Employment in West Bengal

ন্যানোর মতো কারখানা আর হল কোথায়!

পনেরো বছরে দ্বিতীয় সিঙ্গুর হল না। বড় ধরনের কর্মসংস্থান হবে কী ভাবে?

চন্দ্রপ্রভ ভট্টাচার্য
শেষ আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫১

— প্রতীকী চিত্র।

যত কাণ্ড কি সেই ‘ট্রিগারেই’! যার থেকে বেরোনো ‘গুলি’ এত দিন ধরে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে শাসক থেকে বিরোধী, সকলকেই।

কথাগুলি বলেছিলেন রতন টাটা, সেই ২০০৮ সালের ৩ অক্টোবর। তখন ব্রিটিশ আইনে টাটার ন্যানো কারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে তুঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলন। টাটা বলেছিলেন, “বলেছিলাম, বন্দুক ঠেকালেও যাব না। ...কিন্তু ট্রিগার টিপে দিলেন।”

তার পরে আঠারো বছর কেটে গিয়েছে। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। আদালতের রায়ে গুঁড়িয়ে গিয়েছে সিঙ্গুরের প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া কারখানা। কিন্তু প্রয়াত শিল্পপতি রতন টাটার সেই মন্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা এতটুকুও বদলায়নি। কারণ, সিঙ্গুরের সেই জমিতে শিল্পও হয়নি, চাষও না। ন্যানো-বিদায়ের ভূত যেন এখনও তাড়া করছে রাজ্যকে। নতুন সরকারের পনেরো বছরের শাসনকালে গাড়ি-শিল্প তো দূর, বড় বা মাঝারি শিল্প কত এসেছে, তা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে। তার ফল? ‘হোয়াইট’ এবং ‘ব্লু কলার জব’, যেখানে মূলত শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম কাজ পায়, তার মন্দা। বিকল্প হিসেবে তাই চা-চপ-ঘুগনির বিক্রিও ঢুকে পড়েছে কর্মসংস্থানের বৃত্তে! বিরোধীদের কটাক্ষ— কারখানার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে মিশে রয়েছে রাজ্যের শিল্প ভবিষ্যৎও।

ন্যানোর মতো গাড়ি-শিল্প কী ভাবে, কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে? সাধারণত, এই ধরনের শিল্পে গাড়ির মূল কারখানা তো বটেই, অনুসারী শিল্পে বেশ কয়েক হাজার কর্মসংস্থানও হওয়ার সুযোগ থাকে।

এর সঙ্গে রয়েছে, সেই সব কারখানার জন্য ক্যান্টিন, কেটারার থেকে শুরু করে আরও বহু ধরনের কাজ। এমন শিল্পতালুক তৈরি হলে এলাকায় শপিং মল থেকে আবাস নির্মাণ, সবইচাঙ্গা হয়।

গত পনেরো বছরে এমন কোনও নতুন কারখানা তৈরি হয়নি, যার ফলে এত রকমের কর্মসংস্থান সম্ভব হবে।

যদিও রাজ্যের দাবি, ছোট-বড়, উৎপাদন থেকে লজিস্টিক্স, পরিষেবা থেকে তথ্যপ্রযুক্তি— সব ক্ষেত্রেই লগ্নি আসছে। তাদের কথায়, ডেউচা পাঁচামিতে কয়লা থেকে অশোকনগরে তেল উত্তোলন প্রকল্প কার্যকর হওয়ার পথে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম চিপ তৈরি সংস্থার হাত ধরে রাজ্যে একটি নতুন সেমিকন্ডাক্টর হাব তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। ছোট-ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পক্ষেত্রেও বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় দেড় লক্ষ কোটি টাকা। অষ্টম বিশ্ববাংলা বাণিজ্য সম্মেলনের (বিজিবিএস) মঞ্চ থেকে সরকার দাবি করেছিল, গত সাতটি সম্মেলন থেকে প্রায় ১৯.৫১ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রস্তাব পেয়েছে রাজ্য। তার মধ্যে ১৩ লক্ষ কোটি টাকার প্রস্তাব কার্যকর হয়েছে। শুধু অষ্টম বিজিবিএস থেকেই রাজ্যের প্রাপ্তি প্রায় ৪.৪০ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব। এ সবের ফলে পরিধি বাড়ছে কর্মসংস্থানের।

কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, গত প্রায় ১৫ বছরে নতুন কোনও চিমনি দিয়ে ধোঁয়া বার হতে দেখা যায়নি। তাজপুর গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ইস্পাত কারখানা—সব ক্ষেত্রেই ‘তোমার দেখা নাই রে, তোমার দেখা নাই’। তাজপুরে নতুন করে দরপত্র ডাকা হয়েছে। ইস্পাত কারখানা এক পা-ও এগোয়নি। একই ভাবে ডেউচায় কয়লা উত্তোলন বা অশোকনগরে তেল তোলা নিয়েও অজস্র যদি-কিন্তু রয়েছে। এমনকি, তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রেও যতটা বিনিয়োগ আসবে বলে দাবি করা হয়েছিল, বাস্তবে এসেছে তার থেকে অনেক কম। বিনিয়োগ প্রস্তাবের কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের চেষ্টা কয়েক বছর আগে একবার হলেও, এখনও তার খোঁজ নেই।

রাজ্যে সামগ্রিক ভাবে কর্মসংস্থানের ছবিটা কেমন?

কেন্দ্রের ‘ডিপার্টমেন্ট ফর প্রোমোশন অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড ইন্টারনাল ট্রেড’-এর (ডিপিআইআইটি) রিপোর্ট বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রস্তাব (ইন্ডাস্ট্রিয়াল অন্ত্রপ্রনর মেমোরান্ডাম বা আইইএম-পার্ট-এ) রাজ্য যা পেয়েছিল (এই পর্বে কোনও বাণিজ্যিক সংস্থা নতুন বিনিয়োগ-উৎপাদন, চালু কারখানার সম্প্রসারণের প্রস্তাব দিয়ে থাকে), বাস্তবে তা কার্যকর হয়েছে অনেক কম। বাস্তবটা জানা যায় ‘আইইএম-পার্ট-বি’ থেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগ প্রস্তাব যা-ই থাকুক, বাস্তবে কাজ শুরু করাটাই আসল। এই দিক থেকে এ রাজ্যের অগ্রগতি বড় রাজ্যগুলির তুলনায় অনেকটা পিছনে (সবিস্তার সারণীতে)। আবার বিদেশি বিনিয়োগের (ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট বা এফডিআই) প্রশ্নে রাজ্যগুলির ক্রমতালিকায় পশ্চিমবঙ্গের জায়গা একাদশ (সবিস্তার সারণীতে)।

যদিও সদ্য প্রকাশিত ‘উন্নয়নের পাঁচালিতে’ রাজ্য দাবি করেছে, ‘‘নিবন্ধিত (নথিবদ্ধ) কোম্পানির সংখ্যায় বাংলা দেশের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতিটি কারখানার গড় মুনাফা বেড়েছে ৫৪৬%।’’ এই সূত্রেই গত ১৮ ডিসেম্বর বাণিজ্য কনক্লেভে মুখ্যমন্ত্রীর দাবি ছিল, এ রাজ্যে ১.৭২ কোটি মানুষকে দারিদ্রসীমার বাইরে আনা গিয়েছে। বেকারত্বের হার ৪০% কমেছে এবং ২ কোটিরও বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, ‘‘চারটি জেলা জুড়ে ১৬৩টি খনি-কাজ চলছে। ডেউচায় এক লক্ষ লোকের চাকরি হবে। রঘুনাথপুরে ৭২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে। লক্ষাধিক লোকের চাকরি হবে সেখানে। সব জেলায় হচ্ছে।’’

কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্ন, তবে কেন মুখ্যমন্ত্রী চা-চপ-ঘুগনি বিক্রি করতে উৎসাহ দিচ্ছেন! কেন প্রকাশিত হচ্ছে না কর্মসংস্থানের শ্বেতপত্র! তাঁরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সম্প্রতি রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রক তথ্য দিয়েছে—২০১১ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬৮৯৫টি শিল্প-সংস্থা রাজ্য থেকে চলে গিয়েছে। এর মধ্যে গত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্তই রাজ্য ছেড়েছে ২০৭টি সংস্থা। গত মার্চ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি শিল্প-সংস্থা সরে গিয়েছে মহারাষ্ট্রে। তার পরেই রয়েছে দিল্লি এবং উত্তরপ্রদেশ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগে জটিলতা। দুর্নীতির অভিযোগে জেরবার এই ক্ষেত্রটিতে চাকরির সম্ভাবনা ক্ষীণতর। সব মিলিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্নাতক-পরবর্তী শিক্ষার ক্ষেত্রে অনীহা দেখা দিয়েছে। গত কয়েক বছরে কলেজে আসন ফাঁকা থাকা থেকেই তা স্পষ্ট।

(চলবে)

আরও পড়ুন