Mamata Banerjee Suvendu Adhikari

তৃণমূলের অন্দরে ভাইপোর টানা উত্থানের কারণেই মমতার নিয়তি হয়ে উঠেছিলেন শুভেন্দু! ব্রিগেডে শুরু হয়েছিল, সেখানেই বৃত্ত সম্পূর্ণ

ঘটনাপ্রবাহ দেখলে মনে হবে, মাঝের এই ১৫ বছরে ক্রমে ক্রমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নিয়তি’ হয়ে উঠেছেন শুভেন্দু অধিকারী। আর তাতে নেতিবাচক অনুঘটকের কাজ করেছে এক তৃতীয় চরিত্র।

Advertisement
শোভন চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ ০৮:৫৫
How did Subhendu Adhikari become Mamata Banerjee s nemesis, How was the role of Abhishek Banerjee

(বাঁ দিক থেকে) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারী। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের ভরাডুবির পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক হিতৈষী বলছিলেন, ‘‘দিদি যদি মুকুল রায়ের কথাটা শুনে অত তাড়াতাড়ি ভাইপোকে লোকসভার টিকিটটা না-দিতেন, তা হলে এই অবস্থাটা তাঁকে দেখতে হত না!’’

Advertisement

তৃণমূলে এ কথা সর্বজনবিদিত যে, ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে মমতা যখন ডায়মন্ড হারবার থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে টিকিট দিতে চেয়েছিলেন, আপত্তি করেছিলেন মুকুল। ১২ বছর পরে দলের ভরাডুবির পরে যখন বিভিন্ন স্তরের নেতারা কাঠগড়ায় অভিষেককেই তুলছেন। ফলে হিতৈষীর দোষ নেই। তৃণমূলের অন্দরে প্রায় সকলেই মনে করেন, সেই থেকেই দলের অন্দরে অভিষেকের উত্থান শুরু।

কিন্তু শুরুর আগেও একটা শুরু ছিল। যা ঘটেছিল ২০১১ সালের ২১ জুলাই। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে।

ঘটনাচক্রে, সেই বৃত্ত সম্পূর্ণ হচ্ছে সেই ব্রিগেডেই। ২০২৫ সালের ৯ মে। ১৫ বছর আগের মঞ্চটি ছিল জোড়াফুলের। ১৫ বছর পরের মঞ্চটি পদ্মফুলের। এক পরিবর্তনের পরে আর এক পরিবর্তন। সে দিন দু’জন একই মঞ্চে পাশাপাশি ছিলেন। এখন সেই দু’জন মুখোমুখি যুযুধান।

ঘটনাপ্রবাহ দেখলে মনে হবে, মাঝের এই ১৫ বছরে ক্রমে ক্রমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নিয়তি’ হয়ে উঠেছেন শুভেন্দু অধিকারী। আর তাতে নেতিবাচক অনুঘটকের কাজ করেছে এক তৃতীয় চরিত্র— অভিষেক। তৃণমূলে যত অভিষেকের উত্থান হয়েছে, মমতার কাছ থেকে তত দূরে সরেছেন শুভেন্দু। বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বরে শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দেওয়ার দিন। আর ২০২১ সালের ভোটে নন্দীগ্রামে মমতা হেরেছিলেন শুভেন্দুর কাছে। তার পর থেকে পাঁচ বছর মমতাকে সর্বসমক্ষে ‘কম্পার্টমেন্টাল চিফ মিনিস্টার’ বলে কটাক্ষ করে গিয়েছেন শুভেন্দু। নিয়তি!

পাঁচ বছর পরে মুখ্যমন্ত্রী মমতার ‘ঘর’ ভবানীপুরে এসে তিনি মমতাকে ১৫ হাজার ভোটে হারিয়েছেন। একদা মমতার ‘আস্থাভাজন’। কিন্তু কালক্রমে তাঁকেই ক্ষমতা থেকে উৎপাটিত করে তাঁর আসনে গিয়ে বসা— শুভেন্দুর এই উত্থানপর্ব কাহিনির মতো। যে কাহিনিতে তিনিই দেখা দিয়েছেন মমতার নিয়তি হিসাবে। যার শুরু হয়েছিল ১৫ বছর আগের এক ব্রিগেড সমাবেশে। নিয়তি!

