Patuli Shootout

পাটুলিতে খুন: কে ‘রাতের পাখি’ জিৎ? তৃণমূল কাউন্সিলর বাপ্পার সঙ্গে কী সমীকরণ? তাঁর দাবি, ‘আমিই ওকে ওয়ার্ডছাড়া করেছি’

স্থানীয়দের দাবি, জিৎ ‘রাতের পাখি’। তাঁকে দিনেরবেলা দেখা যায় না। তাঁর যাবতীয় দাপট শুরু হয় রাতে। রাত যত বাড়ে, দাপটও বাড়তে থাকে পাল্লা দিয়ে। সে দাপটের ছাপ থেকে যায় গাঙ্গুলিবাগান থেকে নেতাজিনগর, রামগড় থেকে গড়িয়া পর্যন্ত।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৬ ২১:৪১
(বাঁ দিকে) দেবব্রত মজুমদার, জিৎ মুখোপাধ্যায় (মাঝে চিহ্নিত), বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্ত (ডান দিকে)

(বাঁ দিকে) দেবব্রত মজুমদার, জিৎ মুখোপাধ্যায় (মাঝে চিহ্নিত), বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্ত (ডান দিকে) — সংগৃহীত।

ভোটের মুখে খাস কলকাতার পাটুলি থানা এলাকায় গুলিচালনার ঘটনায় আবার সিন্ডিকেটরাজের অভিযোগ মাথাচাড়া দিল। তাতে জড়িয়ে গেল শাসক তৃণমূলের নামও। খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত থেকে নিহত এবং গুলিতে জখম হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীনের সঙ্গেও তৃণমূল-যোগের অজস্র উদাহরণ মিলেছে।

Advertisement

বুধবার মধ্যরাতে পাটুলি থানা এলাকার বাঘাযতীনের পূর্ব ফুলবাগান এলাকায় রাহুল দে নামে এক যুবক খুন হয়েছেন। বছর পঁয়ত্রিশের রাহুল গিয়েছিলেন জিৎ মুখোপাধ্যায় নামের এক জনের বাড়িতে। সেখানেই অন্য চার জন ঢুকে গিয়ে গুলি চালায় বলে অভিযোগ। ঘটনাস্থলেই রাহুলের মৃত্যু হয়। জিৎ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

কিন্তু কে এই জিৎ? স্থানীয়দের দাবি, জিৎ হলেন ‘রাতের পাখি’। তাঁকে দিনে দেখা যায় না। তাঁর যাবতীয় দাপট শুরু হয় রাতে। রাত যত বাড়ে, দাপটও বাড়তে থাকে পাল্লা দিয়ে। সে দাপটের ছাপ থেকে যায় গাঙ্গুলিবাগান থেকে নেতাজিনগর, রামগড় থেকে গড়িয়া পর্যন্ত। জিতের অজস্র ছবি প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে তাঁকে দেখা যাচ্ছে ১০১ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্তের সঙ্গে। কোনও কোনও ফ্রেমে রয়েছেন বাপ্পাদিত্য এবং যাদবপুরে বিধায়ক তথা এ বারেরও তৃণমূল প্রার্থী দেবব্রত মজুমদার। বৃহস্পতিবার বাপ্পাদিত্য মেনে নিয়েছেন, তিনি জিৎকে খুব ভাল করেই চেনেন। তবে তাঁর দাবি, জিৎ তৃণমূলের সদস্য নন। তিনি ‘সমর্থক’ মাত্র। সেই সঙ্গে বাপ্পাদিত্যের এ-ও বক্তব্য, তিনি নিজেই জিতের ‘উপদ্রবে’ অতিষ্ঠ হয়ে উঠে বছর তিনেক আগে তাঁকে এলাকাছাড়া করেছিলেন।

কী করতেন জিৎ? বাপ্পার দাবি, রাত বাড়লেই মদ্যপান করে শুরু হত মারধর। যে কোনও লোককে পিটিয়ে দিতেন নির্মম ভাবে। বাপ্পার কথায়, ‘‘ও একটা ‘নুইসেন্স’। রাত ২টোর সময়েও আমার কাছে ফোন আসত। আমি কেন গায়ে কালি মাখতে যাব? আমিই উদ্যোগ নিয়ে পুলিশকে বলে ওকে আমার ওয়ার্ডছাড়া করেছিলাম। ওকে আর নেওয়া যাচ্ছিল না!’’ বাপ্পাদিত্যের আরও দাবি, ‘‘ও (জিৎ) এই এলাকায় ঢুকত না। আশপাশের এলাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকত। ওর বিরুদ্ধে বেশির ভাগ অভিযোগই নেতাজিনগর থানায়।’’

