West Bengal SIR Hearing

শুনানিকেন্দ্রে ৯৪ বছরের বৃদ্ধা পেলেন ডাক! ৮০ বছরের অসুস্থকে আনতে হল স্ট্রেচারে, কমিশনের নির্দেশিকা নিয়ে প্রশ্ন

কল্যাণী থেকে করিমপুর পর্যন্ত বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে অসুস্থ ও বয়স্কদের এসআইআর শুনানি সংক্রান্ত হয়রানি চরমে পৌঁছেছে। চাপড়ার পাশাপাশি তেহট্ট ও করিমপুরের একাধিক অসুস্থ ভোটারকে শুনানিকেন্দ্রে দেখা গিয়েছে শুক্রবারও।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ২৩:৪৪

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশিকা ছিল, ৮৫-ঊর্ধ্ব প্রবীণ এবং অসুস্থদের শুনানির জন্য সশরীরে হাজিরা দিতে হবে না। তাঁদের প্রয়োজনে বাড়িতে গিয়ে নথি যাচাই করবেন বুথ স্তরের আধিকারিকেরা (বিএলও)। ওই বয়সি কোনও ভোটারকে শুনানিকেন্দ্রে দেখা গেলেই পদক্ষেপ করবে কমিশন। শাস্তি পেতে হবে সংশ্লিষ্ট বিএলও-দের। কিন্তু সেই নির্দেশিকা যে কার্যকর হয়নি, তার উদাহরণ দেখা গেল শুক্রবার নদিয়ার চাপড়ায়। কোথাও ৯৪ বছরের বৃদ্ধাকে হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় শুনানিকেন্দ্রে আসতে হল আত্মীয়ের কোলে চেপে, আবার কোথাও ৮০ বছরের অসুস্থ বৃদ্ধাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে নিয়ে আসা হল।

Advertisement

নদিয়ার চাপড়া বিধানসভার শিকারা কলোনি পাড়ার ৯৩ নম্বর বুথের (পার্ট নম্বর ৫৩) বাসিন্দা ৯৪ বছরের ফাতেমা খান। বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় জর্জরিত এই বৃদ্ধার বাড়িতে কমিশনের কোনও প্রতিনিধি যাননি বলে অভিযোগ। ফলে বাধ্য হয়েই পরিজনদের কাঁধে ভর দিয়ে তাঁকে পৌঁছোতে হয় শুনানিকেন্দ্রে। একই বুথের ৮০ বছরের হাসেনা বিবির অবস্থা আরও করুণ। গুরুতর অসুস্থ হাসেনাকে এ দিন স্ট্রেচারে শুইয়ে শুনানিকেন্দ্রে নিয়ে আসেন তাঁর আত্মীয়েরা। ওই একটি বুথেই মোট ৩০ জনকে নোটিস পাঠানো হয়েছে! যার মধ্যে ১২ জনের বয়স ৮০ বছরের বেশি এবং ন’জন ৮৫ বছর পার করেছেন। কমিশনের ‘বাড়ি বাড়ি পরিষেবা’র প্রতিশ্রুতি তাঁদের কাছে প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয় বলে তৃণমূলের অভিযোগ।

কল্যাণী থেকে করিমপুর পর্যন্ত বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে অসুস্থ ও বয়স্কদের এসআইআর শুনানি সংক্রান্ত হয়রানি চরমে পৌঁছেছে। চাপড়ার পাশাপাশি তেহট্ট ও করিমপুরের একাধিক অসুস্থ ভোটারকে শুনানিকেন্দ্রে দেখা গিয়েছে শুক্রবারও। কমিশনের নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও— প্রতিটি ঘটনাই প্রশাসনের অমানবিকতাকে প্রকট করছে। রানাঘাটের বিশেষ ভাবে সক্ষম সুমন তরফদারকে কোলে করে নিয়ে আসতে হয়েছে তাঁর মাকে। আবার শান্তিপুর এলাকার বিশেষ ভাবে সক্ষম এক যুবককে আসতে হয়েছে পড়শীদের সহযোগিতায়। শ্বাসকষ্টের রোগী শুনানিকেন্দ্রে এসে অসুস্থ হয়ে পড়ায়, এক বৃদ্ধাকে সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে। আবার কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ।

কমিশনের নির্দেশিকা উপেক্ষা করে প্রবীণদের এই হয়রানি নিয়ে রাজনৈতিক পারদও চড়ছে। তৃণমূলের কৃষ্ণনগর সাংগঠনিক জেলার চেয়ারম্যান রূকবানুর রহমান বলেন, “প্রায় ১০০ বছরের বয়স্ক বৃদ্ধাকে আজকে শুনানিকেন্দ্রে আসতে হয়েছে। ১৯৫৬ সালের ভোটের তালিকায় ওঁর নাম আছে। নির্বাচন কমিশনের পরিবারের কারও আছে কি না সন্দেহ। যে ভাবে অমানবিক এবং অপরিকল্পিত পরিকল্পনা নিয়ে শুনানি চলছে, তাতে হয়রানি আরও বাড়বে।”

শুনানিকেন্দ্রের পরিকাঠামো এবং কমিশনের উদাসীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাম নেতৃত্ব। সিপিআইএম নেতা এসএম সাদি বলেন, “নির্বাচন কমিশন ‘ঢাল নেই, তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দার’। পর্যাপ্ত কর্মী ও পরিকাঠামো ছাড়া এত বড় প্রক্রিয়া শুরু করাই ঠিক হয়নি।” যদিও বিজেপির সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অর্জুন বিশ্বাস দাবি করেন, “কোনও ত্রুটি থাকলে তা দেখার দায়িত্ব কমিশনেরই। নিশ্চয়ই ঠিক হবে।”

কমিশন সোমবার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছিল, যাঁরা ৮৫ বয়সের ঊর্ধ্বে, বিএলও-রা তাঁদের ফোন করে আশ্বস্ত করবেন যে, কেন্দ্রে আসার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাস্তবের চিত্র বলছে, হয় সেই ফোন পৌঁছোয়নি, নয়তো বিএলও-রা নথিপত্র নিয়ে প্রবীণদের দুয়ারে পৌঁছোনোর সদিচ্ছা দেখাননি। ফলে ভোটার তালিকায় নাম টিকিয়ে রাখার এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে বয়স্কদের। কেন বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের নিয়ে এই টানাহ্যাঁচড়া, তার কোনও সদুত্তর মেলেনি কমিশন থেকে।

Advertisement
আরও পড়ুন