যুবা এবং যুব

বিচ্ছেদের সলতে পাকানোর শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে মমতা ক্ষমতায় আসার দু’মাসের মধ্যেই। সে বার তৃণমূলের ‘শহিদ দিবসের’ সভা হয়েছিল ব্রিগেডে। শহিদ দিবসই হয়ে উঠেছিল ‘বিজয় দিবস’। বৃষ্টিমুখর ব্রিগেডের মঞ্চে ‘পাগলু’ নেচেছিলেন দেব। সেই মঞ্চেই আবির্ভূত হয়েছিলেন ২৪ বছরের তরুণ অভিষেক। তখন তাঁর পরিচয় শুধুই ‘মমতার ভাইপো’। কিন্তু ওই মঞ্চে সে দিনই নতুন একটি সংগঠনের জন্ম হয়। যার নাম ‘যুবা’। সেই ‘যুবা’র মাথায় বসানো হয়েছিল অভিষেককে। মমতা এমন একটা ধারণা দিয়েছিলেন যে, তৃণমূলের যুব সংগঠনই হল ‘যুবা’। কিন্তু তার আগে থেকেই তৃণমূলের যুব সংগঠন হিসাবে ‘যুব তৃণমূল’ ছিল। যার সভাপতি ছিলেন শুভেন্দু। ‘যুবা’ তৈরির কিছু দিনের মধ্যেই শুভেন্দুকে যুব তৃণমূলের সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। দায়িত্ব দেওয়া হয় সৌমিত্র খাঁকে। সেই পর্বেই দলের অন্দরে প্রশ্ন উঠেছিল, যুব সংগঠন থাকার পরেও কেন সমান্তরাল আরও একটি সংগঠন? পোড়খাওয়া নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন, ‘যুবা’ তৈরির পদক্ষেপ ছিল শুভেন্দুকে পাকাপাকি ভাবে সরিয়ে অভিষেকের হাতে যুব তৃণমূল তুলে দেওয়ার ভিতপুজো। ঘটনাও তেমনই ঘটেছিল। যুব তৃণমূলের সভাপতি করা হয়েছিল অভিষেককে।

চড় চণ্ডীপুর

যুব তৃণমূলের সভাপতি পদ থেকে শুভেন্দুকে সরানো এবং তার পরে ভায়া সৌমিত্র সেই দায়িত্ব অভিষেককে দেওয়া নিয়ে দলের অন্দরে বিভিন্ন ধরনের জল্পনা এবং আলোচনা ছিল। সেই আলোচনা চলতে চলতেই ২০১৫ সালে শুভেন্দুর জেলা পূর্ব মেদিনীপুরে চণ্ডীপুরের একটি সভায় বক্তৃতা করতে উঠে মঞ্চেই চড় খেতে হয়েছিল অভিষেককে। শ্রোতাদের মধ্য থেকে এক যুবক মঞ্চে উঠে অভিষেকের গালে কষিয়ে চড় মেরেছিলেন। অভিষেক শিবিরের দাবি ছিল, শুভেন্দুই ওই কাজ করিয়েছিলেন। যদিও তার কোনও প্রমাণ বা সমর্থন মেলেনি। তবে ওই ঘটনা যে দু’জনের তিক্ততা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

‘মাদার’ বনাম যুব

অভিষেক যুব তৃণমূলের সভাপতি থাকাকালীনই জেলায় জেলায় ‘মাদার’ বনাম যুবর কোন্দল শুরু হয়েছিল। ‘মাদার’ অর্থাৎ তৃণমূলের মূল সংগঠন। সেই লড়াইয়ের কদর্য রূপ দেখা গিয়েছিল ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে। জোড়াফুলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্তরে তৃণমূলের যুববাহিনী ‘নির্দল’ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মালদহ এবং উত্তর দিনাজপুরের (তৃণমূলের তরফে দুই জেলারই পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন শুভেন্দু) মতো জেলায় ‘মাদার’ বনাম যুবর সংঘর্ষে কার্বাইনের মতো অস্ত্রও ব্যবহার করা হয়েছিল!

দিল্লি থেকে কলকাতা

বাম জমানায় ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’ লক্ষ্মণ শেঠকে হারিয়ে ২০০৯ সালে শুভেন্দু হন তমলুকের সাংসদ। জিতেছিলেন ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও। সেই ভোটেই ডায়মন্ড হারবার থেকে প্রথম জিতে সাংসদ হন অভিষেকও। কিন্তু দু’বছরের মধ্যে বিধানসভা ভোটের সময় শুভেন্দুকে দিল্লি থেকে কলকাতায় নিয়ে আসেন মমতা। দাঁড় করান নন্দীগ্রাম আসন থেকে। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে নন্দীগ্রাম থেকে জিতে বিধায়ক হন শুভেন্দু। যোগ দেন মমতার মন্ত্রিসভায়। তৃণমূলের অন্দরে তখনই অনেকে বলতেন, দিল্লির রাজনীতিতে অভিষেককে ‘ফাঁকা মাঠ’ দেওয়ার জন্যই শুভেন্দুকে নিয়ে আসা হয়েছিল রাজ্যে। শুভেন্দু তত দিনে রাহুল গান্ধী-সহ জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে ওঠাবসা শুরু করেছেন। সেই সময়ে রাজ্যে ফিরে আসতে তিনি খুব ‘স্বচ্ছন্দ’ বোধ করেননি। ঘটনাপরম্পরা বলছে, মুখ্যমন্ত্রী মমতার সেই দ্বিতীয় মেয়াদেই একাধিক ঘটনায় শুভেন্দুর সঙ্গে মমতা তথা তৃণমূলের দূরত্ব বাড়তে থাকে। তবে ২০১৯ পর্যন্ত সম্পর্কে ওঠাপড়া থাকলেও সম্পর্কটা টিকে ছিল।

২০১৯ সালে ‘ধাক্কা’ এবং খড়্গপুর

রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরে তৃণমূল প্রথম ‘ধাক্কা’ খেয়েছিল ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে। ১৮টি আসন জিতে নিয়েছিল বিজেপি। তার পরে বহু জায়গায় তৃণমূলকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয় পদ্মশিবির। সেই পর্বে একটি মামুলি উপনির্বাচন হয়ে উঠেছিল তৃণমূলের কাছে ‘ঘুরে দাঁড়ানোর মঞ্চ’। ২০১৯ সালে বিজেপির দিলীপ ঘোষ সাংসদ হন মেদিনীপুর থেকে। সাংসদ হওয়ায় খড়্গপুর সদর বিধানসভা আসন ছাড়তে হয় দিলীপকে। ফলে উপনির্বাচন হয় সেখানে। সেই ভোটের ‘দায়িত্ব’ মমতা দিয়েছিলেন শুভেন্দুকে। ভোট হয়েছিল ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসের শেষে। শুভেন্দুকে গুরুত্ব দিতে সে বারই প্রথম (এবং সে বারই শেষ) তাঁকে কালীঘাটের বাড়িতে ভাইফোঁটায় নিমন্ত্রণ করেছিলেন মমতা। ভাইফোঁটা দেওয়ার পরে শুভেন্দুকে মমতা প্রশ্ন করেছিলেন, খড়্গপুর সদরের উপনির্বাচনে কী হবে। শুভেন্দু দিদিকে আশ্বস্ত করেছিলেন, তৃণমূলই জিতবে। আসন পুনরুদ্ধার হবে। যা শুনে সর্বসমক্ষেই শুভেন্দুকে মমতা বলেছিলেন, ‘‘তোর মুখে ফুল-চন্দন পড়ুক।’’ শুভেন্দু কথা রেখেছিলেন। খড়্গপুর সদর পুনরুদ্ধার করেছিল তৃণমূল।

