Cooking Gas

কড়াপাক, রমজানি সামোসার দফারফা গ্যাস-আকালে

সিলিন্ডার-সঙ্কটে মেনু কাটছাঁটের রাস্তাই আশু সমাধান ভাবছে শহরের অনেক রথী-মহারথীই। বিজলি গ্রিলের বিভিন্ন আউটলেট যেমন ফিশ ফ্রাই, ফিশ রোল ভাজা রাখলেও মোগলাই পরোটাকে সাময়িক বিসর্জন করছে।

ঋজু বসু
শেষ আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২৬ ১০:০৯

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

ঘন দুধে সর তুলতে বাড়তি গ‍্যাস পুড়ছে। তাই মালাই রোল, মালাই শিঙাড়ার মতো জনপ্রিয় সৃষ্টি বন্ধই করেছে সিমলেপাড়ার নকুড় নন্দী। কড়াপাকও কালেভদ্রে হচ্ছে। জ্বালানির আকালে দেড় শতকের ঐতিহ‍্যবাহী ভীম নাগেরও ঝাঁপ ফেলার পরিস্থিতি।

‘কলকাতা বিরিয়ানি’র ওস্তাদ সিরাজের কর্তারাও যেন সময়যানে চড়ে কয়েক দশক পিছোতে চাইছেন। গ‍্যাস-পোড়ানো ঝোল, কাইয়ের রান্না যদ্দূর সম্ভব কমিয়ে বিরিয়ানি (সম্ভব হলে মাংসের চাঁপও) কাঠকয়লার আঁচে নামানোর প্রস্তুতি চলছে।

অদ্ভুত এক মন খারাপের রমজান দেখছে কলকাতা। কলুটোলার শতাব্দী-প্রাচীন হাজি আলাউদ্দিন পার্বণী মাংসের সামোসা, ঘি-সুরভিত আলু-পালংশাকের মুচমুচে পকোড়া ভাজা বন্ধ রেখেছে। তরুণ কর্তা ইজাজ় আহমেদ নিরুপায়, “গ‍্যাস সিলিন্ডারের আকালে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হল। তবে রমজান স্পেশাল অমৃতি, মাওয়ার কচুরি চালিয়ে যাচ্ছি।”

সিলিন্ডার-সঙ্কটে মেনু কাটছাঁটের রাস্তাই আশু সমাধান ভাবছে শহরের অনেক রথী-মহারথীই। বিজলি গ্রিলের বিভিন্ন আউটলেট যেমন ফিশ ফ্রাই, ফিশ রোল ভাজা রাখলেও মোগলাই পরোটাকে সাময়িক বিসর্জন করছে।

শহরের ফুড স্ট্রিট পার্ক স্ট্রিটও পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে কোমর বাঁধছে। প্রথমে মোক‍্যাম্বো, এর পরে পিটার ক‍্যাট বৈদ্যুতিক ইন্ডাকশন কুকটপে রান্নার মহড়া দিতে শুরু করেছে। অলিপাবের কর্ত্রী আজ়মিন টাংরি বললেন, “এখনও পর্যন্ত পুরনো মেনু, পুরনো বন্দোবস্ত চললেও এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ফ্রায়েড ফিশ, ফিশ ওরলি, কাটলেটের মতো কিছু ভাজাভুজি ছাড়া সবটাই ইলেকট্রিকের সরঞ্জামে নিয়ে যেতে বাধ‍্য হব! স্বাদ-মান বজায় রেখে এর জন্য ধাতস্থ হতে সময়ও লাগবে।”

সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ে ম‍্যাকাজ়ো-র মতো বিদ্যুতে রান্নার ব‍্যবস্থা-নির্ভর রেস্তরাঁ এই বাজারে সদর্পে ঘোষণা করেছে, আমরা বিদ‍্যুৎচালিত ব‍্যবস্থায় নিশ্চিন্ত আছি! ম‍্যাকাজ়ো-কর্তা সুবর্ণ মিত্র বা শরৎ বসু রোডের ইডলি-দোসা বিক্রেতা এন রাজাস্বামীর মতো কেউ কেউ গ‍্যাসের তুলনায় বিদ‍্যুতে রান্নাই ঢের সাশ্রয় বলে সওয়াল করছিলেন।

ভীম নাগ কর্তা প্রদীপ নাগের চোখে, ‘‘এই পরিস্থিতি বিরাট বিপর্যয়েরই সঙ্কেত! নোট-বন্দি, কোভিডে তালাবন্দির মতো এ তো গ‍্যাস-বন্দি দেখছি। দূষণের অভিযোগে কাঠকয়লার আঁচের পাক বন্ধ হওয়ার পর থেকে আমরা ১০০ ভাগ গ‍্যাস-ব‍্যাঙ্কেই নির্ভরশীল। বাজারে গ‍্যাসের বাণিজ‍্যিক সিলিন্ডারের দাম চোরাগোপ্তা ৪৫০০ টাকা ছুঁই ছুঁই। পুরো ব‍্যবস্থাটা কি আমূল বদলাতে হবে?’’

বিজলি গ্রিলের কর্ণধার তপন বারিক বলছেন, ‘‘নিরুপায় হয়ে অনুষ্ঠান-বাড়ির কাজে গৃহকর্তাকে বলছি, তেল, কড়াই সব দিয়ে দেব, গ‍্যাসের জোগানটা দয়া করে আপনারা সামাল দিন।’’ কিছু ক্ষেত্রে তোলা উনুনে রান্না করা নিয়েও তাঁরা আলোচনা চালাচ্ছেন।

এই সঙ্কটে কিছু রেস্তরাঁর অপমৃত‍্যুও ঘটেছে সাময়িক ভাবে। তবে চিনে-তিব্বতি রান্নার আকর্ষণ পোপোজ়-এর কর্তা সাচিকো শেঠ আশাবাদী, নিশ্চয়ই দ্রুত অবস্থাটা পাল্টাবে। বলবন্ত সিংহের ধাবার কর্তা মণীশ সিংহ বলছেন, এখনই রান্নার খরচ ৫০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে।

মোক‍্যাম্বো, পিটার ক‍্যাট কর্তা নীতিন কোঠারির কথায়, “ইলেকট্রিকে রান্নার জন‍্য বাসনপত্র পাল্টানো থেকে অনেক পরিবর্তন দরকার। খাবারের মানেও হেরফের হয়। এক ফোঁটা আপস না-করেই পরিস্থিতি সামলাতে চাইছি।” তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি না-পাল্টালে, মুশকিল আসান ঘোর অসম্ভব!

আরও পড়ুন