Rehabilitation Center

নেশামুক্তির ‘মারণ ব্যবসায়’ নজর, চাওয়া হবে পুলিশি রিপোর্ট

নেশামুক্তি কেন্দ্রের চার দেওয়ালের ভিতরে আদতে কী চলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা অজানা থেকে যায়। অভিযোগ, কোনও ঘটনা ঘটলে দিনকয়েকের জন্য আলোচনা হয়, সরকারি দফতরগুলি কিছু দিন নিজেদের মধ্যে দায় ঠেলাঠেলি করে, তার পরে ফের যে কে সে-ই!

নীলোৎপল বিশ্বাস
শেষ আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬ ০৯:৪৩

— প্রতীকী চিত্র।

কখনও ওঠে নেশামুক্তি কেন্দ্রের ভিতরে আবাসিককে পিটিয়ে মেরে ফেলার অভিযোগ। কখনও আবার মৃত্যুর প্রকৃত কারণই সামনে আসে না। অভিযোগ, মৃতের পরিবারকে বলা হয়, নেশার তাড়নায় আবাসিক উত্তেজিত হয়ে পড়ায় তাঁকে শান্ত করার সময়ে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ঘটেছে। অথচ, মরদেহে স্পষ্ট দেখা যায় আঘাতের চিহ্ন, কালশিটে! কিছু ক্ষেত্রে আবার জানানো হয়, পালাতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আবাসিকের মৃত্যু হয়েছে। নয়তো বলা হয়, নেশার তাড়নায় আবাসিক নিজেই নিজেকে শেষ করেছেন!

কিন্তু নেশামুক্তি কেন্দ্রের চার দেওয়ালের ভিতরে আদতে কী চলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা অজানা থেকে যায়। অভিযোগ, কোনও ঘটনা ঘটলে দিনকয়েকের জন্য আলোচনা হয়, সরকারি দফতরগুলি কিছু দিন নিজেদের মধ্যে দায় ঠেলাঠেলি করে, তার পরে ফের যে কে সে-ই! ভুক্তভোগীদের দাবি, পুলিশে মামলা হলেও নেশা ছাড়ানোর নামে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এই ‘মারণ ব্যবসা’ বন্ধ হয় না। রাজ্যে পালাবদলের পরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা নেশামুক্তি কেন্দ্রগুলির উপরে কি এ বার সরকারি নজর পড়বে? রাজ্যের নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ দফতর সূত্রের দাবি, সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হবে। এলাকা ধরে ধরে খতিয়ে দেখে পুলিশকে আলাদা করে এ ব্যাপারে রিপোর্ট দিতে বলা হবে।

এত দিন একটি দোতলা বা তেতলা বাড়ি নিয়ে ঝাঁ-চকচকে অফিসঘর তৈরি করে সেখানে মাদক সচেতনতা সংক্রান্ত পোস্টার বা ছবি টাঙিয়ে দিতে পারলেই খুলে ফেলা যেত নেশামুক্তি কেন্দ্র। ভুক্তভোগীদের দাবি, এক বার চালু করে দিতে পারলেই মৌখিক প্রচারে মাদকাসক্তদের পরিবারের আসা-যাওয়া শুরু হয়ে যায়। কিছু দিন চালাতে পারলেই মিলে যায় অনুদান। স্থানীয় নেতার আশীর্বাদ থাকলে কোনও রকম পুলিশি ঝক্কিও পোহাতে হয় না। এর পরে রোগীর পরিবারের আর্থিক অবস্থা বুঝে টাকা দাবি করতে পারলেই হল! তার পরে কোনও কারণে সমস্যায় পড়লে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৯৬১’-এ অনুমতি নেওয়া রয়েছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু সমাজকল্যাণ দফতর জানাচ্ছে, ‘সোসাইটি অ্যাক্ট, ১৯৬১’-র ভিত্তিতে এমন কেন্দ্র চালানো যায় না। সমাজকল্যাণ দফতরও এমন নেশামুক্তি কেন্দ্র চালানোর অনুমতি দেয় না। কিন্তু এর মধ্যে নেশাগ্রস্তদের সঙ্গেই মানসিক সমস্যায় ভোগা রোগীদেরও একসঙ্গে রেখে চলে ব্যবসা। সরকারি আধিকারিকেরা জানাচ্ছেন, মানসিক সমস্যায় ভোগা রোগীদের রেখে চিকিৎসা করাতেও প্রয়োজন পড়ে স্বাস্থ্য দফতরের মেন্টাল হেল্থ‌ চিকিৎসা করানোর লাইসেন্সের। সে ক্ষেত্রে নেশাগ্রস্তদের আলাদা রাখা বাধ্যতামূলক। ১৪ ফুট লম্বা, ১২ ফুট চওড়া ঘরে সর্বাধিক তিন জনকে রাখার নিয়ম রয়েছে। ভবনের জন্য প্রয়োজন হয় দমকলের ছাড়পত্র, ফুড লাইসেন্স। সর্বক্ষণের জন্য এক জন চিকিৎসক, দু’জন নার্স রাখা বাধ্যতামূলক। থাকতে হবে সিসি ক্যামেরার নজরদারিও। কিন্তু বাস্তবে এর কিছুই থাকে না।

দিনকয়েক আগেই মেয়ের পছন্দের পাত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে আটকাতে তাঁকে জোর করে নেশামুক্তি কেন্দ্রে পাঠিয়েছিলেন মা। আদালতের নির্দেশে তিনি মুক্তি পান। নেশামুক্তি কেন্দ্রে কয়েক দিন কাটানোর সেই অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তরুণী পুলিশকে লিখেছিলেন, ‘১০ ফুট বাই ১২ ফুটের ঘরে আট জন মেয়েকে রাখা হয়েছিল। নেশাগ্রস্ত এবং মানসিক সমস্যায় ভোগা রোগীদের মধ্যে কোনও পার্থক্য ছিল না। ঘরটিতে কোনও জানলা ছিল না। শুধু খাবার দেওয়ার জন্য জানলার মতো একটি ব্যবস্থা ছিল। পোশাক খুলিয়ে গায়ে হাত দিয়ে পরীক্ষা করা হত। দু’দিনের সেই অন্ধকার জীবন এখনও চোখে ভাসে। ভাবি, চিকিৎসার নামে এই নরক-যন্ত্রণার মধ্যে যাঁদের ফেলে দেওয়া হয়, তাঁদের মুক্তির পথ কী?’

মুক্তির পথ কি এ বার মিলবে? প্রশ্ন ঘুরছে।

আরও পড়ুন