Suvendu Adhikari’s PA Murder Death

অস্থির সময়ে শুভেন্দু-সঙ্গী হত্যায় কি ‘বাইরের হাত’, অনুসন্ধান নানা সূত্রে

দিনের কাজ সেরে মধ্যমগ্রামে বাড়ি ফেরার পথে বুধবার রাতে খুন হয়েছেন শুভেন্দুর ব্যক্তিগত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথ। হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে এখনও পর্যন্ত একটি ‘হ্যাচব্যাক’ গাড়ি এবং চারটি মোটর বাইক ব্যবহৃত হওয়ার কথা জানতে পেরেছে পুলিশ।

সন্দীপন চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: ০৮ মে ২০২৬ ০৯:১৫

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

বিধানসভা নির্বাচনের জনাদেশ সামনে এসে গিয়েছে। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী রাজভবনে গিয়ে ইস্তফা দিতে অস্বীকার করলেও সেই সরকারের কার্যকারিতা নেই। আবার নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ এখনও হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে এমনই এক টালমাটাল সময়কে বেছে নিয়ে বিজয়ী বিজেপি শিবিরের প্রধান মুখ শুভেন্দু অধিকারীর ব্যত্তিগত সহায়ককে পেশাদারি কায়দায় খুন করার নেপথ্যে ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্রে’র আশঙ্কা উঠে আসছে গোয়েন্দা সূত্রে। ঘটনার পরিকল্পনা কাদের এবং কারা তার বাস্তবায়ন ঘটাল, সেই গোটা রহস্য উদ্ধারের জন্য সর্বোচ্চ তৎপরতার বার্তা দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে। আর এই পরিস্থিতিতে দলের কর্মী-সমর্থক বাহিনীকে শান্ত রাখতে পরীক্ষার মুখে পড়তে হচ্ছে বিজেপি নেতৃত্বকে।

দিনের কাজ সেরে মধ্যমগ্রামে বাড়ি ফেরার পথে বুধবার রাতে খুন হয়েছেন শুভেন্দুর ব্যক্তিগত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথ। হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে এখনও পর্যন্ত একটি ‘হ্যাচব্যাক’ গাড়ি এবং চারটি মোটর বাইক ব্যবহৃত হওয়ার কথা জানতে পেরেছে পুলিশ। যশোর রোড ধরে বেশ কয়েক কিলোমিটার চন্দ্রনাথের গাড়ির যাত্রাপথ অনুসরণ করেছিল দুষ্কৃতীদের গাড়ি, যা তারা ঘটনাস্থলের কাছেই ফেলে যায়। বাইক বাহনে যারা এসেছিল, তাদের মধ্যে ছিল নিশানায় দক্ষ বন্দুকবাজ। প্রাথমিক তদন্তে মনে করা হচ্ছে, দুষ্কৃতীরা ‘গ্লক’ (জি৪৩এক্স) ধরনের পিস্তল ব্যবহার করেছে। সেমি-অটোমেটিক ওই পিস্তলে ১০ রাউন্ডের ম্যাগাজিন লোড করা যায়। চন্দ্রনাথের এসইউভি-র জানলার কাচ ভেদ করে নিপুন হাতে গুলি চালিয়ে আলাদা পথ ধরে চম্পট দেয় দুষ্কৃতীরা। সব চেয়ে বড় কথা, এই গোটা অভিযানের যাবতীয় ‘সূত্র’ লোপাট করার জন্য সব রকমের চেষ্টা করা হয়েছে। যাতে সেই সূত্র ধরে অপরাধীদের কাছে পৌঁছনো না যায়। গোয়েন্দা সংস্থার অভিমত, এই রকম পরিকল্পনামাফিক অভিযান করা সাধারণ দুষ্কৃতী বা কোনও রাজনৈতিক দলের গুন্ডাদের কাজ নয়। এর পিছনে বড় কোনও ষড়যন্ত্র এবং বাইরের শক্তির হাত থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না গোয়েন্দা সূত্রে।

