(বাঁ দিকে) অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। (ডান দিকে) রবীন্দ্রনাথ ঘোষ। —নিজস্ব ছবি।
পুরসভার করবৃদ্ধি থেকে ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে বিরোধ, গোষ্ঠীকোন্দল থেকে ভোটের ফল, নানা বিষয়ে দলের অন্দরে সমালোচিত হয়েছেন। শেষমেশ কোচবিহার পুরসভার চেয়ারম্যানের পদ ছেড়েই দিলেন রবীন্দ্রনাথ ঘোষ। শনিবার মহকুমা শাসক গোবিন্দ নন্দীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন প্রবীণ তৃণমূল নেতা। রবীন্দ্রনাথের অবশ্য দাবি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশ শিরোধার্য করে ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সামনে বিধানসভা ভোট। সংগঠনের কাজে মনোনিবেশ করবেন তিনি।
পুরপ্রধানের পদ থেকে রবীন্দ্রনাথের ইস্তফা নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে নানা জল্পনা চলছিল। জেলা তৃণমূল সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিক নিজে কোচবিহারের বিভিন্ন পুরসভার চেয়ারম্যানকে পদত্যাগ করতে নির্দেশ দেন। সেই সময়ও বেঁকে বসেছিলেন একমাত্র রবীন্দ্রনাথ। হঠাৎ কেন তাঁকে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক স্বয়ং ফোন করে ইস্তফা দিতে বললেন, তা নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে। জেলা তৃণমূলের একটি সূত্রের খবর, অভিজিতের ‘কাছের লোক’ বলে পরিচিত ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর দিলীপ সাহাকে পুরসভার পরবর্তী চেয়ারম্যান করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গিয়েছে। সেই জন্যই এই নির্দেশ। আবার রবি-ঘনিষ্ঠদের দাবি, বিধানসভা নির্বাচনে নাটাবাড়ি কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করা হতে পারে তাঁদের ‘রবিদা’কে। সেই ইঙ্গিত পেয়েই সংগঠনের কাজে মন দিচ্ছেন প্রাক্তন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী।
নাটাবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের ডাউয়াগুড়িতে রবীন্দ্রনাথের গ্রামের বাড়ি। বেশ কয়েক বার নাটাবাড়ি কেন্দ্র থেকে বিধানসভা ভোটে লড়াই করেছেন। ২০১১ এবং ’১৬ সালে ওই কেন্দ্র থেকে জিতে বিধায়কও হয়েছিলেন। তবে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে তৃণমূলত্যাগী বিজেপি প্রার্থী মিহির গোস্বামীর কাছে হেরে যান। এখন রবির কাছের লোকদের দাবি, ‘‘২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে পুরনো চালেই ভরসা রাখছে দল।’’
বস্তুত, শনিবার মহকুমা শাসককে পদত্যাগপত্র দিয়েই সোজা নাটাবাড়ি বিধানসভা এলাকায় দলের ‘উন্নয়ন সংকল্প কর্মসূচি’-তে বেরিয়ে যান রবীন্দ্রনাথ। যাওয়ার পথেই তিনি বলেন, ‘‘আমাদের দলের সর্বভারতীয় নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে টেলিফোন করেছিলেন। উনি বলেছেন, চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে গিয়ে আরও বেশি করে দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে হবে। তাঁর নির্দেশ শিরোধার্য।’’ কোচবিহার জেলা তৃণমূলের প্রাক্তন সভাপতি আরও বলেন, ‘‘আমি সংগঠনের লোক। সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করব। কোচবিহারের ৯টি বিধানসভার আসনের ৯টিই যাতে মুখ্যমন্ত্রীর হাতে তুলে দিতে পারি, সেই চেষ্টা করব। সে জন্যই চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে আজ থেকেই দলীয় কাজে নিজেকে নিযুক্ত করলাম।’’
আবার তৃণমূলের অন্য পক্ষের দাবি, রবির ইস্তফার কারণ পুরপ্রধান হিসাবে তাঁর ‘ধারাবাহিকতা।’ লোকসভা ভোটের ফলাফলের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন পুরসভার কাজ নিয়ে ‘অসন্তুষ্ট’ অভিষেক কয়েক মাস আগেই নির্দেশ দিয়েছিলেন, ব্যর্থতার দায় নিয়ে সরতে হবে। এর মধ্যে লোকসভা নির্বাচনে কোচবিহার পুরসভা এলাকায় প্রচুর ভোটে পিছিয়েছিল তৃণমূল। আগামী ১৩ জানুয়ারি কোচবিহারে সভা আছে অভিষেকের। তার পরেই পুরসভার নতুন চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হতে পারে। তার তিন দিন আগে রবিকে ফোন করে ইস্তফা দিতে বলা ‘তাৎপর্যপূর্ণ।’
২০২২ সালে কোচবিহারের পুরসভা ভোটে ৮ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। চেয়ারম্যান হিসাবে বছরখানেক ঠিক গেলেও তাল কাটে ২০২৩ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়। একাধিক বার তৃণমূল জেলা সভাপতি তথা কাউন্সিলর অভিজিতের সঙ্গে তাঁর মন কষাকষি হয়। এমনকি, কোচবিহার শহরে পুরকর বৃদ্ধি করায় সটান মুখ্যমন্ত্রীর কাছে রবির বিরুদ্ধে নালিশ ঠুকেছিলেন অভিজিৎ। গত বছরের জুনে রাজস্ব বৃদ্ধি নিয়ে নবান্নের সভা থেকেই কোচবিহারের পুরপ্রধানকে ভর্ৎসনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেছিলেন, ‘‘হঠাৎ করে রবি ঘোষ কোচবিহারে ঘোষণা করলেন, ‘ট্যাক্স বাড়ানো হল!’ তুমি কে ভাই ট্যাক্স বাড়ানোর? সরকারের অনুমতি ছাড়া, কোনও ট্যাক্স বাড়বে না।’’