—প্রতীকী চিত্র।
কখনও বন্ধ ঘরের ভিতর থেকে একই পরিবারের চার জনের পচাগলা মৃতদেহ উদ্ধারের পরে পুলিশদেখেছে, সব জানলা বন্ধ। ঘরের ভিতরে জ্বলছিল মশার ধূপ! কখনও আবার একই পরিবারের তিন জনের দেহ উদ্ধারের পরে জানাগিয়েছে, শীতের রাতে বদ্ধ ঘরে চালানো ছিল গ্যাস হিটার! শীত এলেই এমন নানা ঘটনা সামনে আসে প্রতি বছর। সব ক্ষেত্রেই এমন মৃত্যুর পিছনে বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস দায়ী বলে ময়না তদন্তে উঠে আসে। কিন্তু পর পর মৃত্যু দেখেও হুঁশ হয় কি? এ বছরে শীতের এই মরসুমে এমন কয়েকটি ঘটনা সামনে আসায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশ সূত্রের খবর, গত মাসের শেষের দিকে বেলেঘাটা অঞ্চলে একটি মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে নেমে অবাক হয়ে যায় পুলিশ। একযুবকের মৃতদেহ যে ঘর থেকে উদ্ধার হয়, সেটি পুরোটাই পুড়ে গিয়েছিল। ওই যুবকের দেহের কিছুটাঅংশ পুড়ে গেলেও ময়না তদন্তে জানা যায়, মৃত্যুর কারণ আগুনে দগ্ধ হওয়া নয়। ওই যুবক মারা যান বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে।বেহালার আর একটি ঘটনায় গত মাসে পুলিশ দেখেছিল, সেখানে একই পরিবারের দুই প্রবীণের মৃত্যু হয়েছে ঘুমের মধ্যে। তদন্তেনেমে পুলিশ জানতে পারে, শীতের রাতে হিটার চালিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন তাঁরা। দু’জনেরই ব্রঙ্কাইটিস ও সাইনাসের সমস্যা ছিল। ময়না তদন্তকারী চিকিৎসকেরা জানিয়েদেন, জানলা-দরজা, ঘরের সমস্ত ঘুলঘুলি বন্ধ করে টানা হিটার চালিয়ে রাখাটাই তাঁদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়।
চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, অক্সিজেন পুড়ে আগুন জ্বলে আর কার্বন ডাইঅক্সাইড তৈরি হয়।কিন্তু যেখানে অক্সিজেনের জোগান কম, অথচ কিছু পুড়ছে বা জ্বলছে, সেখানে কার্বন মনোক্সাইড তৈরি হয়। এই বিষাক্ত গ্যাস নীরব ঘাতকের মতো কাজ করে। বদ্ধ জায়গায়উনুন জ্বালানো হলে কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও সালফার ডাইঅক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হতেপারে। শুধু উনুন নয়, দীর্ঘ সময় ধরে রুম হিটার, ব্লোয়ার ব্যবহার করাটাও ঠিক নয় বলে মত চিকিৎসকদের।তাঁরা জানান, বেশির ভাগ হিটারের ভিতরে ধাতব কিছু উপাদানকে উত্তপ্ত করে তাপ উৎপন্ন করা হয়। ফলে, সংলগ্ন পরিসরে বাতাসের আর্দ্রতা যায় কমে। তা ছাড়া, অনেক ক্ষেত্রেই অক্সিজেন পুড়িয়ে দেয় হিটার। চিকিৎসকেরা জানান, রুম হিটারে সব চেয়ে বেশি সমস্যা হতে পারে শ্বাসকষ্টের রোগীদের।ব্রঙ্কাইটিস ও সাইনাসের সমস্যা থাকলে রুম হিটারের থেকে দূরে থাকা প্রয়োজন। হিটারের বাতাসে ফুসফুসের সমস্যা ও শ্বাসনালির প্রদাহ হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।হ্যালোজেন হিটার বা সাধারণ হিটার থেকে নানা রকম রাসায়নিক নির্গত হয়, যা শ্বাসের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করলে হাঁপানি ও অ্যালার্জির মতো সমস্যা দেখা দেয়।
বক্ষরোগের চিকিৎসক ধীমান গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘‘শরীরের মধ্যে অক্সিজেন বহন করে হিমোগ্লোবিন। অক্সিজেনের বদলে কার্বন মনোক্সাইড শরীরে ঢুকলে হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে মিশে কার্বোক্সিহিমোগ্লোবিন (সিওএইচবি) তৈরি হয়। অক্সিজেন বহনকারী হিমোগ্লোবিনকে তা নিষ্ক্রিয় করে দেয়। শরীরে অক্সিজেন কমে গেলে মৃত্যু অবধারিত। এই পরিস্থিতিতে মাথা ঝিমঝিম, বমির ভাব, ঝিমুনি, শ্বাসকষ্ট দেখাদিলেই দ্রুত সতর্ক হতে হবে।’’ বদ্ধ জায়গায় রান্নার ক্ষেত্রেও একই বিপদ রয়েছে এবং এ ব্যাপারে সতর্ক হতে বলছেন তিনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, রান্নার জ্বালানি থেকে ছড়ানো দূষণেবিশ্বে প্রতি বছর গড়ে ৬০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটছে।
কলকাতা পুলিশের সাম্প্রতিক সমীক্ষাতেও দেখা যাচ্ছে, শহরে যে সব ঝুপড়িতে এমন জ্বালানি ব্যবহার করে রান্না হয়, সেখানেও কার্বন মনোক্সাইড নিঃসরণের মাত্রা ‘ইউনাইটেড স্টেটস এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি’ (ইউএসইপিএ)-র নির্ধারিত মাত্রা ৯ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) থেকে কয়েক গুণ বেশি। কিন্তু শুধু কি সমীক্ষা করাই সার? পুলিশ কেন এ নিয়ে কড়া পদক্ষেপ করছে না? প্রশ্ন থেকেই যায়, স্পষ্ট উত্তর মেলে না।