ওরা।’’

তাঁর দাবি, ‘‘প্রথমে স্থানীয় সহরারহাট নার্সিংহোম সেবাশ্রয়ে আলট্রাসনোগ্রাফি যন্ত্র পাঠিয়েছিল। পরে জগন্নাথ গুপ্ত মেডিক্যাল কলেজ থেকে যন্ত্র পাঠানো হয়। ওই মেডিক্যাল কলেজ থেকে প্রতিদিন রোস্টার তৈরি করে চিকিৎসক, নার্স, পিজিটি, টেকনিশিয়ানদের পাঠানো হত।’’ সহরারহাট নার্সিংহোমের প্রধান জাহিরুল ইসলাম অবশ্য অভিযোগ মানতে চাননি। তাঁর কথায়, ‘‘আমি কিছুই মনে করতে পারছি না।’’ জগন্নাথ গুপ্ত মেডিক্যাল কলেজের জনসংযোগ আধিকারিক কমলেশ্বর সিংহ বলেন, ‘‘আমরা একটা ইউএসজি যন্ত্র পাঠিয়েছিলাম। প্রচুর ডাক্তার, নার্সও পাঠাতে হয়েছে। স্থানীয় সাংসদ বলছেন, গরিবদের জন্য এটা করতে হবে। আমাদের পক্ষে কি তখন ‘না’ বলা সম্ভব ছিল?’’

শিবিরে যোগ দেওয়া উত্তর ২৪ পরগনার এক চিকিৎসকের কথায়, ‘‘কয়েক দিন শিবিরে আলট্রাসনোগ্রাফি করেছি। আইনত করা যায় না। তবে জানতাম, ওখানে ভুলভাল কোনও কাজ হচ্ছে না।তাই করেছি।’’

আরও পড়ুন