—প্রতীকী চিত্র।
রাজ্যের ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) গোড়া থেকে শুরু করে, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা বেরোনোর পরেও অব্যাহত রইল আতঙ্ক-মৃত্যুর অভিযোগ ওঠা। যোগ হয়েছে ‘বুথ লেভেল অফিসার’ (বিএলও)-দের উপরে হামলার অভিযোগ। রবিবার রাত থেকে ২৪ ঘণ্টায় ভোটার তালিকায় ‘বিবেচনাধীনদের’ মধ্যে চার জনের মৃত্যুতে আঙুল উঠেছে নির্বাচন কমিশনের দিকে। তবে বিজেপি নেতারা সে অভিযোগ মানতে নারাজ।
ভোটার তালিকায় নাম ‘বিবেচনাধীন’ থাকার দুশ্চিন্তায় শেখ কামরুল (২৮) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ বীরভূমে। কামরুলের বাড়ি সিউড়ির ধল্লা গ্রামে। তাঁর মা জানজাহারা বিবি বলেন, ‘‘চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর থেকেই কামরুল বলতে শুরু করে, ‘আর ভারতে থাকতে দেওয়া হবে না, বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে’। এই চিন্তাতেই ওর প্রচণ্ড মাথা যন্ত্রণা শুরু হয়ে যায়।”
রবিবার রাতে কামরুলকে সিউড়ি সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর সম্ভবত ‘ব্রেন স্ট্রোক’ হয়েছে। বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে স্থানান্তরিত করার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।
তৃণমূলের বীরভূম জেলা সহ-সভাপতি মলয় মুখোপাধ্যায়ের অভিযোগ, “কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ও নির্বাচন কমিশন বৈধ ভোটারদের নাম কাটার পরিকল্পনা করেছে। সে জন্যই এত মানুষ মারা যাচ্ছেন।” বিজেপির বীরভূম সাংগঠনিক জেলার সহ-সভাপতি বাবন দাস বলেন, “ওই ব্যক্তির নাম বিবেচনাধীন ছিল। সিদ্ধান্ত কী হত, তা জানার আগেই যদি আতঙ্কে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকে, তা হলে তিনি নিশ্চিত অনুপ্রবেশকারী ছিলেন।”
মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরের শীতলপুর এলাকার হাজেরা বিবি (৫৫) শনিবার তালিকা বেরোনোর পর থেকেই উদ্বেগে ছিলেন এবং সে উদ্বেগ থেকেই রবিবার রাতে তিনি বিষ পান করেন বলে দাবি পরিবারের। সোমবার সকালে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যুর পরে, সমাজমাধ্যমে রাজ্যের মন্ত্রী তজমুল হোসেনের অভিযোগ, হাজেরার মৃত্যুর দায় নির্বাচন কমিশনের।
হাজেরার এলাকার তৃণমূল সদস্য মহম্মদ সামাউনের দাবি, “বুথের ১,৩৮৩ জন ভোটারের মধ্যে ৭৫০ জনের নাম বিবেচনাধীন। আতঙ্কে হাজেরা আত্মঘাতী হয়েছেন।” বাড়ির লোকের দাবি, তাঁকে ‘ডিটেনশন শিবির’-এ পাঠানো হবে বলে আতঙ্কে ভুগছিলেন হাজেরা। তবে উত্তর মালদহের বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মু বলেন, ‘‘প্রকৃত ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ যাবে না, নির্বাচন কমিশন একাধিক বার বলেছে। কিন্তু এখন যাঁদের মৃত্যু হচ্ছে, তাঁদের মৃত্যুর জন্য এসআইআর দায়ীবলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটাই তৃণমূলের লাইন।’’
রবিবার রাতে আলিপুরদুয়ার-২ ব্লকের ‘বিবেচনাধীন’ বৃদ্ধা লিলু দাসের (৬৫) মৃত্যুতেও বিবেচনাধীন তালিকায় থাকার আতঙ্কের অভিযোগ করেছে পরিবার। স্বামী সন্তোষকুমার দাসের দাবি, নিজের এবং দুই ছেলের নাম ‘বিবেচনাধীন’ হিসেবে তালিকায় থাকায় চিন্তায় ছিলেন লিলু। তাতেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। হৃদ্রোগেই রবিবার রাতে মারা যান মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জের তেঁতুলিয়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল শেখ (৭০)। পরিবারের দাবি, চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ‘বিবেচনাধীন’ থাকার মানসিক চাপে তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন। এ দিন আব্দুলের মৃত্যুর প্রতিবাদে অবরোধ করে তৃণমূল।সে জেলারই ফরাক্কার বিন্দুগ্রামেরএক বাসিন্দা (তাঁর এবং তাঁর দুই ছেলের নাম ‘বিবেচনাধীন) রবিবার কীটনাশক খেয়ে অসুস্থ হন। তাঁরদাবি, ‘‘তালিকা থেকে তাড়িয়েছে। পরে দেশ থেকে তাড়াবে। সে ভয়েই কীটনাশক খাই।’’
হাওড়ার বাগনানের ২৪৬ নম্বর বুথের ৪৯৬ জনকে শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ৩২৩ জনের নাম ‘বিবেচনাধীন’। তাই সংশ্লিষ্ট বিএলও আনসার আলিকে হুমকি ও গালিগালাজ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। এ দিন তাঁর স্কুলে গিয়েও বিক্ষোভ দেখান ক্ষুব্ধ ভোটারদের একাংশ। আনসার পুলিশেরদ্বারস্থ হয়েছেন।
‘বিবেচনাধীনদের’ তালিকায় এলাকার প্রায় ১৪০ জনের নাম থাকার ক্ষোভে এ দিনই নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জের সীমান্তবর্তী গ্রাম গেদে-হালদারপাড়ার প্রাথমিক স্কুলে তালা ঝুলিয়ে দেয় জনতা। দাবি করা হয়, যত দিন না ‘বিবেচনাধীনদের’ নাম তালিকায় তোলা হচ্ছে তত দিন স্কুলখুলতে দেওয়া হবে না। পরে, ব্লক প্রশাসনের কর্তারা গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন।