হয়রানি: ধর্মতলায় রাস্তার এক দিক জুড়ে চলছে এসআইআর নিয়ে শাসকদলের ধর্না। অন্য দিক দিয়ে দ্বিমুখী যান চলাচলের জেরে তৈরি হয়েছে তীব্র যানজট। শুক্রবার। ছবি: সুমন বল্লভ।
সপ্তাহের ভরা কাজের দিন। তার মধ্যেই শাসকদলের কর্মসূচির জন্য তৈরি হয়েছে মঞ্চ। ন্যায্য ভোটারের অধিকারের দাবিতে সেই ধর্না মঞ্চে উপস্থিত থাকছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘হাই ভোল্টেজ’ সেই কর্মসূচির জন্য পুলিশি তৎপরতাও প্রবল। মঞ্চের বহর বেড়েছে পুলিশ সামনের আরও কিছুটা জায়গা ঘিরে দেওয়ায়। এর জেরেই বন্ধ এক দিকের যান চলাচল।
দিনভর আসা একের পর এক মিছিলে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে ওঠে। সকাল থেকে দমবন্ধ অবস্থায় থাকা ধর্মতলা চত্বর কার্যত অবরুদ্ধ বেলা বাড়তেই। দীর্ঘক্ষণ ওই পথে আটকে নাজেহাল হলেন মানুষ। ভোগান্তি পোহাতে হল পুলিশের দেখানো বিকল্প পথে এগিয়েও। যে দূরত্ব যেতে বড়জোর পাঁচ-সাত মিনিট লাগার কথা, পার্ক স্ট্রিট হয়ে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের দিকে সেই দূরত্ব যেতেই লাগল ৪০ মিনিট বা এক ঘণ্টা!
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অবশ্য ধর্মতলার ওই অংশে পদস্থ পুলিশকর্তাদের নিয়ে ঘুরে গিয়েছিলেন কলকাতার নগরপাল সুপ্রতিম সরকার। যে কোনও অনুষ্ঠানেই যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে নির্দেশ দিতে দেখা যায় তাঁকে। বৃহস্পতিবারই তিনি বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, পথে নেমে যেন মানুষকে ভুগতে না হয়। তাই এ দিন ধর্না মঞ্চের সামনের রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ করে দেয় পুলিশ। ধর্মতলার দিক থেকে পার্ক স্ট্রিটের দিকের রাস্তাটি গার্ডরেল দিয়ে দু’ভাগ করে যান চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। ওই পথেই দ্বিমুখী গাড়ি চলতে থাকে। পার্ক স্ট্রিটের দিক থেকে বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট, চিওরঞ্জন অ্যাভিনিউমুখী গাড়িগুলি ধর্মতলা মোড় থেকে এসপ্লানেড ইস্ট দিয়ে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
পুলিশের দাবি, এর জেরে গাড়ির গতি সে ভাবে ধাক্কা খায়নি। যদিও বিকল্প পথ ধরে যাওয়ায় গন্তব্যে পৌঁছতে দেরি হওয়ার অভিযোগ করেন অনেকেই। ট্যাক্সিতে সিইএসসি ভবনে একটি কাজে যাচ্ছিলেন মধ্যবয়সি সীমা লিম্বু। কিন্তু গাড়ি এসপ্লানেড ইস্ট দিয়ে ঘুরিয়ে দেওয়ায় সেখানেই ট্যাক্সি থেকে নামতে হয় তাঁকে। সীমার কথায়, ‘‘পায়ে সমস্যা থাকায় হাঁটতে কষ্ট হয়। কিন্তু হেঁটেই যেতে হবে। উপায় নেই।’’ বিভ্রান্ত অনেককেই দেখা যায়, পুলিশের কাছে জানতে চাইছেন, কোন পথে যাবেন। এক মোটরবাইক আরোহী পুলিশের থেকে দিক-নির্দেশ চাইলেও তাঁকে হাতের ইশারায় এগোতে বলে পুলিশ।
পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয় শাসকদলের সমর্থক-বোঝাই বাস ধর্না মঞ্চের উল্টো দিকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রী নামাতে শুরু করায়। সেখানে একটি শপিং মলের সামনে গাড়ি আটকে যায়। যানজট ছড়িয়ে পড়ে মেয়ো রোড পর্যন্ত। যানজটের কবলে পড়ে ধর্মতলা সংলগ্ন এস এন ব্যানার্জি রোড, লেনিন সরণি। যা সামলাতে হিমশিম পুলিশ। যানজটে আটকে বনহুগলি থেকে বেহালা চৌরাস্তাগামী বাসের জানলায় বসা এক বৃদ্ধাকে বলতে শোনা যায়, ‘‘যা অবস্থা, আজ মনে হয় বাড়ি ফিরতে পারব না।’’ অনেককেই বাস থেকে নেমে গন্তব্যের দিকে হাঁটতে দেখা যায়। কাঁধে বিরাট প্যাকেট নিয়ে হাঁটছিলেন এক ব্যক্তি। জানালেন, চাঁদনি চক থেকে জিনিস নিয়ে পার্ক স্ট্রিটে যাচ্ছেন। বললেন, ‘‘যা অবস্থা, বাসে না উঠে হাঁটলেই তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাব।’’
স্কুটারে ছোট্ট ভাইঝিকে চাপিয়ে স্কুল থেকে বৌবাজারের বাড়িতে ফিরছিলেন ইন্দ্রজিৎ দত্ত। ধর্মতলা মোড়ে যানজটে আটকে পড়ে বলেন, ‘‘ভোগান্তি তো হচ্ছেই। একে যানজট, তার পরে আবার ঘুরে যেতে হবে। কখন বাড়ি পৌঁছব, জানি না। বাচ্চাটার খুব কষ্ট হচ্ছে।’’ ধর্মতলা মোড়ে যানজটে আটকে ঘামছিলেন স্কুটারচালক সোমনাথ হালদার। সামনে-পিছনে পর পর গাড়ি। কলেজ স্ট্রিটের বই ব্যবসায়ী সোমনাথ যাবেন নিউ আলিপুরে। বললেন, ‘‘গোটা রাস্তা থমকে থমকে আসছি। কখন নিউ আলিপুর পৌঁছব, জানি না। এই দাবি হয়তো ন্যায্য, কিন্তু আমাদের ভোগান্তিটা তো অন্যায্য।’’