আলিপুরদুয়ারের সভায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত।
অভিষেক: এক জন আছেন দেখলাম, বিয়ের জন্য টাকা পাননি অভিযোগ করেছেন। মিক নাগাসিয়া আপনার নাম। কোথায় আবেদন করেছিলেন? ডিএম অফিস? বিয়ে হয়ে গিয়েছে আপনার?
জবাব আসে হ্যাঁ। অভিষেক বলেন, ‘‘ওই আবেদনপত্র আমাকে পাঠান। আমি ব্যবস্থা করছি।’’
আলিপুরদুয়ারের সুরেশ তুড়ি বলেছিলেন, ‘‘আমি ১৯৯৫ সাল থেকে মধু চা বাগানে কাজ করছি। কিন্তু এখনও জমির পাট্টা (স্বত্ব দলিল) পাইনি। কোম্পানির মালিক পুরনো বাড়ি মেরামত করেন না। জমির পাট্টাও দেন না। আমরা কোম্পানির এনওসি পাইনি, জমির পাট্টাও পাইনি, আমাদের উপযুক্ত বাসস্থানও দেওয়া হচ্ছে না।’’ অভিষেকের জবাব: জমির পাট্টা সংবেদনশীল বিষয়। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন যে সরকার যত বেশি সম্ভব মানুষকে পাট্টা দেবে। সিপিএম সরকারের আমলে একটি দেওয়াল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করাও খুব কঠিন ছিল। একাধিক এনওসি প্রয়োজন হত। এখন অনেক জায়গায় একাধিক এনওসি এবং ব্যক্তিগত ছাড়পত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত জমি সংক্রান্ত মামলায় কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু যদি আপনি এত দিন অপেক্ষা করে থাকেন, তা হলে দয়া করে আরও একটু ধৈর্য ধরুন। সরকার যদি আপনাকে আশ্বাস দিয়ে থাকে, তা হলে আপনি অবশ্যই পাট্টা পাবেন। আমাদের ট্রেড ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রতিটি প্রকৃত সমস্যা সমাধানের জন্য উত্থাপন করা হবে। আমাদের দায়িত্ব হলো শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানো এবং যাদের সহায়তার প্রয়োজন তাদের সাহায্য করা।
চা-শ্রমিকদের কাছ থেকে অভিযোগ শুনলেন অভিষেক। তাঁদের স্বাস্থ্য পরিষেবার সমস্যা শোনেন। ‘বঞ্চিত’ চা-শ্রমিক এবং তাঁদের পরিবারগুলিকে যথাযথ পরিষেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি অভিষেকের। অভিষেক বলেন, ‘‘একটা কথা মাথায় রাখুন, ২০১১ সালে আমাদের সরকার তৈরি হওয়ার পরে ৬৭ টাকা ছিল চা-শ্রমিকের দৈনিক পারিশ্রমিক। গত ১৪ বছরে বেড়ে ১৫০ টাকা হয়েছে। গত বছর যখন এসেছিলাম, ২৫০ টাকা হয়েছে। কিন্তু আমি জানি, এই টাকায় সংসার চলে না। যে ভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে, তাতে আড়াইশো টাকা যথেষ্ট নয়। আমি কথা দিচ্ছি, চতুর্থ বার দিদির সরকার হলে আমার প্রথম দৃষ্টি থাকবে আলিপুরদুয়ার। বৈঠক করব এখানে। ৩০০ টাকা দৈনিক পারিশ্রমিক হবে, এটা সুনিশ্চিত করব। কিন্তু তার আগে যারা আমাদের পানীয় জল দিতে পারে না, তাদের সবক শেখাতে হবে আপনাদের।’’
একে একে অনেকের সমস্যার কথা শোনেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। চা-শ্রমিকদের সমস্যার কথা, এসআইআর নিয়ে অনুসন্ধান, পাট্টা নিয়ে জিজ্ঞাসা— সব কিছু শুনে সমাধান জানান অভিষেক। কোনও কোনও সমস্যার কথা শুনে বলেন, ‘‘আর একটু সবুর করুন। সরকার বলেছে যখন করবেই।’’
