গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে লিফ্ট বিপর্যয়ের রাতে চার জন নিরাপত্তারক্ষীর ডিউটি ছিল। কিন্তু, তাঁদের মধ্যে দু’জন নিরাপত্তারক্ষী ঘুমোচ্ছিলেন! পুলিশ সূত্রের খবর, নিরাপত্তারক্ষীরা নিজেদের মধ্যে ঠিক করে নিয়েছিলেন, দু’জন ঘুমোবেন, দু’জন কাজ করবেন। এই ভাবে ঘুরিয়ে- ফিরিয়ে রাতের ডিউটি করা হবে।
হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারের বেসমেন্টে লিফ্ট আটকে যাওয়ার পরে লিফ্টের দরজা খুললেও গ্রিলের দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ থাকায় অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী ও তিন বছরের পুত্র বেরোতে পারেননি। পুলিশ সূত্রের খবর, গ্রিলের দরজার তালার একটি চাবি ছিল সুপারের অফিসের নিরাপত্তাকর্মীর কাছে। চাবিটি রাখা ছিল সুপারের অফিসে। লিফ্ট বিপর্যয়ের খবর পেয়ে সুপারের অফিসের নিরাপত্তাকর্মী চাবি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু ঘটনাস্থল থেকে কেউ গিয়ে সেই চাবি নিয়ে আসেননি! এক তদন্তকারীর কথায়, ‘‘বেসমেন্টে লিফ্টের বাইরের গ্রিলের দরজার তালা খুলে দিলেই বাঁচানো যেত অরূপকে। কিন্তু নিরাপত্তাকর্মী, লিফ্টকর্মীদের গাফিলতি আর সমন্বয়ের অভাবেই অরূপের মৃত্যু হয়।’’
লিফ্টে থেঁতলে অরূপের মৃত্যুর ঘটনায় টালা থানার পুলিশের হাতে ধৃত দুই নিরাপত্তাকর্মী, আশরাফুল রহমান ও শুভদীপ দাসকে বুধবার শিয়ালদহ আদালত জামিন দিয়েছে। আদালত সূত্রের খবর, তিন হাজার টাকার বন্ডে জামিন দেওয়া হয়েছে। ধৃত তিন লিফ্টকর্মী, মিলনকুমার দাস, বিশ্বনাথ দাস ও মানসকুমার গুহকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে পাঠিয়েছে আদালত। মামলার সরকারি আইনজীবী স্নেহাংশু ঘোষ বলেন, ‘‘লিফ্টম্যান থাকলে এই ঘটনা ঘটত না। দু’টি স্তরে অবহেলা হয়েছে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে এই ঘটনা ঘটেছে। সে সময়ে অভিযুক্তেরা ছিলেন না। অনেক পরে এলেও তাঁরা কর্তব্যে অবহেলা করেছেন।’’ প্রায় ৩৫ জন প্রত্যক্ষদর্শীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানান স্নেহাংশু।
ঘটনার তদন্ত করছে লালবাজারের হোমিসাইড শাখা। পুলিশ সূত্রের খবর, ঘটনার সময়ে লিফ্টকর্মীরাও অন্যত্র ঘুমোচ্ছিলেন। ঘুমোচ্ছিলেন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই কর্মীও। লিফ্ট বেশ কয়েক বার ওঠানামা করার পরে বেসমেন্টে আটকে যায়। বাঁচার জন্য চিৎকার করতে থাকেন অরূপেরা। অরূপের বাড়ির লোকজন ওই সময়ে ডিউটিতে থাকা এক নিরাপত্তাকর্মীকে সাহায্যের জন্য বললে তিনি জানান, তাঁর তখন ডিউটির সময় কিনা, দেখতে হবে! পুলিশি তদন্তে জানা গিয়েছে, লিফ্ট বেসমেন্টে আটকে যাওয়ার পরে ঘটনাস্থল থেকে এক নিরাপত্তাকর্মী সুপারের অফিসের নিরাপত্তাকর্মীকে ফোন করে সুপারের অফিস থেকে দরজার তালার চাবি নিয়ে তৈরি থাকতে বলেন। সুপারের অফিসের নিরাপত্তাকর্মী চাবি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু প্রায় আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করলেও ঘটনাস্থল থেকে নিরাপত্তারক্ষী গিয়ে সেই চাবি আনেননি। এর মধ্যে তিন লিফ্টকর্মী ঘটনাস্থলে আসেন। তাঁদের মধ্যে এক লিফ্টকর্মী ছাদে লিফ্টের মেশিন-ঘরে গিয়ে লিফ্টের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করেন। তার পরে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে লিফ্ট উপরে তোলেন। ফলে লিফ্টের দরজায় আটকে আঘাত পান অরূপ।
লিফ্টে গোলযোগ ছিল কিনা, তা জানতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হয়েছেন তদন্তকারীরা। বিশেষজ্ঞেরা একটি কমিটি গঠন করেছেন। শীঘ্রই সেই কমিটি লিফ্ট পরিদর্শনে যাবেন। ট্রমা কেয়ারের প্রায় ৮০টি সিসি ক্যামেরার ফুটেজও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
পুলিশি হেফাজত শেষে এ দিন পাঁচ ধৃতকে শিয়ালদহ আদালতের অতিরিক্ত মুখ্য বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট সুলতান মামুদের এজলাসে হাজির করা হয়। ধৃতদের আইনজীবী সপ্তর্ষি ঘোষ, শুভেন্দু সাহারা জামিনের আর্জি জানিয়ে বলেন, ‘‘এটি একটি দুর্ঘটনা।’’ মৃতের পরিবারের আইনজীবী শুভজ্যোতি দত্তের প্রশ্ন, লিফ্টকর্মী লিফ্টে থাকলে তিনি কি অরূপদের দরজায় দাঁড়াতে দিতেন? বিচারক দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জামিন দেন। পুলিশি হেফাজতে পাঠান তিন লিফ্টকর্মীকে।