সুপ্রিম কোর্টে পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর মামলার শুনানি। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
সুপ্রিম কোর্ট থেকে বেরিয়ে তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘আজ সুপ্রিম কোর্টে ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটল। মুখ নির্বাচন কমিশনার এত দিন ভাবতেন তিনিই সব, আজ তা শেষ। এত দিন ইআরওরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেও বিশেষ পর্যবেক্ষকেরা আটকে দিচ্ছিলেন। সন্দেহের কথা বলে সাড়ে সাত লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আদালত বলল, এই ধরনের যত কেস আছে, সেগুলি নিষ্পত্তির জন্য হাই কোর্ট বিচারবিভাগীয় অফিসার নিয়োগ করবে। অসঙ্গতির দাবি ঠিক কি বেঠিক, তা তাঁরাই স্থির করবেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ওই আধিকারিকেরা। ভারতের সংবিধানে মানুষের অধিকার সবচেয়ে বড়, জানিয়েছে আদালত। ডিজিপিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখতে বলা হয়েছে। রাজ্যকে সব রকম সহযোগিতা করতে বলেছে।’’ মার্চের প্রথম সপ্তাহে আবার এই মামলার শুনানি হবে।
এসআইআরকে কেন্দ্র করে রাজ্যে ছোটখাটো যে সমস্ত হিংসার ঘটনা ঘটেছে, তা নিয়ে স্টেটাস রিপোর্ট তলব করেছে সুপ্রিম কোর্ট।
২৮ তারিখের মধ্যেই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে হবে, জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রয়োজনে পরে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করে নাম যোগ করা যেতে পারে। আপাতত যা হয়েছে, তা-ই প্রকাশ করতে হবে। রাজ্যের আইনজীবী এই নির্দেশ না-দেওয়ার অনুরোধ করেন। জানান, এতে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। কিন্তু আদালত আপত্তি শোনেনি। জানিয়েছে, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের এই কাজে বেশি দিন নিযুক্ত রাখা যাবে না।
নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে সমস্ত নাম পাওয়া যাবে, তা দিয়েই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন। প্রয়োজনে পরে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করে নাম যোগ করা যেতে পারে। আদালতে কমিশন এমনটাই জানিয়েছে।
হাই কোর্ট এসআইআরের কাজে আধিকারিক নিয়োগ করলে আদালতের কাজে তা প্রভাব ফেলতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, সে ক্ষেত্রে অন্য আদালতে কিছু মামলা সরিয়ে দিতে পারে হাই কোর্ট। রাজ্য সরকারকে এসআইআরের কাজ সময়ে শেষ করার জন্য পূর্ণ সহযোগিতা করতে বলেছে শীর্ষ আদালত।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা ব্যতিক্রমী বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি। এতে আদালতের স্বাভাবিক কাজেও সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে। আদালত জানিয়েছে, রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং সংশ্লিষ্ট জেলাশাসক আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার জন্য বিশেষ দায়িত্বে থাকবেন। যে সমস্ত বিচারবিভাগীয় আধিকারিক নিয়োগ করা হবে, তাঁদের দেওয়া নির্দেশই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বলে গণ্য হবে। রাজ্যকে অবিলম্বে তা পালন করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, শনিবার কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠক হবে কমিশনের প্রতিনিধি, সিইও, মুখ্যসচিব, ডিজিপি, অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এবং অ্যাডভোকেট জেনারেলের। কী ভাবে এসআইআর সংক্রান্ত অচলাবস্থা কাটানো যায় এবং দ্রুত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়, তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হবে।