সূত্রের খবর, ঘটনার রাতেই সক্রিয় হয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। খোঁজ নেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকেও। কথা বলা হয়েছে শুভেন্দুর সঙ্গেও। নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ উপলক্ষে রাজ্যে আসার কথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং একাধিক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর। নবনির্বাচিত বিধায়কদের নিয়ে পরিষদীয় নেতা বাছাইয়ের জন্য বৈঠকের পর্যবেক্ষক কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আগেই শহরে এসে পড়ছেন। এই সময়েশুভেন্দুর বিশ্বস্ত সহায়কের হত্যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোরালো করে তুলেছে। ঘটনার পরেই তৎপর হয়েছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। সূত্রের বক্তব্য, সীমান্ত পারের পরিকল্পনা স্থানীয় দুষ্কৃতীদের সাহায্য নিয়ে কার্যকর করার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। একাধিক রাজ্যে ইতিমধ্যে এমন ঘটনা দেখা গিয়েছে। যেখানে পরিকল্পনা করেছে বাইরের সংস্থা, ঘটনা ঘটিয়েছে ভিতরের কেউ। তদন্তকারীদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক ঘরানার আমূল বদল ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন হিন্দুত্ববাদের স্লোগান তোলা নেতৃত্ব। তাঁদের মধ্যে শুভেন্দু নিজেই অগ্রগণ্য। সরকার হস্তান্তরের মধ্যবর্তী সময়ের ফাঁকের ফায়দা নিয়ে আতঙ্ক ও অস্থিরতা তৈরি করতে ‘সফ্‌ট টার্গেট’ হিসেবে শুভেন্দুর ব্যক্তিগত সহায়ককে নিশানা করা হয়ে থাকতে পারে বলে গোয়েন্দা সূত্রের সন্দেহ।

যে গাড়িটি দুষ্কৃতীরা ব্যবহার করেছিল, তার নাম্বার প্লেট ছিল জাল। ওয়েবসাইটে গাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপন থেকে নাম্বারটি নিয়েছিল দুষ্কৃতীরা। কিন্তু গোয়েন্দা সূত্রের খবর, সাধারণ দুষ্কৃতীদের মতো শুধু একটি ভুয়ো নাম্বার প্লেট নিজেদের গাড়িতে ব্যবহার করা হয়নি। নাম্বারের মালিক প্রকৃত পক্ষে কে, তার হদিস পেতে ফোনে খোঁজখবর করা হয়েছিল। সেই সূত্র ধরে উত্তরপ্রদেশের বদাঁয়ু এলাকার একটি যোগ পাওয়া গিয়েছে। তার পরেই উত্তরপ্রদেশ পুলিশের এসটিএফ আসরে নেমেছে, সমন্বয় রাখা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের তৈরি বিশেষ তদন্তকারী দলের (এসআইটি) সঙ্গেও। তবে তদন্ত আরও এগোনোর আগে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে বা কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছেতে নারাজ তদন্তকারীরা।

পুলিশের তদন্তে ভরসা রাখার কথাই বলছেন শুভেন্দু। বারাসত হাসপাতালের মর্গে বৃহস্পতিবার তাঁর এত দিনের সঙ্গীর দেহের ময়না তদন্তের সময়ে সেখানে গিয়েছিলেন শুভেন্দু। হাসপাতালে ছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার, রাজ্যসভার সাংসদ রাহুল সিন্হা-সহ দলীয় নেতৃত্ব। চন্দ্রনাথের দেহ নিয়ে শুভেন্দু চণ্ডীপুর রওনা হওয়ার আগে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লকের জেলা সম্পাদক তথা বারাসতের প্রাক্তন উপ-পুরপ্রধান সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। শুভেন্দুর সঙ্গে তাঁদের কথাও হয়েছে। পরে শুভেন্দু অবশ্য চন্দ্র-হত্যা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘‘একটি নিষ্পাপ, শিক্ষিত, তরুণকে খুন করা হল কেবলমাত্র বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর সহায়ক বলে আর শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়েছে বলে! চন্দ্রনাথের অপরাধের কোনও ইতিহাস নেই। সরাসরি রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিল না। বিরোধী দলনেতার সহায়ক হওয়ার জন্যই ওকে খুন করা হয়েছে।” তদন্তে দুষ্কৃতীদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি দলের কর্মীদের সংযত থাকার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের একাংশ অবশ্য সুর চড়াতে সুর করেছেন। এই পরিস্থিতিতেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক অবশ্য ইঙ্গিত করেছেন, ‘‘ভারতের যেখানে যত অনুপ্রবেশ ঘটেছে, তার কেন্দ্রবিন্দু এই বারাসত-মধ্যমগ্রাম অঞ্চল। এখানে দীর্ঘ দিন ধরে অসামাজিক কাজকর্ম চলে। জাল আধারকার্ড, ভোটার কার্ড সংগ্রহ করে অনুপ্রবেশকারীরা গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।’’ তাঁর ক্ষোভ, ‘‘একটা সরকারের বদল ঘটলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকে। আমরা বলেছিলাম, পুলিশকে কড়া অবস্থান নিতে। কোনও প্রতিহিংসার রাজনীতি যাতে না হয়, সে কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলাম। কিন্তু এটা কী হচ্ছে? আমাদের তিন জন কর্মী খুন হলেন। যাঁর সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই, প্রাক্তন সেনাকর্মী, তাঁকে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হল।’’ সেই সঙ্গেই শমীকের সংযোজন, ‘‘কী ভাবছে, আমাদের ক্ষমতা নেই? সিংহ স্থবির বলে কেউ যদি ভাবে পদাঘাত করবে, ভুল করছে!’’

আরও পড়ুন