প্রতিরোধমূলক আটকে প্রশ্ন
West Bengal Public Safety and Control of Anti-Social Activities Bill 2026

পুরনো কর্মও কি ধরা হবে এখন, বিতর্ক তুঙ্গে

বিধানসভায় পাশ হয়ে গিয়েছে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোস্যাল অ্যাকটিভিজ় বিল, ২০২৬’। বিলের পক্ষে পড়েছে ১৭৬ ভোট, বিপক্ষে ছিল ৪৫।

সন্দীপন চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ ০৬:৩৫

—প্রতীকী চিত্র।

সাপ মরবে, লাঠিও ভাঙবে না!

গুন্ডা-দমনে নতুন বিল এনে রাজ্য সরকার অনেকটা এমন কৌশল নিয়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শিবিরের একাংশ। কেউ গুন্ডামি বা ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ ঘটাতে পারেন, এমন আশঙ্কা থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রতিরোধমলূক আটকের ক্ষমতা পুলিশ-প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে নতুন বিলে। এমন আটকের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির গত ৭ বছরের অপরাধের রেকর্ড খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ করা যাবে। বিরোধীদের বক্তব্য, আইন কার্যকর হয় ভবিষ্যতের জন্য। পুরনো ঘটনার বিচার নতুন আইনে হয় না। পুরনো কর্ম বিবেচনা করে প্রতিরোধমূলক আটক করার মানে কি ঘুরপথে পুরনো অপরাধেরও সাজা দেওয়া নয়, সেই প্রশ্নই তুলছে বিরোধীরা।

বিধানসভায় পাশ হয়ে গিয়েছে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোস্যাল অ্যাকটিভিজ় বিল, ২০২৬’। বিলের পক্ষে পড়েছে ১৭৬ ভোট, বিপক্ষে ছিল ৪৫। ভোটদানে বিরত থেকেছেন ২০ জন। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আশ্বাস দিয়েছেন, প্রতিরোধমূলক আটক বা বিলের কোনও ধারাই অপপ্রয়োগ হবে না। ‘ভদ্রলোক’দের উপরে প্রয়োগ করার জন্য এই বিল নয়। নতুন আইন আনতে হয়েছে শাজাহান, জাহাঙ্গিরদের মতো ‘দাগি’ দুর্বৃত্তদের শায়েস্তা করার জন্য। তবে মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাসের পরেও বিরোধীদের কেউ রাওলাট আইন, কেউ মিসা, কেউ বা হিটলারের জার্মানির বিধি-বন্দোবস্তের আশঙ্কা দেখছেন।

পাশ হওয়া বিলের তিন নম্বর ধারায় প্রতিরোধমূলক আটকের কথা বলা রয়েছে। সেখানেই বলা হয়েছে, সাধারণ ভাবে এমন আটক হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি গত ৭ বছরে কী ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত বা সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন, সে সব খতিয়ে দেখেই ১২ মাস পর্যন্ত প্রতিরোধমূলক আটকের সিদ্ধান্ত জারি হতে পারে। এই ধারায় প্রতিরোধমূলক আটকের নির্দেশ জারি হলে বিল বা প্রস্তাবিত আইনের চার নম্বর ধারা অনুযায়ী রাজ্যের যে কোনও জায়গায় গ্রেফতারি পরোয়ানা বার করে কার্যকর করা যাবে।

বিলের আট নম্বর ধারা অনুযায়ী, হাই কোর্টের বর্তমান বা প্রাক্তন কোনও বিচারপতির নেতৃত্বে এক বা একাধিক উপদেষ্টা পর্ষদ (অ্যাডভাইজ়রি বোর্ড) গড়তে পারবে সরকার। পর্ষদে আরও দুই সদস্যকে নেওয়া হবে হাই কোর্টের বিচারপতির সমতুল যোগ্যতা দেখে। কাউকে আটক করার তিন সপ্তাহের মধ্যে এই পর্ষদের কাছে গোটা ঘটনা রিপোর্ট সমেত পেশ করবে সরকার। তথ্য ও রিপোর্ট খতিয়ে দেখে বোর্ড আবার ৯ সপ্তাহের মধ্যে সরকারকে রিপোর্ট দেবে। আটকের পর্যাপ্ত কারণ আছে কি না, সেই বিষয়ে বোর্ড আলাদা করে নিজেদের মতামত জানাবে।

কালীঘাটপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক কুণাল ঘোষ এই বিলকে ব্রিটিশ আমলের রাওলাট আইনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিদ্রোহী তথা স্বীকৃত বিরোধী দল তৃণমূলের বিধায়ক, প্রাক্তন আইপিএস প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মূলত প্রতিরোধমূলক আটক নিয়েই। তাঁর মতে, আইনি ছাঁকনির মুখে পড়লে বিলের কিছু সংস্থান আটকে যেতে পারে। অতীতের টাডা, পোটা-র মতো দমনমূলক আইনের উদাহরণ টেনে বিলের দুরপযোগ নিয়ে আশঙ্কার কথা বলেছেন আইএসএফ বিধায়ক নওসাদ সিদ্দিকীও। আরও বিবেচনার জন্য বিলটিকে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর দাবি তুলেছিলেন কুণাল ও নওসাদ।

বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ‘‘ঘুরপথে পুরনো ঘটনা টেনে আনার আশঙ্কা তো থাকছেই। গত শতকের তিরিশের দশকে জার্মানিতে এই রকম সব আগাম আশঙ্কার ভিত্তিতে পদক্ষেপ করে ঘেটো থেকে শুরু করে নানা ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, চূড়ান্ত রূপ ছিল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। এখানেও সেই একই মনোভাবের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে!’’ রাজ্যের প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা আব্দুল মান্নান মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘‘পিডি আইন বা মিসা-য় এই ভাবেই বোর্ড বসিয়ে আটক রাখার সংস্থান ছিল। বলা হয়েছিল, অপপ্রয়োগ হবে না। তার পরে কী হয়েছিল, সকলেই জানেন। তখন যারা সেই সব পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছিল, তারাই এখন ক্ষমতা পেয়ে একই পথে হাঁটছে!’’

সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর মতে, ‘‘ব্রিটিশ আমল বা জরুরি অবস্থার সময়ের মডেল অনুসরণ করছে বর্তমান শাসক দল। প্রতিরোধমূলক আটকের ক্ষমতা থেকে উপদেষ্টা পর্যদ গঠন, সব ক্ষমতাই সরকারের হাতে থাকবে। পুরনো ঘটনা টেনে আনার প্রশ্ন থাকছে, অপপ্রয়োগের আশঙ্কা তো বটেই।’’

বিলের ব্যাখ্যায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অবশ্য বলেছেন, প্রতিরোধমূলক আটক নিয়ে যে আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে তা হবে না। সর্বোচ্চ আদালতের ‘স্ক্রুটিনি’ পেরিয়েই একাধিক রাজ্যে এমন আইন জারি হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ‘‘গুন্ডামি করে জামিনে বেরিয়ে আবার একই কাজ করবে, সে সব আর চলবে না। ভাঙচুর, পুলিশের উপরে হামলা মানা হবে না। গুন্ডাদের জন্যই দরকারে প্রতিরোধমূলক আটক হবে, ভিটেমাটি বেচে টাকা আদায় করে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও হবে!’’

বিলের পক্ষে পরিষদীয় মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষের বক্তব্য, ‘‘এক শ্রেণির মানুষ ভেবেছিল সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করলেও আমরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাব! সেটা আর হবে না। আর যারা (তৃণমূল) বিধানসভায় ভাঙচুর করেছিল, তাদের পরামর্শ শুনতে চাই না!’’ সিপিএম নেতা সুজন অবশ্য প্রশ্ন তুলছেন, ‘‘২০০৬ সালের সেই ভাঙচুরে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া তৎকালীন এক তৃণমূল বিধায়ক এখন মন্ত্রিসভার সদস্য। প্রতিরোধমূলক আটক তাঁর ক্ষেত্রে ভাবা হবে নাকি?’’

আরও পড়ুন