— প্রতীকী চিত্র।
বিজেপি নেতারা বার বার ভোট-পরবর্তী হিংসা বন্ধে বার্তা দিলেও, বাস্তবে তাতে যতিচিহ্নের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই আবহে পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলীতে অসিত দেবনাথ (৪৭) নামে এক তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার এবং মালদহের ইংরেজবাজারে বিক্রম হালদার ওরফে কিষাণ (২৯) নামে এক বিজেপি সমর্থককে কুপিয়ে খুনের অভিযোগে রাজনৈতিক রং লেগেছে। চলছে পথের প্রতিবাদও।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বৃহস্পতিবার ফের বলেছেন, “আমরা জিতলাম। তার পরেও আমাদের কর্মীদের মৃত্যু হচ্ছে। ভোটের ফল উল্টো হলে, এত ক্ষণে ৩০০ বিজেপি কর্মীর দেহে মালা দিতে যেতে হত। প্রতিহিংসার রাজনীতি করবেন না। পুলিশ-কর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। দ্রুত পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তা চেষ্টা করতে হবে।”
পূর্বস্থলীতে এ দিন অসিতের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়েছে। তৃণমূল নেতা তথা প্রাক্তন মন্ত্রী স্বপন দেবনাথের অভিযোগ, “অসিত আমাদের দীর্ঘ দিনের কর্মী। ফল বেরোনোর পরে ওঁর পরিবারের উপরে বিজেপি অত্যাচার করছিল।” বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য রাজীব ভৌমিকের পাল্টা দাবি, “মিথ্যা অভিযোগ। রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছে তৃণমূল।” পাশাপাশি, বুধবার রাতে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে ইংরেজবাজারের বিক্রমকে কুপিয়ে খুনের অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, একদা তৃণমূলের সঙ্গে থাকলেও পরে বিজেপি সমর্থক হয়েছিলেন বিক্রম। মালদহের পুলিশ সুপার অনুপম সিংহ অবশ্য বলেছেন, “ঘটনায় রাজনৈতিক যোগ মেলেনি। জুয়া খেলা নিয়ে বচসার জেরে খুন বলে প্রাথমিক অনুমান। তিন জনকে আটক করা হয়েছে।”
ভোটের পরের দিন সংঘর্ষে জখম তৃণমূল নেতা চিত্তরঞ্জন মণ্ডলেরও (৬২) মৃত্যু হয়েছে বুধবার রাতে। পুরুলিয়া জেলার কাশীপুর ব্লকের মনিপুরে তাঁর বাড়ি। তিনি বড়রা অঞ্চল তৃণমূল সভাপতি ছিলেন। দুর্গাপুরে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটে রোহিত রায় নামে এক কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ধৃত জাহিনুর গাজিকে নিয়ে এ দিন ঘটনার পুনর্নির্মাণ করিয়েছে পুলিশ। ঘটনার নেপথ্যে রাজনৈতিক, না কি ব্যক্তিগত শত্রুতা রয়েছে, তা-ও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। বিজেপির বসিরহাট সাংগঠনিক জেলার সভাপতি সুকল্যাণ বৈদ্যের হুঁশিয়ারি, “গোডাউন পাড়ার কয়েক জন দাগি দুষ্কৃতী শুধরে গেলে ভাল। তা না-হলে, ৯ তারিখ মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার পরে উত্তরপ্রদেশের কায়দায় এনকাউন্টার হবে!” স্থানীয় তৃণমূল নেতা বাদল ভট্টাচার্যের বক্তব্য, “নিন্দনীয় ঘটনা। সরকারে আসছে বিজেপি। পুলিশ ওদের কথা শুনে কাজ করছে। ওরাই এমন ঘটনা আটকাতে পারবে।”
এরই মধ্যে ক্যানিংয়ের গোলাবাড়িতে বিজেপি কর্মীদের তাক করে পাথর ছোড়ার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। বিজেপির দাবি, তৃণমূলের দুষ্কৃতীরা গেরুয়া আবির মেখে ও বিজেপির পতাকা নিয়ে হামলা চালাচ্ছে। উল্টো দিকে, রায়দিঘিতে তৃণমূল-কর্মীদের মারধর, বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। উত্তর দিনাজপুরের করণদিঘিতে সিপিএম নেতা আশিস ঘোষকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। ঘটনায় তৃণমূল কর্মী এক দম্পতিকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ। পাশাপাশি, মুর্শিদাবাদের কান্দি ব্লক যুব তৃণমূলের সভাপতি উসমান গনির বাড়ি তাক করে বোমা ছোড়ার অভিযোগ উঠেছে।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় তৃণমূলের এক পঞ্চায়েত সদস্যা তথা দলের সমাজমাধ্যমের কর্মীকে ধর্ষণ করে খুনের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই মর্মে একটি ভিডিয়ো (সত্যতা যাচাই করে দেখেনি আনন্দবাজার) সমাজমাধ্যমে ছড়িয়েছে। সেখানে এক যুবককে বলতে শোনা গিয়েছে, ওই তৃণমূল নেত্রীকে ধর্ষণ করে তিনি খুন করবেন। তৃণমূলের অভিযোগ, ওই যুবক স্থানীয় বিজেপি কর্মী। দিন কয়েক আগে ওই তৃণমূল নেত্রীর বাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগও উঠেছিল বিজেপি কর্মীদের বিরুদ্ধে। তবে বিজেপির তমলুক সাংগঠনিক জেলার সহ-সভাপতি প্রলয় পাল বলেন, ‘‘বিজেপি এমন সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। যদি কেউ এ রকম কিছু করে থাকে, তবে অন্যায় করেছে।’’
এই পরিস্থিতিতে ‘বুলডোজ়ার রাজ’ ও সাম্প্রদায়িক হিংসার অভিযোগ তুলে সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন ও এসইউসি-র ডাকে এ দিন ধর্মতলায় লেনিন মূর্তির পাদদেশে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়েছে। ছিলেন লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, রাজ্য সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার, এসইউসি-র রাজ্য সম্পাদক চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য-সহ অন্যেরা। দীপঙ্কর বলেছেন, “পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কোনও দল, সংগঠন বা বাহিনীকে গুন্ডামির ছাড়পত্র দেননি।”