কিন্তু পূর্ব ফুলবাগান এলাকা তো তাঁর ওয়ার্ডেই! বাপ্পাদিত্যের দাবি, দিন ১৫ আগে জিৎ ফিরেছিলেন নিজের বাড়িতে। বুধবার মধ্যরাতে সেখানেই গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। তাঁর সঙ্গে জিতের ছবি প্রসঙ্গে বাপ্পাদিত্য বলেন, ‘‘ছবি তো থাকতেই পারে। মিটিং-মিছিল-অনুষ্ঠানে কত লোকই তো ছবি তোলে। কত লোকের সঙ্গেই তো কত লোকের ছবি থাকে। তা দিয়ে তো কিছু প্রমাণ হয় না।’’

পুলিশ বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত খুনের কারণ নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। তবে এলাকার রাজনীতি, কাঁচা টাকার কারবার, সিন্ডিকেটরাজ, নৈশকালীন তোলাবাজি সম্পর্কে ওয়াকিবহালদের অনেকেরই দাবি, এর নেপথ্যে থাকতে পারে সাট্টার ঠেকের বখরার লড়াই। গড়িয়া এলাকার একটি সাট্টার ঠেকের দিকে অভিযোগের তির স্থানীয়দের। স্থানীয়দের অনেকের এ-ও দাবি যে, পাটুলি থানা এলাকায় একটা সময়ে জিতের ছবি টাঙিয়ে লেখা ছিল ‘ওয়ান্টেড’। তখনও এলাকায় দাপট নিয়েই ঘোরাফেরা করতেন তিনি।

জিৎ কেন রাহুলকে নিজের বাড়িতে ডাকলেন, দীর্ঘদিন পরে তাঁদের আবার বন্ধুত্ব হল কী ভাবে, মদ্যপানের সময়ে বাকি চার জন কী ভাবে ওই বাড়িতে ঢুকে পড়লেন, ইত্যাদি নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। কিন্তু যাদবপুর, বাঘাযতীন এলাকার শাসকদলের অন্দরে বিভিন্ন আলোচনা শুরু হয়েছে। যে আলোচনায় জুড়ে থাকছে এলাকার দখল রাখতে জিৎদের মতো চরিত্রদের ‘ব্যবহার’ করার কথা। যে আলোচনায় উঠে আসছে টাকার রমরমার আখ্যানও।

একে ভোট। তার মধ্যে এই ঘটনায় অস্বস্তিতে পড়েছে তৃণমূল। কারণ, ছবি প্রকাশ্যে এসে পড়েছে। বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন বিধায়ক দেবব্রত এবং কাউন্সিলর বাপ্পাদিত্য। দেবব্রত পুলিশকে ফোন করে বলেন, ঘটনা যে বাড়িতে ঘটেছে, তার পাশের নির্মীয়মাণ বাড়িটি ‘সিল’ করে দিতে। তা না হলে বহিরাগতদের ঠেকানো যাবে না। যে প্রেক্ষিতে স্থানীয়দের প্রশ্ন, কেন এলাকায় বহিরাগতদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে? স্থানীয়েরা বিধায়ক এবং কাউন্সিলরের কাছে সিসিটিভি বসানোর দাবিও জানিয়েছেন। জমি ছাড়েনি বিরোধীরাও। ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিলেন যাদবপুরের সিপিএম প্রার্থী বিকাশ ভট্টাচার্য, প্রাক্তন বিধায়ক সুজন চক্রবর্তী, সিপিএম নেত্রী তনুশ্রী মণ্ডলেরা। সুজনের বক্তব্য, ‘‘তৃণমূল এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে, ভদ্রলোক মাথা নিচু করে রাস্তা দিয়ে চলবে আর সমাজবিরোধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরবে। এলাকার জনপ্রতিনিধিরাই এদের মাথায় তুলেছে। এই শাসনের অবসান না-হলে মানুষের মুক্তি নেই।’’ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘যে মারা গিয়েছে আর যে মেরেছে, দু’জনেই তৃণমূল। মরছে তৃণমূল, মারছেও তৃণমূল। তৃণমূলের হাতে শুধু বিজেপি-ই আক্রান্ত হবে না। তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাও তৃণমূলের হাতে আক্রান্ত হয়ে যেতে পারেন। এই সময় সকলের সুরক্ষার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।’’

Advertisement
আরও পড়ুন