—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
অন্ধকার গ্রামের ঠিক মাঝখানটায় হালকা বাল্বের ঘোলাটে আলো জ্বালিয়ে এক মনে চায়ের কেটলিতে চামচ দিয়ে ঠকঠক করে চিনি গুলছিলেন দোকানি। সামনের ফাঁকা জায়গায় এলোমেলো একাধিক জটলা। একটা জটলা থেকে ছিটক আসে কথাটা— “বিজেপি করব না তো কী করব? বসে বসে মার খাব? জেল খাটব?” তার পরেই গলাটা একটু চড়ে— “সিপিএম করতাম বলে আমার নামে আট খানা মিথ্যে কেস দিয়েছিল তৃণমূল। পুলিশ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। সে দিন কাউকে পাই নি। একাই লড়তে হয়েছিল।”
বক্তা আসলাম শেখ বর্তমানে পাঁচপোতা গ্রামের ১২ নম্বর বুথের বিজেপি সভাপতি। এই গ্রাম এক সময়ে সিপিএমের গড় ছিল, এখন তৃণমূলের। কেউ কেউ এখনও কাস্তে-হাতুড়িতেই আছেন। আসলাম পরিসংখ্যান দেন— তাঁর বুথে ১০৯৫ জন ভোটার ছিল। তার মধ্যে হিন্দু ভোটার মাত্র ১২০ জন। কিন্তু গত বিধানসভা ভোটে এই বুথে বিজেপি ২৬৪ ভোট পায়। পাশের বুথেও একই অবস্থা। সেখানে ভোটার ছিল ১০৫০। তার মধ্যে হিন্দু ভোটার মাত্র ২৫ জন। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ১২৫ ভোট। হালকা হেসে আসলাম বলেন, “তা হলে বাকি ভোট কারা দিল?”
রানাঘাট উত্তর পশ্চিম কেন্দ্রে পুরোপুরি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বুথ মাত্র পাঁচটি। ভোটারদের প্রায় ৯৫ শতাংশই হিন্দু। সেই অনুপাতে মতুয়া কম, ২৫ শতাংশের মতো। তবে বিরাট সংখ্যক হিন্দু পরিবার এসেছে ও-পার বাংলা থেকে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আড়াই শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে বামেদের ভোট প্রায় পাঁচ শতাংশ হয়েছে। তৃণমূল নেতারা বলছেন, “এ ভাবে রামের ভোট বামে ফিরলেই কেল্লা ফতে!” তৃণমূল তাই চেয়ে রয়েছে সিপিএমের দিকে। আইনজীবী দেবাশিস চক্রবর্তীকে সামনে রেখে হারানো ভোট ফিরিয়ে আনার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে সিপিএম। কিন্তু সেটা কি আদৌ সম্ভব?
গোটা রাজ্যে একমাত্র তাহেরপুর পুরসভা সিপিএমের দখলে রয়েছে। সেই তাহেরপুর থানার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে এক সিপিএম সমর্থক বলছেন, “পুরসভা ভোটে হাত কেটে দিলেও সিপিএমকেই ভোট দেব। কিন্তু বিধানসভায় বিজেপি। তৃণমূলকে হটানোর পর বিজেপিকে দেখে নেব।” এ সব দেখে বিজেপি প্রার্থী পার্থসারধী চট্টোপাধ্যায়ের দাবি, “সিপিএমের লোকেরা আমাদেরই ভোট দেবেন। আমি এ বার জয়ের হ্যাটট্রিক করব।”
তবে শুধু ধর্মীয় সমীকরণ বা ভোট শতাংশের হিসেবই নয়। এ বারের লড়াই দুই দক্ষ সংগঠকের মল্লযুদ্ধও বলা চলে। দলবদলের আগে পর্যন্ত পার্থসারথী তৃণমূল নিয়ন্ত্রিত রানাঘাট পুরসভার টানা ২০ বছরের পুরপ্রধান ছিলেন। নিজের এলাকা হাতের তালুর মতো চেনা। গত বিধানসভা ভোটে তিনি বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা শংকর সিংহকে হারান। সে বার অবশ্য তৃণমূলের শংকর-বিরোধী তাপস ঘোষের লোকেরাই তাঁর ‘বন্ধু’ হয়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে। তাপস অবশ্য তা অস্বীকার করেন এবং তিনিই এ বারের তৃণমূল প্রার্থী। তৃণমূলের অন্দরের খবর, গত বারের ভূত এ বার তাঁর পিছু ধাওয়া করছে। বীরনগর বাজারে দাঁড়িয়ে শংকর-ঘনিষ্ঠ এক নেতা বলছেন, “আমাদের মেয়ের বিয়েতে তাপস মাংসে নুন ঢেলেছিল। এ বার তাপসের মেয়ের বিয়ে!”
তাপস অবশ্য দাবি করছেন, “আমি কখনও কারও ক্ষতি করার চেষ্টা করিনি। আমি প্রার্থী হওয়ায় এত দিন নানা কারণে বসে থাকা বিরাট সংখ্যক নেতাকর্মী ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। জয় নিশ্চিত।” ২০০৩ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত টানা ২০ বছর তৃণমূলের ব্লক সভাপতি ছিলেন তাপস, টানা ২০ বছর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতিও ছিলেন। দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ বদলের জেরে ২০২৩ সালে তাঁকে সাংগঠনিক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তাঁকে ফের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক, পরে রানাঘাট উত্তর-পশ্চিম ও রানাঘাট দক্ষিণ কেন্দ্রের কো-অর্ডিনেটর করা হয়। তার পরেই বিধানসভার টিকিট।
রানাঘাট শহর যে কেন্দ্রের অন্যতম বড় অংশ, সেখানে এ বার প্রায় ৩৬ হাজার নাম বাদ গিয়েছে, যার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ তাঁদের ভোটার বলে স্বীকার করছেন বিজেপি নেতারাই। ভোটের ফলে এর একটা প্রভাব ফলাফলে পড়বে বলেও দাবি তৃণমূলের।
এই মহারণে জাহাজডুবি হয় না কি ডুবোজাহাজ ভেসে ওঠে, তা জানে শুধু জনতা জনার্দন!