—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
তৃণমূলের ভরা জমানায় এই জমি তাদের কাছে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর পর দু’বার বিধানসভা ভোটে হার। পর পর দু’টি লোকসভা ভোটেও পিছিয়ে। এই পরিস্থিতিতে, রাজ্যের শাসক দল এ বার দলের পোড়খাওয়া কোনও নেতার বদলে ভরসা রেখেছে শহরের পরিচিত উদ্যোগপতির উপরে। সৌজন্যের বাতাবরণ তৈরি করে ভোটে লড়াইয়ের বার্তা দিচ্ছেন তিনি। যদিও প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থী তথা এলাকার বিদায়ী বিধায়ক শানাচ্ছেন ব্যক্তি আক্রমণ। ফলে, দুর্গাপুর পশ্চিম কেন্দ্র এ বার কার উপরে ভরসা রাখবে, চোখ রয়েছে রাজনৈতিক মহলের।
দুর্গাপুর পুরসভার ১১-২২ এবং ২৯-৪৩, মোট ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে তৈরি এই বিধানসভা কেন্দ্র। ২০১৬ সালে কেন্দ্রটি হাতছাড়া হয় তৃণমূলের। বামেদের সমর্থনে কংগ্রেস প্রার্থী জয়ী হন। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে বিজেপি প্রার্থী লক্ষ্মণ ঘোড়ুই ১৪,৬৬৪ ভোটে জেতেন। গত লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে বিজেপি এগিয়ে ১১,৬৮২ ভোটে। বিধানসভা নির্বাচনের থেকে ব্যবধান হাজার তিনেক কমায়, তৃণমূল আশাব্যঞ্জক। কিন্তু লড়াই কঠিন, তা স্বীকার করছেন দলের নেতারাই।
সেই কঠিন লড়াইয়ে তৃণমূল এ বার প্রার্থী হিসাবে বেছে নিয়েছে পেশায় ব্যবসায়ী কবি দত্তকে। ২০২২ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে এডিডিএ-র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ২০২৪ সালের জুনে তাঁকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেন। দায়িত্ব পেয়ে কবি শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলির সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ হাতে নেন। তাঁর বক্তব্য, “আধুনিক শহর হিসাবে দুর্গাপুর শহরের পরিকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় সাধ্যমতো সে কাজ করে চলেছি।” তবে তা করতে গিয়ে সিটি সেন্টার, মামরা বাজারের মতো নানা জায়গায় দখল উচ্ছেদ করতে হয়েছে এডিডিএ-কে। উচ্ছেদ হওয়া হকারেরা প্রতিবাদে এডিডিএ-র সামনে ক্ষোভ-বিক্ষোভ করেছেন। ভোটের আগে বিজেপি সে স্মৃতি নতুন করে উস্কে দিয়েছে সমাজমাধ্যমে। বিলি করা হচ্ছে লিফলেটও। ‘কর্পোরেট ব্যবসায়ীর হাতে দুর্গাপুর তুলে দেবেন না’— এমন আর্জি জানিয়ে বিজেপি তাঁদের পাশে আছে বলে আশ্বাস দেওয়াহচ্ছে তাতে।
তৃণমূলের দাবি, কবি দুর্গাপুর মহকুমা হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান হিসাবে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নয়নে নানা কাজ করেছেন। এডিডিএ-র চেয়ারম্যান হিসাবেও তিনি দুর্গাপুর শহরের ভোলবদলে উদ্যোগী হয়েছেন। সেখানে বিধায়ক হিসাবে লক্ষ্মণকে গত পাঁচ বছরে এলাকায় কার্যত দেখা যায়নি, কোনও উন্নয়নমূলক কাজ করেননি, দাবি তৃণমূলের। লক্ষ্মণের জবাব, “তৃণমূল প্রথম থেকে কাজে বাধা দিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত তিন বছরে ৩ কোটি ৩০ লক্ষ টাকার কাজের প্রকল্প অনুমোদন করাতে পেরেছি। আমাকে এলাকায় দেখা গিয়েছে কি না তা বাসিন্দারাই জানেন। তৃণমূলের শংসাপত্রের দরকার নেই।”
এই কেন্দ্রের অন্তত ৮টি ওয়ার্ডে হিন্দিভাষী বাসিন্দার প্রাধান্য রয়েছে। গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ ভোটার হিন্দিভাষী। তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশের মতে, এই আসনে জিততে গেলে বিজেপির হিন্দিভাষী ভোটে ভাগ বসানো জরুরি। সে কথা মাথায় রেখে ওই সব এলাকায় সাংসদ কীর্তি আজাদের সাংসদ তহবিলের কাজকর্ম বেশি করে রূপায়ণ করা হচ্ছে। তা ছাড়া, কবি দীর্ঘদিন ধরে শহরের বণিক সংগঠনের অন্যতম কর্তা। বহু হিন্দিভাষী ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও এক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা করে দেবে, ধারণা দলের নেতৃত্বের।
দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ অংশ পড়ছে এই বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে। মনে করা হয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের শ্রমিক শ্রেণির ভোট অন্যতম নির্ণায়ক শক্তি এখানে। স্থানীয়দের বঞ্চিত করে বহিরাগতদের অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ, পিএফ-ইএসআই না পাওয়া-সহ নানা অভিযোগ তুলে বিজেপি, সিপিএমের পাশাপাশি তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদেরও পথে নামতে দেখা গিয়েছে। প্রকাশ্যেই নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন তাঁরা। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, আগের বার এই ভোটের বড় অংশ পেয়েছে বিজেপি। এ বার সিপিএম প্রার্থী করেছে স্থানীয় বাসিন্দা প্রভাস সাঁইকে। সিপিএম নেতৃত্বের দাবি, বিজেপি বিধায়ক শ্রমিকদের জন্য কিছুই করেননি। তাই এ বার বিজেপির ভোট আসবে বামেদের ঘরে। প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক বিপ্রেন্দু চক্রবর্তী বলেন, ‘‘শ্রমিক শ্রেণি বুঝেছে,প্রকৃত অর্থে বামেরাই একমাত্র তাদের পাশে আছে।’’
বিজেপি ও তৃণমূল, দু’দলেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের চোরাস্রোতের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না দলেরই নেতারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিজেপি নেতার দাবি, গত কয়েক বছরে লক্ষ্মণের ব্যক্তিগত শ্রীবৃদ্ধি নিয়ে গুঞ্জন রয়েছে। সমাজমাধ্যমে দলেরই কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন। আবার, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূলের এক নেতার বক্তব্য, ‘‘কবি রাজনীতির লোক নন। সমাজের সব অংশের সঙ্গে তাঁর যোগ নেই। দলের অনেকেই কিন্তু চেয়েছিলেন প্রার্থী হতে।’’ যদিও দু’পক্ষের উচ্চ নেতৃত্বেরই দাবি, নেতা-কর্মীরা সবাই দলের অনুগত সৈনিক। প্রার্থী ঘোষণার পরে আর কেউ পিছনে ফিরে তাকান না।