এসআইআর সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে প্রধান বিচারপতি জানান, কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করা হবে যাতে প্রত্যেক জেলায় কয়েক জন বর্তমান বিচারিক অফিসার এবং অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত জেলা বিচারক নিয়োগ করা হয়। তথ্যগত অসঙ্গতির নথি যাচাই করবেন তাঁরা। কমিশন ও রাজ্যের নিযুক্ত কর্মীরা তাঁদের সাহায্য করবেন।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘‘দুর্ভাগ্যজনক একটা দোষারোপের খেলা চলছে। দু’টি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান একে অপরকে দোষ দিচ্ছে। কমিশন আর রাজ্যের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে।’’
রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় না রাখতে পারলে রাজ্য পুলিশের ডিজির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হতে পারে বলে জানাল আদালত। ডিজির আইনজীবী জানান, কমিশন মিথ্যা কথা বলছে। পুলিশ-প্রশাসনের বিরুদ্ধে কেন পদক্ষেপ করা যাচ্ছে না? কমিশকে প্রশ্ন করেন প্রধান বিচারপতি। কমিশন জানায়, আদালতে মামলাটি বিচারাধীন থাকায় এ নিয়ে তারা দ্বিধাগ্রস্ত। এসআইআরের কাজ করানোর জন্য রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী আনার পরামর্শ দেয় কমিশন।
কমিশনের আইনজীবী জানান, পশ্চিমবঙ্গে কমিশনের বিরুদ্ধে প্ররোচনামূলক ভাষণ দেওয়া হচ্ছে। কমিশনের বিরুদ্ধে জনগণকে ওস্কানো হচ্ছে।
প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, এসআইআরের কাজের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার উপযুক্ত আধিকারিক দিচ্ছে না। এতে জনগণ সমস্যায় পড়বেন।
বিচারপতি বাগচীর পর্যবেক্ষণ, কমিশন এবং রাজ্য উভয় তরফেই দ্বিধা রয়েছে। তাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিচারবিভাগীয় আধিকারিক নিয়োগ করে এসআইআরের কাজ করানোর বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সহমত বিচারপতি বাগচী।
প্রধান বিচারপতি জানান, এসআইআরের কাজ সম্পূর্ণ না হলে গুরুতর সমস্যা হবে। তা কমিশন এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার উভয়ের বোঝা উচিত। তাঁর কথায়, ‘‘এই রাজ্যে এসআইআর শেষ করতে হয় বিচারবিভাগীয় আধিকারিক বা প্রাক্তন বিচারপতিদের আনতে হবে, অথবা অন্য রাজ্য থেকে আইএএস অফিসারদের নিয়োগ করতে হবে।’’ রাজ্যের আইনজীবী জানান, বিচারবিভাগীয় আধিকারিক আনা হলে রাজ্যের তাতে কোনও আপত্তি নেই।
কমিশনকে নিজেদের কর্মী নিয়োগ করতে বলেছেন প্রধান বিচারপতি। কিন্তু বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী জানান, সে ক্ষেত্রে বাংলা নামের বানান বোঝা নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা মিটে যাবে।
খসড়া তালিকা নিয়ে অভিযোগ বা কোনও দাবি জানানোর জন্য আরও সময় দিতে বললেন রাজ্যের আইনজীবী। ৪৮ ঘণ্টা বাড়তি সময় চেয়েছেন তিনি।
মমতার আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান বলেন, ‘‘কমিশন বিশেষ পর্যেবক্ষক নামের এক নতুন ধরনের অফিসার নিয়োগ করেছেন। তাঁরা ইআরওদের কাজে হস্তক্ষেপ করছেন। ইআরওদের সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিচ্ছেন। তাঁরাই ফাইল যাচাই করে ইআরওদের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এ বার ইআরওরা কী করবেন?’’ জবাবে কমিশন জানায়, এসআইআরের প্রথম পর্ব থেকেই বিশেষ পর্যেবক্ষকেরা রয়েছেন।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ সরকার এসআইআর নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেখানে বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’’
কমিশন এসআইআরের কাজের জন্য নিজেদের আধিকারিক নিয়ে আসতে পারবে, জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি কান্ত। রাজ্যের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘আমরা দুটো পরিস্থিতি বুঝতে পারছি। হয় আপনাদের পর্যাপ্ত সংখ্যক গ্রুপ-বি কর্মী নেই, যা একটা আইনি বাধ্যবাধকতা। নয়তো আপনারা তাঁদের ছাড়তে পারছেন না। সে ক্ষেত্রে ইআরও বা এইআরও-র কাজের জন্য কমিশন কর্মী আনতে পারবে।’’
কমিশন জানায়, এসআইআরের কাজে সাহায্যের জন্য আরও গ্রুপ-বি কর্মী চেয়ে রাজ্যকে চিঠি দিয়েছিল তারা। কিন্তু জবাবে সরকার জানিয়েছে, কমিশনের আবেদন ‘বিবেচনাধীন’। এর পরেই রাজ্যের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করে শীর্ষ আদালত।