—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
পরিবারতন্ত্রের ছায়া কি ছাড়তে পারল না পানিহাটি?
গত মঙ্গলবার শাসকদলের প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পরে বি টি রোড সংলগ্ন বিধানসভা কেন্দ্র পানিহাটি জুড়ে ‘পরিবারতন্ত্র’ শব্দবন্ধটাই ঘুরপাক খাচ্ছে। এই বিষয়টিকে এ বারে প্রচারেও হাতিয়ার করতে চাইছে বিরোধী শিবির। তাঁদের কথায়, ‘‘একটি পরিবারের প্রায় সব সদস্য পুরসভা থেকে বিধানসভা, সর্বত্র কোনও না কোনও পদে থাকছেন। যা থেকে স্পষ্ট যে, পানিহাটিতেও তৃণমূল একটি নির্দিষ্ট পরিবারের কুক্ষিগত দল।’’ যদিও শাসকদলের পাল্টা দাবি, এ সবই বিরোধীদের অপপ্রচার।
তবে, প্রকাশ্যে শাসকদলের নেতা-কর্মীরা যা-ই বলুন, একাংশের ক্ষোভ যে ছাইচাপা আগুনের মতো জ্বলছে, তা-ও স্পষ্ট। এই ক্ষোভ প্রশমনে বুধবার প্রার্থী-সহ অন্য নেতাদের নিয়ে বৈঠক করতে হয়েছে দমদম-ব্যারাকপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতিকে। যদিও কোনও দ্বন্দ্বের কথা স্বীকার করেননি সভাপতি পার্থ ভৌমিক। প্রসঙ্গত, এ বার পানিহাটিতে তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন বিধায়ক তথা বিধানসভার মুখ্য সচেতক নির্মল ঘোষের ছেলে, পানিহাটি পুরসভার চেয়ারম্যান পারিষদ তীর্থঙ্কর ঘোষ।
এক সময়ে তৃণমূলের পুরপ্রতিনিধি থাকলেও কয়েক বছর আগে বিজেপিতে যোগ দেওয়া, স্থানীয় নেতা কৌশিক চট্টোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘এই পরিবারতন্ত্রের জন্যই পুরনো তৃণমূল কর্মীরা অনেকে বসে গিয়েছেন। তৃণমূলকে পারিবারিক দলে পরিণত করার জন্য আমার মতো অনেকে বিজেপিতে চলে এসেছেন।’’ একই সুরে সিপিএমের জেলা নেতা শুভব্রত চক্রবর্তী বলেন, ‘‘ঘোষ পরিবারের বাইরে তো পানিহাটিতে কিছু হয় না। আর জি করের তরুণী চিকিৎসকের দেহ তড়িঘড়ি পুড়িয়ে দেওয়া থেকে নির্বাচনে প্রার্থী— সবই নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁরা।’’
তীর্থঙ্কর প্রার্থী হওয়ায় পরিবারতন্ত্রের বিতর্ক কেন? রাজনৈতিক মহল সূত্রের খবর, ১৯৯৬ সালে পানিহাটিতে প্রথম বার কংগ্রেসের টিকিটে জিতে বিধায়ক হন নির্মল। ২০০১ সালে তিনি হন তৃণমূলের বিধায়ক। মাঝে ২০০৬ সালে পরাজিত হলেও ২০১১ থেকে টানা বিধায়ক রয়েছেন। নির্মলের ভাই স্বপন ঘোষ দীর্ঘ কাল পানিহাটির পুরপ্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পুরপ্রধান এবং ২০২০ থেকে পুর প্রশাসক পদেও ছিলেন স্বপন। তবে, করোনায় তাঁর মৃত্যু হয়। আবার, নির্মলের বড় মেয়ে ছন্দা ঘোষ এক সময়ে পুরপ্রতিনিধি ছিলেন। ছোট মেয়ে তন্দ্রা ঘোষও ২০১৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত পুরপ্রতিনিধি এবং ২০১৮ থেকে ২০২১ পর্যন্ত পুর প্রশাসকমণ্ডলীর কোঅর্ডিনেটর ছিলেন। এখন তন্দ্রা তৃণমূল মহিলা কংগ্রেসের রাজ্য সম্পাদক।
২০২২ সালে তীর্থঙ্কর প্রথম পুর ভোটে দাঁড়িয়ে পুরপ্রতিনিধি হয়ে জল বিভাগের চেয়ারম্যান পারিষদ হন। এ বার বয়সের কারণে সত্তরোর্ধ্ব নির্মলের টিকিট পাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি, স্থানীয় স্তরে দলের অন্দরেই তাঁকে নিয়ে উঠছিল বিবিধ অভিযোগ। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে নির্মলের ছেলেকে প্রার্থী করা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা।
শুভব্রতের কথায়, ‘‘পানিহাটিতে কি ওই বাড়ির বাইরে যোগ্য প্রার্থী নেই? স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের বলব, এ বার আপনাদেরও ভাবার সময় এসেছে।’’ আর কৌশিক বলছেন, ‘‘পানিহাটির মানুষকে বলব, কাকে জেতানো উচিত, সেটা ভেবে ভোট দিন।’’
যদিও নির্মলের দাবি, ‘‘আমার ছেলে বা মেয়ে বলে বিষয় নয়। প্রার্থী ছোটবেলা থেকে রাজনীতি করছেন। প্রায় পাঁচ বছর ধরে পুরসভার দায়িত্বে। তাই দল তাঁকে টিকিট দিয়েছে।’’ একই ভাবে তাঁর মেয়ে ও ভাইও এক-এক সময়ে বিভিন্ন পদে থেকেছেন বলেই দাবি করে নির্মল আরও বলেন, ‘‘এ সব অপপ্রচার না করে বিরোধীরা লড়াইয়ের ময়দানে আসুক।’’
তীর্থঙ্করের কথায়, ‘‘যাঁরা গত ছ’দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনীতির মূল স্রোতে যুক্ত আছেন, তাঁদের মধ্যে থেকে বিভিন্ন সময়ে কেউ না কেউ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব করতেই পারেন। আর, আমরা যদি রাজনীতিতে না থাকি, তা হলে কি বিরোধীরা মনে করছেন যে, ওঁদের জেতা সম্ভব হবে?’’