Rahul Arunoday Banerjee Death

শুটিং স্পট বদল শেষ মুহূর্তে, প্রশ্ন ডাক্তার নিয়েও

বৃহস্পতিবার সামনে এসেছে এই মৃত্যু ঘিরে নতুন কয়েকটি তথ্য। তদন্তকারীরা জেনেছেন, তালসারিতে রাহুলের শুটিংয়ের জায়গা শেষ মুহূর্তে বদল করা হয়েছিল।

নিজস্ব সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০০
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়।

রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাইল চিত্র।

তিন দিন পেরিয়ে গিয়েছে। এখনও একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর তদন্ত। শুধু একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর জেনারেল ডায়েরি করে বসে না থেকে কেন পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করার পথে হাঁটছে না, কেন শুটিংয়ের সময়ে ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত একাধিক গাফিলতির প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েও প্রযোজনা সংস্থা বা তার কর্তাদের বিরুদ্ধে কর্তব্যে গাফিলতির মামলা করা হচ্ছে না, সেই প্রশ্নও উঠছে বার বার। এর মধ্যেই ৭২ ঘণ্টা নীরবতার পর রাহুলের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করে প্রযোজনা সংস্থার তরফে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সামনে এসেছে এই মৃত্যু ঘিরে নতুন কয়েকটি তথ্য। তদন্তকারীরা জেনেছেন, তালসারিতে রাহুলের শুটিংয়ের জায়গা শেষ মুহূর্তে বদল করা হয়েছিল। জায়গা বদল হলেও সেখানে ছিল না আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার কোনও রকম বন্দোবস্ত। সামনে এসেছে, ফুসফুসে বালি ঢুকে শ্বাসরোধ হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়া রাহুলকে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হলেও সেখানে চিকিৎসকই ছিলেন না। এর কোনও বিষয় নিয়েই অবশ্য পুলিশের তরফে সরকারি ভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। আপাতত ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট হাতে আসার জন্য পুলিশ অপেক্ষা করছে বলেই দাবি করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে রাজ্য মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রযোজনা সংস্থা জড়িত বলেই তদন্তে গড়িমসি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। ঘটনার তিন দিন পরে বুধবার যে প্রযোজনা সংস্থার ধারাবাহিকের শুটিং করতে গিয়ে রাহুলের এই পরিণতি, সেই ‘ম্যাজিক মোমেন্টস’ সংস্থার কর্তৃপক্ষের তরফে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে জানানো হয়েছে, মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করতে ইচ্ছুক লীনা। রাহুলের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তাঁর এই ইচ্ছা প্রকাশ বলে জানানো হয়েছে বিবৃতিতে। তাতে লেখা হয়েছে, ‘যাতে নিরপেক্ষ ভাবে তদন্ত হয়, সেই স্বার্থে লীনা রাজ্য মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন পদ থেকে ইস্তফাদিতে ইচ্ছুক’।

গত রবিবার রাহুলের মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসার পর থেকেই প্রযোজনা সংস্থার একাধিক সদস্যের পরস্পর বিরোধী বয়ান সামনে আসে। সংস্থার চিত্রনাট্যকার লীনার সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বয়ানের মধ্যেও অসঙ্গতি ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। তা নিয়ে ইন্ডাস্ট্রির একাংশ ও সমাজমাধ্যমে ক্ষোভের ঝড় ওঠে। মূলত দায়ী করা হতে থাকে লীনাকেই। এ দিনের বিবৃতিতে সে প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘ম্যাজিক মোমেন্টস লীনার একার সংস্থা নয়। উনি সংস্থার সৃজনশীল দিকগুলিই দেখে থাকেন। যদিও সম্প্রতি কিছু দিন তাঁকে সহ-প্রযোজক করা হয়েছিল। লীনা রাজ্য মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন হওয়ার কারণেই সম্ভবত তাঁকে প্রযোজক সংস্থার প্রধান ধরে নেওয়া হয়েছে। এই ব্যাপারটি মাথায় রেখে লীনা তাঁর চেয়ারপার্সন পদ থেকে সরে দাঁড়াতে ইচ্ছুক’। যদিও এ প্রসঙ্গে সরাসরি লীনার তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তাঁকে ফোন করা হলেও ধরেননি। ওয়টস্যাপে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও উত্তর মেলেনি। সংস্থার পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, প্রযোজনা সংস্থার অধিকর্তা শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায় মুম্বইয়ে ছিলেন। ঘটনার খবর পেয়ে তিনি কলকাতায় ফেরেন। রাতে রাহুলের বাড়িতে গেলেও তাঁর পরিবারের মানসিক অবস্থার কথা ভেবে দেখা করার জন্য জোর করেননি।