শুধু বলে চলে যাওয়া নয়, পাল্টা জনতার কথা শুনতে চাইলেন নেতা। এমনই উদ্যোগ নিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সভা থেকে অনেকে লিখিত ভাবে সমস্যা, অভিযোগের কথা জানিয়েছেন। কাগজ পড়ে পড়ে তা সমাধানের চেষ্টা করেন অভিষেক। তিনি বলেন, ‘‘একতরফা বলে চলে যাব না। আপনারা প্রশ্ন করুন। আমি সীমিত সময়ের মধ্যে সমাধানের চেষ্টা করব।’’
‘‘এ বার আলিপুরদুয়ারকে কথা দিতে হবে। এ বার সাড়ে চারশো বুথেই তৃণমূলকে জেতাতে হবে। তবেই বিজেপিকে শিক্ষা দিতে পারবেন। একটা বুথও ছাড়লে চলবে না। আপনি যদি প্রতিঘাত না করেন... এখনই আপনার ভোটাধিকার কাড়তে চাইছে। বাংলায় লক্ষ্মীর ভান্ডার বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। এখানেই ওদের নেত্রী এই কাজ করেছিলেন। তাঁকে এখনও শাস্তি দেয়নি ওরা।’’
‘‘এ বার জয়ে আলিপুরদুয়ারকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। পাঁচে পাঁচ করতে হবে। আলিপুরদুয়ারের প্রতিদানের সময় এ বার। ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে বিজেপিকে আনম্যাপ করে দিন।’’
‘‘যারা পানীয় জল দিতে পারে না, তারা মাথার ছাদ দেবে আপনাদের?’’ মধ্যপ্রদেশে ‘বিষাক্ত’ পানীয় জল পান করে মৃত্যু নিয়ে বিজেপিশাসিত সরকারকে নিশানা অভিষেকের।
অভিষেক: এখন এ রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল যারা, তারা চিকেন রোল বিক্রি করলে মারধর করেন! চিকেন প্যাটিস বিক্রি করলে মারধর করা হয়। কোথায় মারছে? যেখানে গীতাপাঠ হয়। আমি হিন্দু। এই ধর্ম কাউকে আক্রমণ করতে শেখায় না। মানবতার চেয়ে বড় কোনও ধর্ম কি হতে পারে! আপনারা ভাবুন, এরা সরকারে এলে কী করতে পারে! কে কী খাবেন, পরবেন, যাবেন, সব এরা ঠিক করবে। এটা গণতন্ত্র?
অভিষেক বলেন, ‘‘ধরুন, দুটো মডেল। তৃণমূল এবং বিজেপি। তৃণমূলের মডেল হল, যদি আপনারা না-ও জেতান, তাদের যা কাজ করে যাবে। উন্নয়ন থমকে থাকবে না। কিন্তু বিজেপি? উন্নয়ন থামিয়ে দেবে। ওঁরা আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প নিয়ে অভিযোগ করে থাকেন। বলেন, পশ্চিমবঙ্গে এই পরিষেবা দিতে দেওয়া হয় না। শুনুন, বাড়িতে একটা রঙিন টিভি থাকলে ওই প্রকল্পের সুবিধা মেলে না। স্বাস্থ্যসাথীতে এই সবের দরকার হয় না। স্বাস্থ্যসাথীতে রাজ্যের ১ কোটি মানুষ সুবিধা পাবেন। ’’
অভিষেক: আমরা দিল্লির নির্বাচন কমিশনের অফিসে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম, তথ্য দিন। সকলে জানুক সমস্ত তথ্য। জ্ঞানেশ কুমার কে জানেন? জাদুকর। উনি জ্যান্ত মানুষকে মেরে দিতে পারেন। মরা মানুষকে হাঁটাতে পারেন। উনি ভ্যানিশ কুমার। এ বার আপনারা ম্যাজিক করে বিজেপিকে হটিয়ে দিন।
