নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। —ফাইল চিত্র।
জন্মের কয়েক মাস পর থেকেই বার বার জ্বর আসছিল। কোনও কিছুতেই তা সারছিল না। সম্প্রতি পরীক্ষায় জানা যায়, এক বছর তিন মাসের শিশুটির বাঁ দিকের ফুসফুসের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ফাঁকা জায়গা। সেখানেই জমে আছে রক্ত, পুঁজ, হাওয়া ও শ্লেষ্মা। সেটির অস্ত্রোপচারের সময়ে চিকিৎসকেরা দেখেন, বাম ফুসফুসের প্রধান শ্বাসনালিও একটি বড় ছিদ্রের মাধ্যমে ওই ফাঁকা জায়গায় উন্মুক্ত হয়ে আছে। সেখান দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে অক্সিজেন। দ্রুত ওই ছিদ্র বন্ধ না হলে শিশুটির প্রাণ সংশয় হতে পারে। আবার শিশুটির হৃৎপিণ্ড রয়েছে ডান দিকে।
সব মিলিয়ে সেই জটিল ও ঝুঁকির অস্ত্রোপচার করে শিশুটিকে নতুন জীবনে ফেরাল নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। অস্ত্রোপচারের পরে এখন শিশুটির শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। আপাতত তাকে ভেন্টিলেশন থেকে বার করা হয়েছে বলেই জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
হাসপাতাল সূত্রের খবর, পরিজনেরা চিকিৎসকদের জানিয়েছেন, বারুইপুরের উত্তর বেলগাছির বাসিন্দা, পেশায় মাংসবিক্রেতা ইমরান সর্দারের মেয়ে রিহানার জন্মের কয়েক মাস পর থেকেই ঘন ঘন জ্বর আসছিল। অনেক চিকিৎসা করিয়েও উন্নতি হচ্ছিল না। মাস দেড়েক আগে রিহানাকে চিত্তরঞ্জন শিশু সদন হাসপাতালে নিয়ে আসেন পরিজনেরা। সেখানেই শিশুটির ফুসফুসে পুঁজ জমে থাকার বিষয়টি চিহ্নিত করেন চিকিৎসকেরা। সেই কারণেই বার বার ফুসফুসে সংক্রমণ হয়ে জ্বর আসছিল ওই একরত্তির। এর পরেই শিশুটিকে এন আর এসে পাঠানো হয়।
চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, রিহানার ফুসফুসে জন্মগত যে সমস্যাটি ছিল, তাকে চিকিৎসার পরিভাষায় বলা হয় ‘কনজেনিটাল অ্যাডিনয়েড ম্যালফরমেশন’। এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে ফুসফুসে কর্কট রোগ হওয়ার আশঙ্কাও প্রবল। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি এন আর এসে ভর্তির পরে শিশুটির অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা। কার্ডিয়োথোরাসিক অ্যান্ড ভাস্কুলার সার্জারি বিভাগের শিক্ষক-চিকিৎসক ভুবনদীপ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ছ’জন চিকিৎসকের দল তৈরি হয়। তাতে ছিলেন অ্যানাস্থেটিস্ট শম্পা দত্ত গুপ্ত ও অদিতি দাস ঘড়া। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে অস্ত্রোপচার।
চিকিৎসক ভুবনদীপ জানান, শিশুটির বাঁ দিকের ফুসফুসের ফাঁকা জায়গায় ‘লেফট মেন ব্রঙ্কাস’ বা প্রধান শ্বাসনালিটি উন্মুক্ত হয়ে থাকায় সেখান দিয়ে অক্সিজেন বেরিয়ে যাচ্ছিল। ফলে শিশুটির শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি হচ্ছিল। তিনি বলেন, ‘‘দ্রুত ওই ছিদ্র বন্ধ করতে না পারলে শিশুটির মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারত।’’ অ্যানাস্থেটিস্ট অদিতি দাস ঘড়া জানান, শিশুটির বুকের বাঁ দিক পুরো কাটা হয়েছিল। ডান দিকে হৃৎপিণ্ড থাকায়, সে আচমকা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হলে বড় সমস্যা হত। তিনি বলেন, ‘‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে হৃদ্যন্ত্র পাম্প করা সম্ভব হত না। তবে সেই ঝুঁকিও এড়ানো গিয়েছে।’’
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, অস্ত্রোপচার করে শ্বাসনালির ছিদ্র বন্ধ করা হয়েছে ও ফুসফুসের নষ্ট হয়ে যাওয়া অংশটি কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। ভুবনদীপ বলেন, ‘‘এই ধরনের অস্ত্রোপচার বিরল গোত্রের মধ্যেই পড়ে।’’ খুব তাড়াতাড়ি রিহানাকে ছুটি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। ইমরান বলেন, “নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে মেয়েকে চিকিৎসকেরা ফিরিয়ে আনলেন। সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকব।”