দিঘা মোহনা থানার পুলিশ সূত্রে খবর, এ দিন ফের দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন তদন্তকারী আধিকারিকেরা। কাঁথির সার্কেল ইনস্পেক্টর বিপ্লব পতির নেতৃত্বে চলছে এই তদন্ত। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী এবং শুটিংয়ের স্থানীয় ব্যবস্থাপক (‌লোকাল কো-অর্ডিনেটর) তথা যে হোটেলে রাহুলেরা উঠেছিলেন, তার মালিককেও জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্তকারীরা। যদিও জলে পড়ে যাওয়ার কতক্ষণ পড়ে রাহুলকে উদ্ধার করা হয়েছিল, সেই রহস্য এ দিনও কাটেনি। পুলিশের তরফে উত্তর মেলেনি বিকেল ৪টে নাগাদ ঘটনা ঘটলেও কেন দিঘার হাসপাতালে রাহুলকে প্রায় দু’ঘণ্টা পরে সাড়ে ছ’টা নাগাদ নিয়ে যাওয়া হল? তালসারি থেকে গাড়িতে দিঘা হাসপাতাল যেতে যেখানে বড়জোর মিনিট কুড়ি সময় লাগে বলে পুলিশেরই দাবি, সেখানে এতটা সময় লাগল কেন? পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশের ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট (ডিসিপ্লিন অ্যান্ড ট্রেনিং) মোহিত মোল্লা এ দিনও বলেছেন, ‘‘তদন্ত চলছে। আশা করি, দু-এক দিনের মধ্যে ময়না তদন্তের রিপোর্ট পাওয়া যাবে।’’

এ প্রসঙ্গে বিবৃতিতে প্রযোজক সংস্থা দাবি করেছে, ‘অনেক জায়গায় বলা হচ্ছে, রাহুল ৪০ মিনিট বা এক ঘণ্ট জলের মধ্যে ছিলেন।— এই তথ্য সম্পূর্ণ ভুল। তবে ঠিক কতক্ষণ ছিলেন, তা ময়না তদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেলেই বলা সম্ভব’। সেইসঙ্গে যোগ করা হয়েছে, প্রযোজক সংস্থার কর্মীরা জানিয়েছেন, রাহুলকে জল থেকে তোলার পরেও তিনি জীবিত ছিলেন। তাঁকে নিকটবর্তী এক ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানে তখন কোনও চিকিৎসক ছিলেন না। তাই রাহুলকে দিঘা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ক্লিনিকে চিকিৎসা করানো সম্ভব হলে হয়তো এমনটা ঘটত না।

এই শুটিংয়ের জন্য পুলিশ-প্রশাসনের থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে যে অভিযোগ সামনে এসেছে সে ব্যাপারেও প্রযোজনা সংস্থার বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, ‘অনুমতি না নিয়ে শুটিং করার খবর ঠিক নয়’। বিভিন্ন দফতর থেকে তারা যে অনুমতিপত্র পেয়েছে, তা রাহুলের পক্ষের প্রতিনিধিকে তারা দেখাতে প্রস্তত বলেও দাবি করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের দাবি, গত রবিবার বিকেলে তালসারির সৈকতে ওই বাংলা ধারাবাহিকের শুটিং স্পট বদল করা হয়েছিল। সুরজ বেহেরা নামে এক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, ‘‘প্রথমে জেটি থেকে কিছুটা দূরেই শুটিং হচ্ছিল। ওখানে নৌকা নিয়ে অনেকে ছিলেন। কিন্তু জোয়ারের সময় সমুদ্রের আরও অনেকটা ভিতরে চলে যান ওঁরা। সেখানটা বেশ ফাঁকা।’’

তালসারির মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির কোষাধ্যক্ষ বলরাম গঙ্গাইও বলছেন, ‘‘শেষবেলায় শুটিং হচ্ছিল সুবর্ণরেখার মোহনায়। বাইরের লোকের পক্ষে বোঝা মুশকিল যে তখন ওখানে জোয়ার না ভাটা হচ্ছে। স্থানীয় লোক ছাড়া ওই জায়গায় সমুদ্র কতটা গভীর, বোঝা সম্ভব নয়।’’ প্রযোজক সংস্থার দাবি, তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছেন। ধারাবাহিকের অন্যান্য শিল্পী ও কলাকুশলীরা ভীষণই মর্মাহত, তাই ওই দিন ঠিক কী ঘটেছে, তা সম্পূর্ণ রূপে জানতে কিছু দিন সময় লাগবে। এ দিনের বিবৃতির মাধ্যমে তারা আরও একবার রাহুলের পরিবার বা তাঁদের প্রতিনিধিকে আহ্বান জানিয়েছে আলোচনায় বসার জন্য। যদিও রাহুলের পরিবার বা রাহুলের স্ত্রী প্রিয়ঙ্কা সরকারের তরফে এ সংক্রান্ত কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এ দিন প্রিয়ঙ্কা এবং আর্টিস্ট ফোরামের পক্ষ থেকে গল্ফগ্রিন থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হতে পারে বলে শোনা যায়। যদিও রাত পর্যন্ত পুলিশে কোনও অভিযোগ দায়ের হওয়ার খবর লালবাজার বা অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি।

রাহুলের মৃত্যুতে যে প্রশ্নগুলি উঠে এসেছে, তার ব্যাখ্যা চেয়ে প্রযোজনা সংস্থাকে চিঠি পাঠিয়েছে ওয়েস্ট বেঙ্গল মোশন পিকচার আর্টিস্ট ফোরাম।

আরও পড়ুন