উজ্জ্বল বিশ্বাস। নিজস্ব চিত্র ।
বস্তুত সংখ্যালঘু ভোট ধরে রাখতে না পারাতেই কৃষ্ণনগর দক্ষিণ কেন্দ্রে ভরাডুবি হয়েছে বলে তৃণমূলের প্রাথমিক সমীক্ষায় উঠে আসছে। শুধু তা-ই নয়, সংখ্যালঘু ভোটের একটা অংশ বিজেপির বাক্সে চলে গিয়ে থাকতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে হিন্দু ভোট বেশি করে বিজেপি-কেন্দ্রিক হওয়ায় তাদের বিজেপির জয়ের রাস্তা সম্ভবত মসৃণ হয়েছে। তবে দলেরই একটা অংশের অন্তর্ঘাত নদিয়া জেলার একমাত্র মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাসের পরাজয় নিশ্চিত করেছে বলে মনে করছে তাঁর
ঘনিষ্ঠ বৃত্ত।
দেখা যাচ্ছে, বিগত কয়েকটি নির্বাচনে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কিছু এলাকায় তৃণমূলের ভোট কমার পাশাপাশি ভোট বেড়েছে বিজেপির। এ বারের বুথভিত্তিক ফল বলছে, কৃষ্ণনগর ২ ব্লকের যে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় বিপুল ভোটে এগিয়ে থাকার সুবাদে উজ্জ্বল এত দিন বিধায়ক হয়েছেন, সেই সমস্ত অঞ্চলের বড় অংশের ভোটার তৃণমূলের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এমনকী যে সমস্ত ‘দাপুটে’ সংখ্যালঘু নেতা তাঁকে নির্বাচনী বৈতরণী পার করানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন তাঁদের বুথেও বড় সংখ্যক সংখ্যালঘু ভোট গিয়েছে বিজেপির বাক্সে।
কৃষ্ণনগর ১ ব্লকের পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েত ও কৃষ্ণনগর ২ ব্লকের সাতটি পঞ্চায়েত নিয়ে কৃষ্ণনগর দক্ষিণ কেন্দ্র। এর মধ্যে সংখ্যালঘু-প্রধান নওপাড়া ১ ও ২ পঞ্চায়েতের পাশাপাশি বেলপুকুর ও সাধনপাড়া ১ গ্রাম পঞ্চায়েতে বিপুল ‘লিড’ পেত তৃণমূল। বাকি এলাকায়, বিশেষত কৃষ্ণনগর ১ ব্লকের পাঁচ পঞ্চায়েতে পিছিয়ে গেলেও অপর ব্লকের সংখ্যালঘু প্রধান চারটি পঞ্চায়েতের ‘লিড’ তাকে ছাপিয়ে যেত। এ বার সেখানেই বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে বিজেপি। প্রায় ৬০ শতাংশ মুসলিম ভোটারের নওপাড়া ১ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় যেখানে গত বিধানসভা নির্বাচনে প্রায় চার হাজার ‘লিড’ ছিল তৃণমূলের, সেখানে তা প্রায় আড়াই হাজারে নেমেছে। প্রায় ৮০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটারের নওপাড়া ২ পঞ্চায়েতে প্রায় ছয় হাজারের ‘লিড’ও হাজারখানেক কমেছে।
ও দিকে, বেলপুকুর পঞ্চায়েতে শোনডাঙার আটটি সংখ্যালঘু বুথ ছাড়া বাকি প্রায় কোথাও ভোট ধরে রাখতে পারেনি তৃণমূল। গত বার যেখানে এই পঞ্চায়েতে প্রায় পাঁচ হাজারের ‘লিড’ ছিল, এ বার তা ৯৮২-তে নেমেছে। একই অবস্থা সাধনপাড়া ১ ও ২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাতেও। যেমন সাধনপাড়া ১ গ্রাম পঞ্চায়তের একশো শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত রুকুনপুর গ্রামের ১ নম্বর বুথে বিজেপি ২৩৩টি ভোট পেয়েছে। উল্টো দিকে, হিন্দুপ্রধান ধুবুলিয়া ১ ও ২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে বিজেপি।
কৃষ্ণনগর ২ ব্লক তৃণমূল সূত্রের খবর, গত বিধানসভা ভোটে তারা কৃষ্ণনগর ২ ব্লক থেকে প্রায় ১৮ হাজার ‘লিড’ পেয়েছিল। এ বার সেখানে প্রায় পাঁচশো ভোটে পিছিয়ে তৃণমূল। উল্টো দিকে, কৃষ্ণনগর ১ ব্লকের পাঁচটি পঞ্চায়েতে গত বার প্রায় সাত হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি, এ বার প্রায় ২৭ হাজার ভোটে এগিয়ে গিয়েছে। তৃণমূলের কৃষ্ণনগর ১ ব্লক সভাপতি স্বপন ঘোষ বলেন, “সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হওয়ার কারণেই এই ফল। তবে এসআইআর-ও অনেকটা দায়ী।” তৃণমূলের কৃষ্ণনগর ২ ব্লক সভাপতি সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় মতেও, “কোনও কারণে সংখ্যালঘু মানুষ আমাদের উপরে ভরসা হারিয়েছেন বলেই এই অবস্থা।” বিজেপির কৃষ্ণনগর দক্ষিণ কেন্দ্রের যুগ্ম আহ্বায়ক সুধীর বিশ্বাসের মতে, “সব সম্প্রদায়ের মানুষ ভোট দিয়েছেন বলেই তো এই বিপুল জয়।”