ধ্বংসস্তূপ: হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছে নির্মীয়মাণ গুদাম। বুধবার, তারাতলার ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোডে। ছবি: স্বাতী চক্রবর্তী।
তারাতলার ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোডের নির্মীয়মাণ গুদাম ভেঙে পড়ার ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে দশ বছর আগের একটি দিন। ৩১ মার্চ, ২০১৬। ওই দিন পোস্তায় বিবেকানন্দ উড়ালপুল হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছিল। সেই দুর্ঘটনায় মোট ২৬ জনের মৃত্যু হয়। তবে, সেই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়নি প্রশাসন। তাই ফের বুধবার দুপুরে অনেকটা একই রকম গাফিলতির কারণে আরও একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে গেল। দু’টি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেই অভিযোগ, নির্মাণকাজে নিম্ন মানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছিল। কাজের পদ্ধতিগত ত্রুটি নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার তারাতলার ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোডের দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানান, ঢালাই নিয়ম মেনে হয়নি। বিমের উপরে নাট-বল্টু দিয়ে টিন বসিয়ে তার উপরে ঢালাই হচ্ছিল! নীচে ভার ধরে রাখার উপযুক্ত কিছু ছিল না। মন্ত্রী বলেন, ‘‘গুদাম নির্মাণের আগে কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল। কে অনুমোদন দিলেন, কী ভাবে অনুমোদন মিলল— সব কিছুর তদন্ত হবে।’’
বিবেকানন্দ উড়ালপুল বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে বালি, রড সরবরাহ এবং ঢালাইয়ের কাজ নিয়ে গাফিলতির বিস্তর অভিযোগ উঠেছিল। তারাতলার ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোডের নির্মীয়মাণ গুদাম ভেঙে পড়ার ঘটনাতেও সামগ্রীর নিম্ন মান ও কাজের পদ্ধতিগত ত্রুটি নিয়ে বহু অভিযোগ উঠছে।
আরও অভিযোগ, তারাতলার গুদামে আগে তেতলা এবং তার পরে দোতলার ঢালাই হয়েছিল। এ দিন একতলার ঢালাইয়ের কাজ চলছিল। আর সেই কাজ চলাকালীনই পুরো কাঠামো হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, কোনও ভারী কলাম বা কাঠামো ছিল না। অর্থাৎ, অবলম্বন ছাড়াই চার পাশে শুধু লোহার বিমের উপরে টিন বসিয়ে তার উপরে ঢালাইয়ের কাজ হচ্ছিল। এর মধ্যে মঙ্গলবার বিকেলে ভারী বৃষ্টি হয়। এ দিকে, ঢালাই করার সময়ে সেই ভার ধরে রাখার জন্য নিয়ম মেনে পোক্ত কোনও কাঠামোই ছিল না। যার জেরে তেতলার ছাদ থেকে পুরো ছাউনি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে।
পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের এক ইঞ্জিনিয়ার জানান, সাধারণ বাড়ি তৈরির রড দিয়ে এই গুদামে ঢালাইয়ের কাজ হচ্ছিল। যা বিপজ্জনক। কারণ, বিশাল ওই গুদামের ক্ষেত্রে ভারী লোহার বিমের উপরে টিন বসিয়ে সরু রড মোটেও নিরাপদ নয়।
বিবেকানন্দ উড়ালপুল ভেঙে পড়ার ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছিল নির্মাণ-নকশা, কাঁচামাল এবং একাধিক ক্ষেত্রে অসঙ্গতির। নিম্ন মানের সামগ্রী সরবরাহের অভিযোগে স্থানীয় তৃণমূল বিধায়কের ছেলের নাম জড়ায়। যদিও সে যাত্রায় তিনি ‘রক্ষাকবচ’ পান। তদন্তে নেমে নির্মাণকারী সংস্থার (আইভিআরসিএল) ইঞ্জিনিয়ার এবং কর্তা-সহ ১০ জনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ।
এ দিনের দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে কলকাতা পুরসভার এলবিএস (লাইসেন্সড বিন্ডিং সার্ভেয়ার) অংশুমান সরকার বলেন, ‘‘এ ক্ষেত্রে নির্মাণকাজের গাফিলতি তো আছেই। তবে কী কী ত্রুটি আছে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। যে পদ্ধতিতে চার পাশে লোহার বিমের উপরে টিন বসিয়ে ঢালাই হচ্ছিল, তা অবৈধ।’’
গত কয়েক বছরে কলকাতায় একের পর এক উড়ালপুল, নির্মীয়মাণ বহুতল, বেআইনি বাড়ি বা গুদাম ভেঙে পড়েছে। সেই সব দুর্ঘটনায় প্রাথমিক পর্বে মৃত ও আহতের যা পরিসংখ্যান পাওয়া যায়, পরবর্তী সময়ে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। প্রশ্ন উঠেছে, নিয়ম না মানার কারণে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার দায় কে নেবে?