পর্যবেক্ষক পদের বিলোপ

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার পরেই প্রশান্ত কিশোরের সংস্থা আই-প্যাককে পরামর্শদাতা সংস্থা হিসাবে নিয়োগ করেছিল তৃণমূল। তার পরেই তৃণমূলের সংগঠনে সংস্কার শুরু হয়। তুলে দেওয়া হয় জেলাভিত্তিক পর্যবেক্ষক ব্যবস্থা। শুভেন্দু ছিলেন জঙ্গলমহলের বেশ কয়েকটি জেলা-সহ উত্তর দিনাজপুর, মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের পর্যবেক্ষক। ২০১১ সাল থেকে বিভিন্ন ঘটনায় শুভেন্দুর সঙ্গে তৃণমূলের এবং পর্যায়ক্রমে অভিষেকের যে সংঘাত চলছিল, তা চূড়ান্ত আকার নেয় পর্যবেক্ষক ব্যবস্থা উঠিয়ে দেওয়ার পর। বলা দরকার, সেই ব্যবস্থা বিলোপের নেপথ্যে অভিষেকের ভূমিকা ছিল। শুভেন্দু বিজেপিতে যাওয়ার পরে অভিষেকও দাবি করেছিলেন, পর্যবেক্ষক ব্যবস্থা তুলে দেওয়া যে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল, তা প্রমাণিত হয়েছে শুভেন্দুর দলত্যাগে। প্রসঙ্গত, পর্যবেক্ষক শুভেন্দু চেয়েছিলেন তিনি যে জেলাগুলি দেখভাল করেন, বিধানসভা ভোটে সেখানকার প্রার্থিতালিকা তিনিই চূড়ান্ত করবেন। অভিষেক পরে বলেছিলেন, শুভেন্দুর পরিকল্পনা ছিল, ‘নিজের লোককে’ বিধায়ক করে সরকারকে বিপাকে ফেলা। পর্যবেক্ষক ব্যবস্থা তুলে দিয়ে সেটা রুখে দেওয়া হয়েছিল।

কোভিড পর্ব

২০২০ সালের মার্চ থেকে যখন কোভিডের কবলে দুনিয়া, তখনই একলা চলা শুরু করেন শুভেন্দু। ব্যক্তিগত উদ্যোগে জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ত্রাণসামগ্রী পাঠানোকে অভিযানের আকার দেন। কাজকর্মের ধাঁচে বুঝিয়ে দেন, তিনি নতুন পথের সন্ধানে। প্রকাশ্যে না-এলেও মাঝখানে একাধিক ঘটনায় মন্ত্রী শুভেন্দুর সঙ্গে মমতার সরকারের মতান্তর হয়েছে। পরিবহণমন্ত্রী শুভেন্দু গণপরিবহণ ব্যবস্থায় কিছু সংস্কার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর হাত বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। দফতরের কোনও ফাইল মন্ত্রী শুভেন্দুর কাছে না-পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। অতিমারির প্রথম ঢেউ পেরিয়ে প্রাথমিক ভাবে ট্রেন, বাস, উড়ান চালু হওয়ার পর নন্দীগ্রামের একটি কর্মসূচি থেকে শুভেন্দু স্পষ্ট করে দেন, তিনি রাজনীতির ‘নতুন পথ’ খুঁজে পেয়েছেন। ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির ভিড়ে ঠাসা সভায় শুভেন্দু বলেছিলেন, ‘‘রাজনীতির ময়দানে দেখা হবে। লড়াইয়ের ময়দানে দেখা হবে।’’ তার কয়েক দিন পর থেকেই ধাপে ধাপে মন্ত্রিত্ব, হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান পদ, বিধায়কপদ ছাড়তে থাকেন শুভেন্দু। ঘটনাচক্রে, শুভেন্দু যখন নিজের রাস্তা খুঁজছেন, তখনই আই-প্যাককে সঙ্গে নিয়ে শাসক শিবিরে নতুন ঘরানা নির্মাণ করছিলেন অভিষেক।

সামাল সামাল!

