—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
নিছক পরাজয় নয়। দু’জেলার একাধিক আসনে কোথাও প্রায় পঞ্চাশ হাজার, কোথাও বা চুয়াচল্লিশ-চল্লিশ হাজার ভোটে হারা এক অর্থে যেন তৃণমূলের নিচু স্তরে সাংগঠনিক কাঠামোয় ভাঙনের ইঙ্গিতবাহী। তবে ঘুণ ধরার ইঙ্গিত কেন পেলেন না দলের জেলা বা ব্লক নেতৃত্ব, সেই প্রশ্ন উঠছেই।
বিপর্যয়ের জন্য অবশ্য দলের ভোট-কুশলী সংস্থাকেই দুষছেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। তাঁদের দাবি, ওই সংস্থার দাপাদাপিতেই নিচু স্তরের সংগঠন বেহাল হয়েছে। যাদের ভোট-প্রচারের কৌশল ঠিক করার কথা, তারা আদতে দলে সর্বসের্বা হয়ে ছড়ি ঘুরিয়েছে। সংগঠনের ফাঁক-ফোকর নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে রিপোর্ট দেওয়ার পরিবর্তে বেশি সময় দেওয়া হয়েছে পোড় খাওয়া নেতাদের নতুন করে রাজনীতি শেখাতে। পুরুলিয়ার দলের এক শীর্ষ নেতা স্পষ্ট বলছেন, ”ওই ভোট-কুশলী সংস্থাই দলের বারোটা বাজিয়েছে। তা শীর্ষ নেতৃত্ব যত দ্রুত বোঝেন, দলের পক্ষে মঙ্গল।”
আপাতত প্রকাশ্যে না হলেও তৃণমূলের অন্দরে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, ওই সংস্থার কাজকর্মে বিরক্ত নানা স্তরের নেতাদের মতামত। এমনকি বেশ কিছু আসনে ওই সংস্থা কার্যত টিকিট বিক্রি করেছেন বলেও অভিযোগ। ব্লক স্তরের কিছু নেতার দাবি, নির্বাচন-পর্বে বৈঠকের নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু সময় নষ্ট করানো হয়েছে। অহেতুক
ধমকানি, দাবড়ানি দিতেও পিছপা হননি সংস্থার কর্মীরা। ওই নেতাদের কথায়, ‘‘প্রার্থী কে হবেন, তা নিয়ে বিস্তর সমীক্ষা চালিয়েছিল সংস্থা। কিন্তু দেখা গিয়েছে, যাঁকে নিয়ে বিস্তর ক্ষোভ ছিল, সংস্থার রিপোর্টের ভিত্তিতে তিনিই প্রার্থী হয়েছেন।”
শুধু তাই নয়, দু’জেলার তৃণমূলের একাধিক শীর্ষ নেতা জানাচ্ছেন, কী ভাবে বুথ স্তরে সংগঠন আরও পোক্ত করতে হয়, কী ভাবে বুথের সংগঠন সক্রিয় থাকে, এমন নানা বিষয়ে ভোট-কুশলী সংস্থার কর্মীদের কোনও ধারণাই ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে এলাকার ‘জনবিচ্ছিন্ন’ নেতাদের উপরেই সংগঠনের দায়িত্ব ছাড়া হয়েছে। তার ফলে বুথে বুথে দলের সংগঠনের প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন করা যায়নি।
পুরুলিয়ার এক নেতার কথায়, ”হয়তো জেলার সব আসনেই আমাদের হারতে হত। কিন্তু সাংগঠনিক কাঠামো নড়ে যাওয়ায় হারের ব্যবধান অনেকটা বেড়েছে।” বাঁকুড়ারও জেলা স্তরের এক নেতার আক্ষেপ, ”বুক দিয়ে সংগঠন সামলেছি। কিন্তু ভোট-কুশলী সংস্থাই ধীরে ধীরে দলের সর্বসের্বা হয়ে উঠল। সংস্থার লোকজন আর পুলিশের কিছু আধিকারিক সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করল। এমনকি, ওই সংস্থা যে টাকা নিয়ে প্রার্থিপদ দিয়েছে, তা-ও সবাই জেনে গেল। তারই জেরে এই ফল। দলটা মাটির সঙ্গে সংস্পর্শটা হারিয়ে ফেলল।” তৃণমূলের পুরুলিয়ার চেয়ারপার্সন শান্তিরাম মাহাতোও বলছেন, ”দলের এই বিপর্যয়ের পেছনে ভোট-কুশলী সংস্থার ভূমিকা কতটা, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পর্যালোচনা করা উচিত।”
এর পাশাপাশি, ক্ষমতায় থাকাকালীন পুলিশের উপরে অতিরিক্ত নির্ভরতাকেও বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ বলে মানছেন তৃণমূলের অনেকে। তাঁদের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় ভিড় জমাতে ভরসা হয়ে উঠেছিল পুলিশ। সেই জোগাড়ে ভিড় দেখে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন শীর্ষ নেতৃত্ব। কিন্তু তার প্রতিফলন যে ভোট-বাক্সে পড়বে না, তা বুঝে ওঠা যায়নি। অন্য দিকে, বিজেপির সভার ভিড়ে যে স্বত্ঃস্ফূর্ততা ছিল, তা-ই প্রতিফলিত হ
য়েছে ভোট-বাক্সে।