ফের নির্বাচন কমিশনকে পত্রাঘাত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
আগামী সোমবার দিল্লির নির্বাচন কমিশনের সদর দফতরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখোমুখি হবেন নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এ নির্বাচন কমিশনের কাজে যে বাংলার শাসকদল তৃণমূল একেবারেই খুশি নয়, তা এর আগে পাঁচটি চিঠি লিখে কমিশনকে বুঝিয়ে দিয়েছেন মমতা। কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাতের ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে আবারও কমিশনকে পত্রাঘাত করলেন তিনি। শনিবার সন্ধ্যায় জ্ঞানেশকে মুখ্যমন্ত্রীর লেখা একটি চিঠি প্রকাশ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন যে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক আইনের বিধিভঙ্গ করছে, সেই চিঠিতে তা স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন মমতা।
নিজের ষষ্ঠ পত্রে পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে ফের নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। শনিবারের চিঠিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে বিস্তারিত চিঠি পাঠিয়ে তিনি অভিযোগ করেছেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যে পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা হচ্ছে, তা জনপ্রতিনিধিত্ব আইন এবং তার অধীনে প্রণীত বিধি-বিধানের সীমা অতিক্রম করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর আরও অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ভোগান্তি, আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, এই প্রক্রিয়ার ফলে শুধু সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন তা নয়, বরং বিভিন্ন জেলায় শুনানি ও নথি যাচাই সংক্রান্ত চাপ ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে পড়ে প্রায় ১৪০ জন মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে উপেক্ষা করেই আইন ও বিধি লঙ্ঘন করে এই কর্মসূচি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রায় ৮,১০০ জন মাইক্রো-অবজার্ভার নিয়োগ করেছে নির্বাচন কমিশন। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, এই মাইক্রো-অবজার্ভারদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই এবং তাঁরা কোনও ভাবেই এই ধরনের সংবেদনশীল ও আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য যোগ্য নন। তা সত্ত্বেও, একতরফা ভাবে তাঁদের মাঠে নামানো হয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বলে মনে করছেন তিনি।
মমতা লিখেছেন, জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০ কিংবা ১৯৬০— কোনও আইনি বিধানেই মাইক্রো-অবজার্ভারদের এমন ভূমিকা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার কথা বলা নেই। আইন অনুযায়ী ভোটার তালিকা রক্ষণাবেক্ষণ, দাবি-আপত্তির শুনানি, নথি যাচাই এবং অন্তর্ভুক্তি বা বর্জনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র ইআরও এবং এইআরও-দের হাতেই ন্যস্ত। সেখানে মাইক্রো-অবজার্ভারদের সক্রিয় হস্তক্ষেপ আইনসঙ্গত নয় বলেই দাবি মুখ্যমন্ত্রীর। প্রসঙ্গত, এই এসআইআর প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের একাধিক সাংসদ এবং বিধায়কদের হাজিরার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। এ ক্ষেত্রে তৃণমূল নেতৃত্বের প্রশ্ন, তৃণমূলের সাংসদ বিধায়করা সকলেই নির্বাচন কমিশনের স্ক্রুটিনির মাধ্যমে উত্তীর্ণ হওয়ার পরেই ভোটে লড়াই করে জয়ী হয়েছেন। তা হলে কেন আবারও তাঁদের ভোটার হিসাবে নিজেদের প্রমাণ দিতে হবে?
চিঠিতে সংবিধানের ৩২৭ ও ৩২৮ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, আইন সংশোধন বা বৈধ বিধি প্রণয়ন ছাড়া নির্বাচন কমিশনের এই ধরনের সমান্তরাল পর্যবেক্ষক কাঠামো তৈরি করার কোনও অধিকার নেই। তাঁর আরও অভিযোগ, দেশের অন্যান্য রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে যেখানে এসআইআর চলছে, সেখানে এই ধরনের মাইক্রো-অবজার্ভারদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নজির নেই। ফলে কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেই আলাদা নিয়ম প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক।
এ ছাড়াও, ১০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ত্রিপুরা ক্যাডারের চার জন আইএএস অফিসারকে অবজার্ভার হিসেবে নিয়োগের বিষয়টিও চিঠিতে তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্র ও রাজ্যের একাধিক অবজার্ভার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর থেকে কাজ করছেন এবং আইনগত ক্ষমতা ছাড়াই ইসিআই পোর্টালের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছেন। এর ফলে তথ্যের কারসাজি করে যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার ‘ব্যাকডোর’ প্রক্রিয়া চালু হয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তুলেছেন— এই মাইক্রো-অবজার্ভার ও অবজার্ভাররা আদৌ কি আইনের অধীনে কোনও অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, না কি তাদের ভূমিকা কেবল পর্যবেক্ষণ ও সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা? তাঁর অভিযোগ, এর ফলে ইআরও এবং এইআরও-দের কার্যত অসহায় করে তোলা হচ্ছে, যা পুরো এসআইআর প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বচ্ছতাকে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। চিঠির শেষাংশে মমতা অভিযোগ করেছেন, সারা দেশে এক আইন কার্যকর হলেও পশ্চিমবঙ্গে তার প্রয়োগে ভিন্ন ও আইনবহির্ভূত পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। মুখ্যমন্ত্রী মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন, যাতে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা যায় এবং ভোটাধিকার ও মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।
দিল্লিতে সাক্ষাতের আগেই মুখ্যমন্ত্রী এহেন পত্রাঘাতের কৌশল প্রসঙ্গে রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, দেখা করার আগে জ্ঞানেশের উপর মানসিক চাপ তৈরি করতে চাইছেন মমতা। সেই কৌশলের অঙ্গ হিসাবেই কমিশনারের উদ্দেশে তিনি ষষ্ঠ পত্রাঘাতটি করেছেন।