শুভেন্দুর সাংগঠনিক দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং লড়াইয়ের ইতিহাসের কথা মাথায় রেখে প্রশান্ত কিশোর চেয়েছিলেন তাঁকে তৃণমূলে রাখতে। তখন দুয়ারে বিধানসভা ভোট। ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর শ্যামবাজারে জনৈক কর্মীর বাড়িতে বৈঠক হয় শুভেন্দু-অভিষেকের। সেখানে ছিলেন প্রশান্ত কিশোর-সহ তৃণমূলের দুই বর্ষীয়ান সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সৌগত রায়। বৈঠকের মাঝে অভিষেকের ফোন থেকেই মমতার সঙ্গে কথা বলেছিলেন শুভেন্দু। কিন্তু বরফ গলেনি। অভিষেক শুভেন্দুকে রসগোল্লা খাইয়ে দিতে চেয়েছিলেন নিজের হাতে। শোনা যায়, শুভেন্দু রসগোল্লা খেলেও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে নড়েননি। আবার মতান্তরে, শুভেন্দু রসগোল্লা খেতেই চাননি। শ্যামবাজারের বৈঠককে ব্যর্থ প্রমাণিত করে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে অমিত শাহের হাত ধরে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু।

বনাম মমতা

তৃণমূলে থাকার সময় শুভেন্দুর প্রতিপক্ষ ছিলেন অভিষেক। কিন্তু তিনি বিজেপিতে যাওয়ার পর থেকে তাঁর প্রতিপক্ষ হন মমতা স্বয়ং। তাতে মমতার নিজের অবদানও কম ছিল না। ২০২১ সালের ভোটে হঠাৎই নন্দীগ্রাম থেকে লড়ার কথা ঘোষণা করে দেন মমতা। তাঁর ওই আকস্মিক ঘোষণা সম্পর্কে কেউই আগে থেকে অবহিত ছিলেন না। হকচকিয়ে যায় গোটা তৃণমূল। বিস্মিত হন প্রশান্ত কিশোরও। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ‘ইচ্ছা’ হল ‘নির্দেশ’। ফলে মমতা-শুভেন্দু নন্দীগ্রামে মুখোমুখি লড়াই হয়। দু’হাজারেরও কম ভোটে হেরে যান মমতা। ১৯৮৯ সালের পরে ৩২ বছর পর সেই প্রথম কোনও নির্বাচনে পরাজয় মমতার। তবে মুখ্যমন্ত্রী হারলেও তৃণমূল ২০০-র বেশি আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ফলে মমতাই মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেন। তার পরে ভবানীপুর থেকে উপনির্বাচনে জেতেন। শুভেন্দু হন বিরোধী দলনেতা।

নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন থেকে শুভেন্দুর উত্থান। তার আগে তিনি বিধায়ক হলেও সে ভাবে রাজ্যব্যাপী পরিচিতি ছিল না। মমতা নন্দীগ্রাম আন্দোলনের ‘মুখ’ হয়ে উঠলেও মাঠে-ময়দানের সংগঠনের ভার ছিল শুভেন্দুর উপরেই। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকারকে বিপাকে ফেলতে শুভেন্দুর ভূমিকার কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে মমতার নন্দীগ্রাম নিয়ে লেখা বইয়েও। একদা মমতার নির্ভরযোগ্য সেনানী গত পাঁচ বছরে হয়ে গেলেন মমতার মূল প্রতিপক্ষ।

এবং ভবানীপুর

গত বার মমতা গিয়েছিলেন শুভেন্দুর ‘ঘরের মাঠে’। এ বার শুভেন্দু লড়তে এসেছিলেন মমতার ‘পাড়া’ ভবানীপুরে। ছবি বদলায়নি। মমতাকে আবার হারিয়েছেন শুভেন্দু। নন্দীগ্রামের চেয়ে অনেক বেশি ব্যবধানে। ভবানীপুরের লড়াই পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, সম্ভবত ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতেও নজিরবিহীন। কারণ, ভবানীপুর দেখেছে মুখ্যমন্ত্রী বনাম বিরোধী দলনেতার লড়াই। মুখ্যমন্ত্রীকে হারিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে— এমন নজির নেই পশ্চিমবঙ্গে।

প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল তৃণমূলে অভিষেকের উত্থানের মধ্য দিয়ে। এক দিকে তৃণমূলের সংগঠনে, ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছিলেন অভিষেক। তার সমান্তরালে মমতার নিয়তি হয়ে উঠেছিলেন শুভেন্দু। যার শুরু হয়েছিল ব্রিগেডে। বৃত্ত সম্পূর্ণও হচ্ছে সেখানেই।

Advertisement
আরও পড়ুন