ধ্বংসস্তূপে চলছে উদ্ধারকাজ। — নিজস্ব চিত্র।
এলাকায় ওঁদের ভোট নেই। তাই ওঁদের প্রতি জনপ্রতিনিধিদের কোনও নজরও নেই। আর সেই কারণেই ওঁদের, অর্থাৎ সীমানা প্রাচীরের ভিতরে থাকা শ্রমিকদের অস্থায়ী জনবসতির খবর কেউ রাখেন না। সে বন্দর এলাকার গুদামই হোক কিংবা শহরের কোনও বড় নির্মাণস্থল। কোনও ক্ষেত্রেই নির্মাণস্থলের ভিতরের শ্রমিক-জীবনের সঙ্গে নগরজীবনের যোগ থাকে না।
কলকাতা বন্দরের তারাতলায় লিজ়ে নেওয়া এমনই একটি গুদামে বুধবার দুপুরে ছাউনি ভেঙে ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরে ত্রুটিপূর্ণ নকশায় কাজ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিরাট বিরাট গুদাম চত্বরের ভিতরে কারা থাকেন, কী ভাবে কাজ হয়, নিরাপত্তা-বিধি কতটা মেনে চলা হয়, আপাত ভাবে তা দেখার কোনও উপায় নেই বলেই জানাচ্ছেন স্থানীয় মানুষ। শুধু বন্দর নয়, কলকাতার বহু বড় আকারের নির্মাণস্থলের ছবি এমনই। যেখানে শ্রমিকেরা কী ভাবে থাকছেন, তার খবর কেউ পান না।
খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, এই সব নির্মাণস্থলের জনজীবনের প্রায় পুরোটাই শ্রমিক-কেন্দ্রিক। অধিকাংশ জায়গাতেই প্রকল্পের কাজ চলাকালীন নির্মাণস্থল কিংবা গুদাম তল্লাটে শ্রমিকেরা অস্থায়ী বসতি তৈরি করে ফেলেন। সংশ্লিষ্ট শ্রমিকেরা এই রাজ্যের কিংবা ভিন্ রাজ্যের বাসিন্দা। ঠিকাদারের মাধ্যমে তাঁরা কাজ করতে আসেন।
অতীতে ছোট-বড় দুর্ঘটনায় এই ধরনের নির্মাণস্থলে শ্রমিক-মৃত্যুর একাধিক ঘটনা ঘটেছে। কয়েক মাস আগেই আনন্দপুরে একটি মোমো সংস্থার গুদামে আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয়েছিল একাধিক মানুষের। তা সত্ত্বেও বেসরকারি সংস্থার সীমানা প্রাচীরের ভিতরে লোকজনের জীবনযাত্রার উপরে নজরদারি চালানোর বিষয়টি যে গুরুত্ব পায় না, বুধবারের তারাতলার দুর্ঘটনায় ফের তা প্রমাণিত।
কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের ব্যাখ্যা, বন্দর এলাকার ওই সব গুদাম ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এর মতো। তিনি বলেন, ‘‘বেসরকারি সংস্থার গুদাম কিংবা নির্মাণস্থলের ভিতরে অনুমতি ছাড়া ঢোকার এক্তিয়ার পুরসভার নেই। যেখানে স্থায়ী বসতি রয়েছে, সেখানে জনপ্রতিনিধি ঘুরে ঘুরে লোকজনের অভাব-অভিযোগ শুনতে পারেন। এখানে বন্দরের জমি লিজ় নিয়ে কোনও সংস্থা গুদাম তৈরি করছে। তার জন্য তারা ভিতরে শ্রমিকদের এনে রেখেছিল। খুব বেশি হলে নকশা অনুযায়ী নির্মাণকজ চলছে কিনা, সময়ে সময়ে পুরসভার আধিকারিক গিয়ে তা দেখতে পারেন।’’
বছর দেড়েক আগে রাজারহাটের লাঙলপোতায় একটি বহুতল আবাসনের নির্মাণস্থলে কুয়ো খুঁড়তে গিয়ে ধস নামায় নীচে চাপা পড়ে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। অনেকেই মনে করেন, এই ধরনের টুকরো ঘটনা আকছার ঘটে। কিন্তু, এমন কোনও ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা আচমকা বেড়ে গেলে তখনই বিষয়টি নিয়ে কিছু দিন নাড়াচাড়া হয়।
কলকাতার পাশেই নিউ টাউনে বহু জায়গায় বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার বড় বড় নির্মাণস্থল রয়েছে। নিউ টাউনের একটি প্রশাসনিক সংস্থার এক পদস্থ আধিকারিকের দাবি, বিধি মেনে নির্মাণ হচ্ছে কিনা, নির্মাণস্থলের ভিতরে ঢুকে সে দিকে তাঁরা লক্ষ রাখেন শুধু। এর বেশি তাঁদের আর কিছু করার নেই।
সরকারি আইন বলছে, এই ধরনের নির্মাণস্থলে শ্রমিকদের নিরাপত্তার উপরে শ্রম দফতরের নজরদারি থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই নজরদারি অত্যন্ত ঢিলেঢালা। অভিযোগ, কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার বা নির্মাণ সংস্থা শ্রম ইনস্পেক্টরদের একাংশের সঙ্গে বোঝাপড়া করে চলেন। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, নিরাপত্তা-বিধি পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে মানতে গেলে প্রকল্পের খরচ বহু গুণ বেড়ে যাবে। তার চেয়ে অনেক সহজ দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিপূরণ দিয়ে দায় ঝেড়ে ফেলা।