অভিষেক: বিজেপির সাংসদ এবং সাপ একই জিনিস। বাড়ির পিছনে একটা-দুটো সাপ ছেড়ে দিন। সাপ সাপই থাকে। আপনার দুধ-কলা খেয়ে আপনাকেই ছোবল মারবে। তাই এ বার সাপ পুষবেন না। তৃণমূলকে সুযোগ দিন। যদি আপনাদের জন্য কাজ করতে না পারি, পরের বারই সরিয়ে দেবেন।
উত্তরবঙ্গে বন্যার সময়ে বিজেপির কে এসেছিলেন? দিদি এসেছিলেন। বাড়ি করেছেন, সেতু করেছেন। এ বার ভোট আসছে। আবার বিজেপির নেতারা আসবেন। যখন কোনও ভোট ছিল না, তখনও মালবাজারে এসেছে। ২০২২ সালে তো ভোট ছিল না। আমরা এসেছিলাম, কারণ রাজনীতি শুধু ভোটের সময়ের জন্য নয়। জনসেবা করতে এসেছেন যখন ২৪ ঘণ্টা থাকতে হবে।
এসআইআরের সঙ্গে নোটবন্দির তুলনা করেন অভিষেক। তিনি বলেন, ‘‘এই মোদী সরকার নতুন স্বপ্ন দেখিয়ে ১০ বছর আগে সকলকে লাইনে দাঁড় করিয়েছিল। দেখা গেল কালোধন আরও বেড়ে গেল। ১০ বছর পর আবার মানুষকে লাইনে দাঁড় করালেন। আগে জনতা সরকার গড়ত। এখন সরকার ঠিক করছে ভোটার কে হবেন।
অভিষেক: আমি যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, সব পূরণ করব। যে কথা আমি বলি, আমৃত্যু সেই কথা রাখার চেষ্টা করি। এখানকার সাংসদ, বিধায়ক বিজেপি। তাঁরা ২০১৯ সালেও ছিলেন।
অভিষেক: গত ৫ বছর ধরে বিজেপি যে ভাবে বাংলার মানুষকে হয়রানি করছে, কোচবিহার থেকে হাওড়া, শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা— সর্বত্র ১০০ দিনের কাজের টাকা বন্ধ করে রেখেছে। আমি সকলকে জিজ্ঞাসা করতে চাই, যেখানে দল হেরে যায়, সেখানে কি উন্নয়ন থামিয়ে দেবে? এটাই তৃণমূল এবং বিজেপির ফারাক। আলিপুরদুয়ারে তৃণমূল হেরেছে। কিন্তু গত ৫ বছরে কি লক্ষ্মীর ভান্ডার বন্ধ হয়েছে? আমরা আলিপুরদুয়ারে হেরেছি। কিন্তু আমরা লক্ষ্মীর ভান্ডার বন্ধ করিনি। এক এক বিধানসভায় ২৫ কোটি টাকা খরচ হয় মাসে।
অভিষেক: আপনাদের সকলকে নববর্ষের শুভেচ্ছা। পরিবারের সকলে ভাল থাকুন। ঈশ্বরের কাছে এটাই প্রার্থনা। বছরের শুরুতে আলিপুরদুয়ারে আসার সুযোগ পেলাম। এর পর বীরভূমে যাব। আবার উত্তরবঙ্গে যাব।
র্যাম্পে হেঁটে মূল মঞ্চে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে বরণ করে নিলেন জেলা নেতৃত্ব।
আলিপুরদুয়ারে সভাস্থলে পৌঁছে গিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। হেলিকপ্টার অবতরণ করেছে। আর একটু পরেই মঞ্চে উঠবেন তিনি। স্বাগত জানাচ্ছেন কর্মী-সমর্থকেরা।
তৃণমূল সূত্রে খবর, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি চা-বাগানের শ্রমিকদের অভিযোগ এবং সমস্যার কথা শুনবেন। শ্রমিকেরা লিখিত ভাবে তাঁদের সমস্যা বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন এবং ওই লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে সরাসরি সাংসদ অভিষেকের সঙ্গে আলোচনা করতে পারবেন। এই ভাবেই ভোটের আগে চা-বাগানের শ্রমিকদের কল্যাণে তৃণমূলের তরফে সরাসরি জনসংযোগের উদ্যোগ নিয়েছেন অভিষেক।
নাম-ধাম, অভিযোগ লিখে জমা দেওয়া যাবে অভিষেকের কাছে। —নিজস্ব চিত্র।