নিউ টাউনের এই বাড়ি থেকেই ধরা হয় জঙ্গিদের। —নিজস্ব চিত্র।
জাতীয় স্তরের দুষ্কৃতীদের সন্ধান মিলেছিল আগেই। নব্য উপনগরী কি এ বার আন্তর্জাতিক জঙ্গিদেরও ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হয়ে উঠছে?
অতীতে পঞ্জাবের গ্যাংস্টারেরা নিউ টাউনে ঘাঁটি গেড়েছিল। এ বার পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈবার শাখার (মডিউল) অস্তিত্ব মিলেছে সেই নিউ টাউনেই। লস্করের সদস্য সন্দেহে উমর ফারুক এবং রবিউল ইসলাম নামে দুই যুবককে দিল্লি পুলিশ রবিবার গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছে নিউ টাউনের হাতিয়াড়ার মাঝেরপাড়া থেকে। উমর মালদহের বাসিন্দা, রবিউল বাংলাদেশের। এই ঘটনায় ফের প্রশ্ন উঠেছে বিধাননগর কমিশনারেটের নজরদারি নিয়ে।
দিল্লি পুলিশ কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠকে জানিয়েছিল, কলকাতা ও দিল্লির মেট্রো স্টেশন-সহ ১০টি জায়গায় ‘মুক্ত কাশ্মীর’, ‘কাশ্মীরে গণহত্যা বন্ধ করুন’— এই মর্মে পোস্টার পড়েছিল। যা দেখে নড়েচড়ে বসেন গোয়েন্দারা। এর পরেই কলকাতা ও তামিলনাড়ু থেকে ফারুক, রবিউল-সহ আট জনকে ধরা হয়। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছিল, গত ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতা থেকে দিল্লি গিয়েছিল ওই দু’জন। সেখানে সুপ্রিম কোর্ট মেট্রো স্টেশন-সহ কয়েকটি জায়গায় পোস্টার লাগায় তারা।
স্থানীয় বিধাননগর পুরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি সিরাজুল হকের দাবি, যে বাড়ি থেকে দুই অভিযুক্ত গ্রেফতার হয়েছে, সেটির মালিক তাঁকে জানিয়েছেন যে, কেষ্টপুরে একটি পোশাকের কারখানার কর্মী বলে নিজেদের পরিচয় দিয়েছিল অভিযুক্তেরা। কেষ্টপুর থেকে কাছাকাছি হওয়ায় তারা মাঝেরপাড়ায় বাড়ি ভাড়া নিচ্ছে।
উল্লেখ্য, পুলিশ ছাড়পত্র দিলে তবেই বাড়ি ভাড়া দেওয়া যাবে, এমন নির্দেশিকা ইতিমধ্যেই জারি করেছে বিধাননগর কমিশনারেট। এ ক্ষেত্রে ওই বাড়ির মালিক পুলিশের কাছে ভাড়াটে সংক্রান্ত তথ্য জমা দেননি বলেই দাবি ওই পুরপ্রতিনিধির। তিনি জানান, বাড়ির মালিকের গড়িমসির কারণেই উমর ও রবিউল সম্পর্কিত তথ্য পুলিশের কাছে পৌঁছয়নি।
দিল্লি পুলিশ সূত্রের দাবি, ধৃতদের জেরা করে জানা গিয়েছে যে, তাদের বাংলাদেশি যোগ রয়েছে। সেই যোগাযোগের সূত্রেই হাতিয়াড়ায় বাড়ি ভাড়া নেয় তারা। যাঁরা সেই বাড়ি জোগাড় করে দিয়েছেন, তাঁরাও এই চক্রে জড়িত কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে দিল্লি পুলিশ সূত্রের দাবি।
যদিও প্রশ্ন, বাড়িওয়ালা তথ্য না দিলে কি পুলিশের কাছে সন্দেহভাজনদের খবর থাকবে না? অতীতে একাধিক চমকে ওঠার মতো ঘটনা ঘটেছে নিউ টাউনে। সেখানে সাপুরজি আবাসনে প্রকাশ্যে গুলির লড়াই হয়েছে গ্যাংস্টার এবং এসটিএফের মধ্যে। গুলিতে এক এসটিএফ আধিকারিক জখমও হন। এর পরে পটনায় হাসপাতালে ঢুকে গুলি করে খুনের ঘটনায় অভিযুক্তকে সাপুরজি থেকে ধরে ভিন্ রাজ্যের পুলিশ। নিউ টাউনেরই একটি আবাসনে বাংলাদেশের এক সাংসদকে খুন করার পরে দেহ টুকরো টুকরো করে ব্যাগে ভরে নিয়ে গিয়েছিল সে দেশের দুষ্কৃতীরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, জনসংখ্যার নিরিখে নিউ টাউনে পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। সেই সঙ্গে পুলিশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও সক্রিয় করতে হবে। তাঁদের মতে, নিউ টাউনের প্রান্তিক এলাকা, যেমন হাতিয়াড়া, সাপুরজি, হাতিশালার মতো জায়গায় পুলিশি নজরদারির যথেষ্ট অভাব রয়েছে। সেখানে এক দিকে যেমন একাধিক বিলাসবহুল আবাসন রয়েছে, যেখানে আবাসনের নিজস্ব নিরাপত্তা বলয় রয়েছে। আবার এর বিপরীতে, নিউ টাউনের গ্রামীণ এলাকা একেবারেই অরক্ষিত। সেখানে কে, কোথা থেকে এসে বসবাস করছেন, তার হদিস পাওয়া কঠিন। বাসিন্দাদের প্রশ্ন, সাপুরজি আবাসনের ঘটনা জাতীয় স্তরে প্রচার পেয়েছিল। ফলে, সে দিকে পুলিশি প্রহরা থাকবে, এমনটা আন্দাজ করেই জঙ্গিরা হাতিয়াড়ার মাঝেরপাড়ার মতো ঘিঞ্জি এলাকা বেছে নেয়নি তো?
ওই ঘটনা নিয়ে বিধাননগর কমিশনারেট খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে। রাজ্য পুলিশের উপরমহল থেকেও সরাসরি এই ঘটনার তদন্তের উপরে নজর রাখা হচ্ছে।