ভোট দিয়ে বেরোচ্ছেন মলয় ঘটক। ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য।
ভোটের আগের রাতে তাঁর বাড়ির আশপাশে জড়ো হওয়া ভিড়েও কান পাতলে শোনা যাচ্ছিল, ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) প্রভাব, তাঁর বাড়িতে কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযান, ভোটের আগে হাত থেকে আইন বিভাগ বেরিয়ে যাওয়ার কথা। পাশাপাশি, ঘুরছিল আর একটা কথা। মন্ত্রীর ‘ভোট-মেকানিজ়ম’ তথা ‘মলয়-বাতাস’। সেটা ঠিক কী? আসানসোল শহরের আপকার গার্ডেনের বাড়িতে বসে আসানসোল উত্তর বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী মলয় ঘটক হেসেছিলেন। বৃহস্পতিবার, প্রথম দফা ভোটের দিন বিরোধীরা পূর্ণ উদ্যমে লড়ার পরেও মলয়ের দাবি, ‘‘জয়ের ব্যবধান বাড়বে।’’
সকাল থেকে গরম ছিল চরমে। হাওয়া দিচ্ছিল না বললেই চলে। যেটুকু হাওয়া দিয়েছে, তাতে জ্বালা ধরানো অনুভূতি। তৃণমূল প্রার্থী এ দিন সকালে কারনানি মিউনিসিপ্যাল স্কুলে ভোট দিয়ে বেরিয়ে দাবি করেন, গত বিধানসভা ভোটের তুলনায় দ্বিগুণ ভোটে জিতবেন। তাঁর দাবি, তাঁর এলাকায় চারটি স্পেশাল ট্রেনে গুজরাত এবং মধ্যপ্রদেশ থেকে একটি ট্রেনে বহিরাগতদের আনা হয়েছে। বাসে করে লোক ঢোকানো হয়েছে। ভোটদাতাদের অনেকে নির্বাচন কমিশন থেকে ভোটার স্লিপ না পাওয়ায় তাঁদের আটকানো হয়েছে। কমিশনে অভিযোগ জানানো হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সমাধানও হয়েছে। পরে, রঘুনাথবাটি, গোপালপুর-সহ আসানসোল পুরসভার ১৩-১৫ এবং ২০ নম্বর ওয়ার্ডের একাধিক জায়গায় ঘোরেন মলয়। রাস্তার মোড়ে থাকা দলীয় কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে ভোটের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেন। আসানসোল রেলপার এলাকার সংখ্যালঘু প্রধান অঞ্চল ছিল মন্ত্রীর অনুগামী নেতা-কর্মীদের নজরে।
২০১১ সাল থেকে লাগাতার ‘মলয়-বাতাস’ বয়ে চলেছে আসানসোল উত্তরে। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে বিজেপিকে ২১ হাজারেরও বেশি ভোটে হারিয়েছিলেন মলয়। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনেও এই কেন্দ্রে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে ছিল তৃণমূল। প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা বলে কিছু নেই?
জবাব দেন না ভোটকেন্দ্রের বাইরে দীর্ঘ লাইনে থাকা ৭৯ বছরের বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর সমবয়সী বন্ধু নীহার চট্টোপাধ্যায়, ক্যানসার-আক্রান্ত স্বপন বিশ্বাস, হুইল চেয়ারে আসা গোপালপ্রসাদ সাউ থেকে শুরু করে প্রথম ভোট দিতে আসা জ্যোতি গুপ্ত। শুধু জানান, উৎসবের মেজাজে ভোট দেবেন। সে লাইনেই দাঁড়ানো এক প্রবীণের টিপ্পনী, ‘‘নিজের পড়া নিজে করাই ভাল। অন্য কেউ সে কাজ করে দিলে, কি ভাল হবে!’’ ভোটের লাইনে থাকা বৃদ্ধা নীলিমা চট্টোপাধ্যায় জানান, বেলা গড়ালে গরম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। তাই সকাল-সকাল ভোট দিতে এসেছেন। দুপুর ১টার মধ্যেই ৬০ শতাংশের বেশি ভোটও পড়ে।
‘‘এমন জ্বালা-পোড়া গরমের মধ্যেও মানুষ যে ভাবে ভোট দিয়েছেন, তাতে স্পষ্ট যে, পরিবর্তন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা’’, দাবি করলেন বিজেপি প্রার্থী কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়। সিপিআইয়ের অখিলেশকুমার সিংহ, কংগ্রেসের প্রসেনজিৎ পুইতন্ডি এবং তাঁদের দলের নেতা-কর্মীরাও জমি আকঁড়ে ছিলেন। তাঁদের দাবি, শিল্প-শহর, রেল-শহরে তৃণমূলের সিন্ডিকেট-এর উৎপাত থেকে মুক্তি চাইছেন মানুষ। সিপিআই প্রার্থী বলেন, ‘‘যাঁরা এত দিন সে আবহ বজায় রেখেছিলেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং প্রশাসনের তৎপরতায় পিছু হটেছেন।’’
জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাম এসআইআরের সূত্রে বাদ পড়েছে আসানসোল উত্তরে। প্রায় ৫৭ হাজার। সে কথা মনে করিয়ে মলয়-শিবিরের এক নেতা বলেন, ‘‘যাঁরা ভাবছেন, এসআইআরে শুধু তৃণমূলের ক্ষতি হয়েছে, তাঁরা জানেন না চোট অন্য দিকেও সমান লেগেছে।’’ এ বারের ভোটে সেটাই কি ‘মলয়-বাতাস’? মন্ত্রী হাসেন। জবাব দেন না।