—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
দল রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে একে একে মুখ খুলছিলেন নেতাদের একাংশ। আবার, তাঁর অনুগামী বলে পরিচিত নেতাদের অনেকে নানা অভিযোগে গ্রেফতার হতে শুরু করেন। তাঁকেও প্রকাশ্যে বিশেষ দেখাও যাচ্ছিল না। তবে দলের টালমাটাল অবস্থাতেও জেলায় তাঁর নেতৃত্বে ভরসা রাখতে চেয়েছিলেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। কিন্তু তিনি জেলা সভাপতি পদে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘বিদ্রোহী’ তৃণমূলের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রাখছেন বলেও সূত্রের দাবি। জেলায় দলের অন্দরে কার্যত কোণঠাসা অবস্থা তৈরি হওয়ার কারণেই পাণ্ডবেশ্বরের প্রাক্তন বিধায়ক নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর এই সিদ্ধান্ত কি না, প্রশ্ন তৈরি হয়েছে তৃণমূলের অন্দরে।
নরেন্দ্রনাথ ২০২১ সালে বিধায়ক হওয়ার আগে পর্যন্ত পাণ্ডবেশ্বর ব্লক তৃণমূলের সভাপতি ছিলেন। এক বার জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ হন। ২০২২ সালে দল তাঁকে পশ্চিম বর্ধমান জেলা সভাপতি করে। তবে তাঁর রাজনীতি ছিল মূলত পাণ্ডবেশ্বরকে কেন্দ্র করেই। এ বার বিধানসভা ভোটে সামান্য ব্যবধানে পরাজিত হন নরেন্দ্রনাথ। তার পর থেকে, পাণ্ডবেশ্বর বিধানসভা কেন্দ্রের দু’টি ব্লকের মধ্যে এক জন ব্লক সভাপতি, এক জন অঞ্চল সভাপতি-সহ নরেন্দ্রনাথ ঘনিষ্ঠ পাঁচ জন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এক জন ব্লক সভাপতি এবং দলের প্রাক্তন জেলা সাধারণ সম্পাদক সমাজমাধ্যমে নরেন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। বাকি ঘনিষ্ঠদের অনেককেই এলাকায় দেখা যাচ্ছে না।
দলের কর্মীদের অনুমান, এই পরিস্থিতিতে নরেন্দ্রনাথ হয়তো অনুমান করেছেন, জেলা সভাপতির দায়িত্ব নিলে তা সামলানো সমস্যার হতে পারে। কারণ, তাঁর নিজের এলাকা পাণ্ডবেশ্বরেই তাঁর অস্তিত্ব সঙ্কটে। দুর্গাপুরে পুরভোট হলে, নরেন্দ্রনাথ মেয়র হতে পারেন, বছরখানেক আগে এমন রটনায় দুর্গাপুরের তৃণমূল কর্মীদের বড় অংশ ক্ষুব্ধ হন। এ বার ভি শিবদাসনকে (দাশু) দুর্গাপুরের দু’টি বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচনের দায়িত্ব দেন দলীয় নেতৃত্ব।
দলের নেতা-কর্মীদের একাংশের দাবি, নরেন্দ্রনাথ এক সময়ে প্রাক্তন মন্ত্রী মলয় ঘটকের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন। তবে জেলা সভাপতি হওয়ার পরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বলে তাঁর পরিচিতি তৈরির পর থেকে, তিনি জেলায় দলের প্রবীণ নেতাদের উপেক্ষা করা শুরু করেন বলে অভিযোগ। প্রতি মাসে জেলা কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও, সাড়ে তিন বছরে সাত বার তা হয়েছে বলে দল সূত্রের খবর। প্রবীণদের উপেক্ষা, বৈঠকে দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অপমান করা-সহ একাধিক অভিযোগে নরেন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন শিবদাসন। তার পরে জেলায় নানা আন্দোলনে নরেন্দ্রনাথের পরিবর্তে সামনের সারিতে দলের প্রবীণ নেতাদের দেখা গিয়েছে। বিধানসভা ভোটে জেলায় তৃণমূল যাঁদের প্রার্থী করে, তাঁদের বেশির ভাগই দলে তাঁর ‘বিরোধী’ শিবিরের বলে পরিচিত। তৃণমূল কর্মীদের অনেকের ধারণা, এ সব কারণেই নরেন্দ্রনাথ আর জেলা সভাপতির দায়িত্ব নিতে চাইলেন না।
শিবদাসনের দাবি, ‘‘যাঁরা দল ছেড়ে অন্য শিবিরে যাচ্ছেন, তাঁরা নিজেদের সম্পত্তি বাঁচাতেই যাচ্ছেন। বিজেপিকে বলতে চাই, তাঁদের নিলে দল মজবুত হবে না। আদতে এঁদের দুর্নীতির জন্যই আমরা হেরেছি।’’ তৃণমূলের রাজ্য কোর কমিটির প্রাক্তন সদস্য অশোক রুদ্রের অভিযোগ, ‘‘দল পরিচালনায় অভিষেকের প্রভাব যত বেড়েছে, দলের তত ক্ষতি হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে পরিচালনা থাকলে, দলের এই অবস্থা হত না।’’ নরেন্দ্রনাথের সঙ্গে শনিবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায়নি। তিনি ফোন ধরেননি, জবাব দেননি তাঁকে পাঠানো মেসেজেরও।